অক্টোবর ৩১, ২০১৭ ১৭:৪৩ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে ভারতের একধরনের স্বার্থ থাকে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার মাহফুজ উল্লাহ। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

তিনি বলেছেন, স্বার্থের কারণে বড় প্রতিবেশী দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঢাকা সফরে এসে এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশে কোনোরকম সংকট তৈরি হলে আঞ্চলিক বড় শক্তি হিসেবে ভারতের অভ্যুদয়ের যে আকাঙ্খা সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও মনে করেন এই ভাষ্যকার। 

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব মাহফুজ উল্লাহ, গত ২২ অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফর করেছেন। তার সফরের আগে-পরে নানা আলোচনা চলেছে। এ সফরে তিনি আসলে কী বার্তা দিয়ে গেলেন?
 

মাহফুজ উল্লাহ: ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ একটি নিয়মিত কর্মসূচির অধীনে ঢাকা সফরে এসেছিলেন। 
ভারত আমাদের বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে তাদের একধরনের স্বার্থ থাকে। ফলে ভারতের কোনো মন্ত্রী বা কেউ যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন তখন এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করেন এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলেন। তবে সুষমা স্বরাজের এই সফর অন্য একটি কারণে বহুল আলোচিত। সেটি হচ্ছে আগামী বছর বাংলাদেশের ১১ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর সেই নির্বাচনের বিষয়ে এরইমধ্যে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য দাবি উঠেছে যে সবদলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ এবং জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। তা যদি না হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য বড় সংকট সৃষ্টি হবে। ফলে সম্ভবত ভারত এ বিষয়টি উপলব্ধি করবে।

রেডিও তেহরান:  বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের সময় সুষমা বলেছেন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় ভারত। এ বক্তব্য সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
 

মাহফুজ উল্লাহ: দেখুন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক এমন কথা ভারত আগে বলত না আজকাল বলা শুরু করেছে। বিশেষ করে সুষমা স্বরাজের এই সফরে বলেছেন যদি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হয় তাহলে বাংলাদেশে সংকট তৈরি হবে।

দেখুন বাংলাদেশকে অনেক বেশি প্রয়োজন ভারতের যতটা না প্রয়োজন বাংলাদেশের। কারণ হচ্ছে- বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে ভারত যেভাবে লাভবান হয় আমরা এখন পর্যন্ত  ততখানি লাভবান ভারতের কাছ থেকে হতে পারি নি, বলা চলে আমাদের সবকিছু দিয়ে দেয়ার ফলেও। এটি একটি বড় প্রশ্ন। ফলে বাংলাদেশে কোনোরকম সংকট তৈরি হলে আঞ্চলিক বড় শক্তি হিসেবে ভারতের অভ্যুদয়ের যে আকাঙ্খা সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হতে গেলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্কের প্রয়োজন হয়।

নেপাল-ভুটানের চেয়ে বাংলাদেশ জনসংখ্যাসহ বিভিন্ন দিক থেকে অনেক বড় দেশ। ফলে বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতকে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে বাংলাদেশের অনুমোদনের প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারি নেতৃত্ব বিষয়টি কিভাবে দেখবে সেটা দেখার বিষয়। তবে মোটামুটিভাবে একটা ধারনা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। আর এ বিষয়ে এখন কেউ কোনোরকম আপত্তি করছেন না। যদিও কেউ কেউ বিভিন্নভাবে ঘুরিয়ে কথা বলছেন।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরইমধ্যে বলেছেন, তিনি আর ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন চান না। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সরকারকেই ঠিক করতে হবে-তারা গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন চান কি না?
সরকারের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে- তাদেরকে পরিষ্কারভাবে এই বার্তা দিতে হবে যে, সবার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সুষ্ঠু ও অবাধ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে বিশ্বাস করে  এবং তারা চায় এধরনের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।

রেডিও তেহরান: ঈমানদারীর ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগোচ্ছে বলে সফরের সময় মন্তব্য করেছেন সুষমা স্বরাজ। তিনি আরো বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশের কোনো সমস্যাই অমীমাংসিত থাকবে না। কী বলবেন এই মন্তব্য সম্পর্কে?
 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বৈঠক

মাহফুজ উল্লাহ: ভারতের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য একেবারেই প্রথাসিদ্ধ একটি কূটনৈতিক বিবৃতি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরেকটি কথা বলেছেন, সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক 'স্ট্রাটেজিক অ্যালায়েন্সের'ও ওপরে। আসলে উনি কী বোঝাতে চেয়েছেন সে বিষয়টি আমার কাছে খুব একটা পরিষ্কার না। কারণ স্ট্রাটেজিক অ্যালায়েন্স বা সহযোগিতার  আমরা যে সংজ্ঞা জানি সেটি খুবই চূড়ান্ত। আর সেটি হচ্ছে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষাসহ অনেক কিছুই থাকে। কিন্তু এরও ওপরে বলতে আসলে কী বুঝিয়েছেন উনি সেটা পরিষ্কার নয়।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বৈঠক

আর ভারত বলছে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে কিন্তু আমি যদি বর্তমান সরকারের শাসনামল দেখি তাহলে সেখানে কী উন্নতি হয়েছে তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। কারণ আমাদের সকল বিষয় অমিমাংসিত থেকে যাচ্ছে। আমাদের এখান থেকে ভারত প্রতি বছর ৫ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় নাগরিক যারা বাংলাদেশে কাজ করছে –তারাই এই টাকাটা রেমিটেন্স হিসেবে ভারতে পাঠাচ্ছে। এটা ভারতের লাভ। এখন পর্যন্ত আামদের বিভিন্ন পণ্য ভারতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যারফলে আমাদের পণ্য ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। ভারত এ ব্যাপারে বিভিন্ন অজুহাত দেখাচ্ছে।

দেখুন, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভারতে ভালোভাবে দেখা যায় না। অথচ ভারতীয় সব চ্যানেল আমাদের এখানে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। সবচেয়ে নির্মম সীমান্ত হচ্ছে বাংলাদেশ –ভারত সীমান্ত। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ যখন তখন গুলি চালিয়ে বাংলাদেশিদের হত্যা করে। তারা বিভিন্নভাবে আমাদের লোকজনকে ধরে নিয়ে যায়, পিটুনি দেয়। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও সীমান্ত হত্যা, ধরে নিয়ে যাওয়া এবং পিটুনি দেয়ার কোনো অবসান আজও হয় নি। অথচ ভারত আমাদের কাছে যা চেয়েছে আমরা তা দিয়েছি। তারা আমাদের ভেতর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে যাওয়ার পথ চেয়েছে-আমরা তা দিয়েছি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের এখানে তাদের সমস্ত পণ্য আসার অনুমতি আছে।

আগামী বছর ভারত থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে কেন আমরা ভারত থেকে  ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনব? তাহলে কী আমাদের সরকার যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা দাবি করে সেই পর্যায়ে নেই?
এইরকম অসংখ্য বিষয় আছে যেগুলো তালিকা ধরে বললে দেখা যাবে যে আমাদের প্রাপ্তি কম অন্যদিকে ভারতের প্রাপ্তি বেশি।

রেডিও তেহরান:  ঢাকা সফরের সময় সুষমা স্বরাজ বলেছেন,  মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে পারে। ভারত রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দেয়া অব্যাহত রাখবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু মাঝেমধ্যেই খবর আসছে ভারতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পুশইন করা হচ্ছে। আবার মিয়ানমার সফরের সময় নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সরকারকে সমর্থণ দিয়েছিলেন। এসব ঘটনার আলোকে সুষমার বক্তব্য ও ভারতের অবস্থানকে আপনি কীভাবে দেখবেন? 
 

রোহিঙ্গা

মাহফুজ উল্লাহ: দেখুন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে যে কারণে ভারতের প্রয়োজন ছিল একই কারণে আজ বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের বেশি প্রয়োজন মিয়ানমারকে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে- মিয়ানমার সংকট সৃস্টি হওয়ার পর জাতিসংঘে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে বক্তৃতা দিয়েছেন তাতে মিয়ানমারের পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো কিছুই উল্লেখ করেন নি। কাজেই সেখানেও ভারতের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।

তৃতীয়ত- তারা মাত্র একবার ত্রাণ পাঠিয়েছেন। ভবিষ্যতে তারা কি করবে সেটা দেখার বিষয়।

চতুর্থ- এই যে পাশে থাকার কথার বলছে ভারত, প্রত্যাবসানই রোহিঙ্গা সংকটনের সমাধান- মোটা দাগে এসব কথা কূটনৈতিক ভাষার বহি:প্রকাশ। কারণ সর্বশেষ যে খবর তাতে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরের পর তারা পরিষ্কারভাবে অনেক কিছু অস্বীকার করেছে। মিয়ানমার বলেছে সেরকম কোনো ঐক্যমত্যই হয় নি বাংলাদেশের সাথে। তাছাড়া বাংলাদেশের সরকারও দীর্ঘমেয়াদিভাবে রোহিঙ্গাদের এখানে মেনে নেয়ার জন্য একধরনের মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। কাজেই মিয়ানমার থেকে যারা ভারতে গেছে তাদেরকে বাংলাদেশে পুশইন করতে হবে বলে মনে করে ভারত। বাংলাদেশ যদিও কিছু পুশআউট করেছে কিছু লোককে। তবে আমার ধারনা ভবিষ্যতে বিষয়টি আরো জটিল হবে এবং ভারত রোহিঙ্গাদেরকে পুশইন  করে দেয়ার চেষ্টা করবে।

আমরা সমস্ত বিষয়টি যথাযথভাবে না দেখার ফলে এবং আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের যথার্থ উপলব্ধি না থাকার কারণে বিষয়টি সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে পারছি না।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৩১