বিশ্বজিৎ হত্যার রায় জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
বাংলাদেশে চাঞ্চল্যকার বিশ্বজিৎ হত্যায় আপিলের রায়ে ন্যায়বিচার পাওয়া গেছে এমনটি মনে করতে পারছে না জনগণ। এই রায়ে জনগণের মধ্যে অনেক ক্ষোভ এবং হতাশার জন্ম দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সরকারের উচিত এ বিষয়ে হাইকোর্ট ডিভিশনে আপিল করা।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ২০১২ সালে বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন করা হয়েছিল। এ মামলায় নিম্ন আদালতে ফাঁসির আদেশ পাওয়া আটজনের মধ্যে এখন যে রায় দেয়া হয়েছে তাতে বেশিরভাগ আসামি খালাস পেয়েছে কিংবা সাজা কমানো হয়েছে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক নিবন্ধে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, আসামিদের অনেকে পলাতক থাকায় এখন মাত্র একজনকে এই শাস্তি দেয়ার সুযোগ রয়েছে সরকারের। বিষয়টি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: দেখুন, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা। এই হত্যাকাণ্ডের পরই জনগণের মধ্য থেকে সুষ্ঠু বিচারের দাবি উঠেছিল। তখন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে এবং ভিডিওতে পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে যারা বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল তারা সবাই সরকার সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের সদস্য এবং নেতা।সুতরাং বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের ব্যাপারে দলীয় কোনো অনুকম্পা দেখানো হয় কি না এবং বিচারের ক্ষেত্রেও কোনো দলবাজির আশ্রয় নেয়া হয় কি না –সে ব্যাপারে মানুষের মনে একটা সংশয় ছিল। আর যে কারণে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়ে বলেছিল- এ ব্যাপারে সুষ্ঠু বিচার করতে হবে এবং অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে।
অবশেষে সাক্ষী প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের মামলায় একটা রায় দেয়া হয় এবং সেই রায়ে বেশ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। আর সেই আপিলের রায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। তবে আপিলের রায়ে যে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে তাতে ন্যায়বিচার পাওয়া গেছে এমনটি মনে করতে পারছে না জনগণ। এই রায়ে জনগণের মধ্যে অনেক ক্ষোভ এবং হতাশার জন্ম দিয়েছে।
এক্ষেত্রে সাধারণ মামলা সম্পর্কে আমি বলতে চাই, পর্যায়ক্রমিকভাবে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে একটি মামলা কোর্টে যায়। তারপর নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে যায়। এই মামলার বিভিন্ন পর্যায়ক্রমিক অবস্থা থেকে মানুষের কাছে এটা খুবই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মামলার রায় যাতে অপরাধীদের সাজার দিকে না যায় সেজন্য সুচতুরভাবে কোনো একটা মহলের পক্ষ থেকে নানাধরনের কলাকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে আমি মনে করি এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে হাইকোর্ট ডিভিশনে আপিল করা উচিত।
রেডিও তেহরান: আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডে সাজা হয়েছে মূলত পলাতকদের। গত পাঁচ বছরে এদের ধরতে পারেনি পুলিশ। এদের আর কোনো দিন ধরা যাবে বা হবে কি না তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। আপনার কী মনে হয়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: দেখুন, মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে কতগুলো স্টেপস নিতে হয়। মামলার আসামিদের ধরার পর তারা জামিন নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে কি না কিংবা তাদের ধরার ব্যাপারে কোনো গাফিলতি করা হচ্ছে কি না এসব ক্ষেত্রেও সরকার সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়।
বিচার ব্যবস্থা কতটা স্বাধীন সেটা একটা ভিন্ন প্রশ্ন। আমি সেদিকে যেতে চাচ্ছি না। বিচার বিভাগ স্বাধীনও হলেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় সরকার ও প্রশাসনের পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করার সুযোগ থাকে। কোনো প্রয়োজনীয় কাজ করা বা না করার ভেতর দিয়েও বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে সরকার।
রেডিও তেহরান: বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সমাজে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। এ ক্ষেত্রে বিশ্বজিতের পরিবারের হাতাশার কথাও গণমাধ্যমে বের হয়েছে। আসলে কী এই রায় হতাশাজনক?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: এটা শুধুমাত্র হতাশাজনক না; জনগণের মধ্যে এ বিষয়টা যেমন তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে একইভাবে আমার মধ্যেও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। এধরনের পরিস্থিতি নিরসন হওয়া একান্তভাবে প্রয়োজন।
বিশ্ববিতের পরিবার যেমন হতাশা ব্যক্ত করেছে। বিশ্বজিতের মতো এমন শত শত, হাজার হাজার ঘটনা দেশের মধ্যে ঘটছে। কোনো কোনোটা তো পুলিশ এবং বিচারালয় পর্যন্ত পৌঁছতেও পারে না। নীরবে নিভৃতে অন্যায় ও অবিচার সংঘটিত হচ্ছে। সেখানে বিচারের বাণী নীরবে কাঁদছে এমন যে কথা আছে তার প্রমাণ কিন্তু আমরা বর্তমানে সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।
রেডিও তেহরান: আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন-পুলিশ ও প্রসিকিউশনের ওপর সরকারের হাত থাকে। সে ক্ষেত্রে এ মামলায় বিচারের ক্ষেত্রে এই দুই বিভাগ থেকে যেসব দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে তা নিরসনে সরকার ভূমিকা রাখতে পারত কিন্তু তা হয় নি। ফলে সরকার এ মামলার দুর্বল রায়ের দায় এড়াতে পারে না। আপনি কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: দেখুন, প্রশ্নটা কেবলমাত্র সরকারি কার্য সম্পাদনে গাফিলতি না; মানুষের মনে যুক্তিসংগতভাবে একটা সন্দেহ দানা বেধেছে যে, সচেতন পরিকল্পনার ভিত্তিতে আসামিদের রেহাই দেয়ার উদ্দেশ্যেই অবহেলা বা অদক্ষতার নামে এধরনের কাজ করা হয়েছে। সুতরাং এখানে কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেছে কী না সে প্রশ্ন রয়েছে। আর মধ্যে কিছুটা রাজনৈতিক ও কিছুটা আর্থিক বিষয় জড়িত আছে কী না সেগুলো খুব ভালো করে অনুসন্ধান করে দেখা দরকার। কারণ বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের মামলাটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর একটি মামলা। আর এ মামলার ভেতর দিয়ে আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার জন্য প্রশাসনের এবং সরকারদলীয় হস্তক্ষেপের অনেক ঘটনাই বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে হয়।
রেডিও তেহরান: আসিফ নজরুল তার নিবন্ধের শেষ পর্যায়ে বলেছেন, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড ও বিচার অতীতের মতো এই বার্তাই দিয়ে গেল যে, অপরাধের অকাট্য প্রমাণ থাকলেও ক্ষমতাসীনদের সহযোগীরা সব সময়ই ছাড় পায়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকে। ...আপনি কী বলবেন এ মন্তব্য সম্পর্কে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি জনাব আসিফ নজরুলের বক্তব্যের সাথে আরও একটু যোগ করে বলতে চাই- দেখুন আমরা অনেক সময় কোনটা আইনসংগত আর কোনটা ন্যায়সংগত- তা গুলিয়ে ফেলি। কোনো কিছু আইনসংগত মানে সেটা ন্যায়সংগত হবে এমনটি কিন্তু না। আইনের বিধান এবং তার প্রক্রিয়া সব সময় ন্যায়বিচারকে যথাযথভাবে নিশ্চিত নাও করতে পারে। সুতরাং এখানে দুটো প্রশ্ন পৃথকভাবে দেখা উচিত এবং আইন যাতে ন্যায়বিচারের অনুকূলে হয় সেটাই দেখা উচিত।
আর আইন বলতে কেবলমাত্র কাগজে-কলমে ধারা-উপধারার কথা বলছি না। আইন প্রয়োগের সামগ্রিক প্রক্রিয়া যাতে ন্যায়ানুগ হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং সেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কী চরিত্রের সরকার বা কোন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
সেদিক থেকে বিচার করলে আমি খুব দুঃখের সাথে বলছি, যে ইনসাফের সমাজ কায়েমের লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম তা প্রায় আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার জায়গায় চলে এসেছে। ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে আরও দুর্বার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১১