সাম্রাজ্যবাদের মুসলিম দালালদের রুখে দিতে হবে: মাসুদ মজুমদার
-
সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ মজুমদার
মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের জন্য মুনাফেকদের চিহ্নিত করে বয়কট করতে হবে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-উপলক্ষে ইরানে সম্প্রতি পালিত ঐক্য সপ্তাহ সম্পর্কে রেডিও তেহরানের সাথে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বাংলাদেশের সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাসুদ মজুমদার।
তিনি আরও বলেন, মুসলিম শাসকদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যারা সরাসরি ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদকে সমর্থন করে। তারা সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদীদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে। ওইসব মুসলিম শাসককে রুখে দিতে হবে।
পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো।
রেডিও তেহরান: জনাব মাসুদ মজুমদার, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর তাৎপর্য কী?
মাসুদ মজুমদার: দেখুন, রাহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে আল্লাহ আমাদের রাসুলকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তিনি সারা বিশ্বের মানুষের মানবতার মুক্তির দূত। তাঁকে স্মরণ করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর বাণীকে স্মরণ করি, রাহমাতুল্লিল আলামিনকে স্মরণ করি। তাঁকে স্মরণের মাধ্যমে আমরা বর্তমানে যে পরিস্থিতিতে আছি তার উত্তরণ ঘটাতে চাই।
নানাভাবে আমরা নবীর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছি। আমাদের মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক স্খলন ও বিচ্যুতির মাত্রা এখন খুবই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় যদি আমরা আল্লাহর রাসুলকে চর্চা করি, অনুশীলন করি, তাঁকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করি তাহলে আমরা আমাদের হারানো গৌরব ফিরে পাব।
রাসুল (সা.) যে ভূমিকা পালন করেছিলেন আমরা যদি সেদিকে যাই, সিরাতের দিকে যাই তাহলে আমরা নিজেদের অস্তিত্ব আবার প্রমাণ করতে পারব। আর সে কারেণই ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)কে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি।
রেডিও তেহরান: জনাব মাসুদ মজুমদার, আপনি জানেন যে প্রতিবছর ১২ রবিউল আউয়াল থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল পর্যন্ত ইরানে ইসলামি ঐক্য-সপ্তাহ পালিত হয়। তো বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই ঐক্য সপ্তাহর গুরুত্ব কতটুকু?
মাসুদ মজুমদার: ইরানের ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (র.) এই ঐক্য-সপ্তাহ পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরমাধ্যমে সারা বিশ্বের মুসলমানদেরকে একতাবদ্ধ হওয়া, জাহেলিয়াত মুক্ত ইসলামে দিক্ষিত হওয়া, কুসংস্কার থেকে মুক্তি এবং যে বৈরী অবস্থার মধ্যে বর্তমানে আমরা আছি তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ছিল তাঁর এ আহ্বান।
বর্তমান বিশ্বে শাসক ও শোষিতের মধ্যে যে বিস্তর ব্যবধান তা কমিয়ে আনার জন্য ঐক্য সপ্তার ডাক দিয়েছিলেন ইমাম খোমেনী (র.)।
আমাদের মধ্যে যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কাজ করছে, বৈরী শক্তিগুলো যে ভূমিকা পালন করছে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই আমরা এই ঐক্য সপ্তাহ পালন করতে পারি।
ঐক্য সপ্তাহ পালনের মাধ্যমেই আমরা চিহ্নিত করতে পারব মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্যের কারণগুলো। আর ঐক্যের জন্য, মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর নবী যে ভূমিকা পালন করেছিলেন সেদিকেও আমরা ফিরে আসতে পারব।
'আল্লাহর নবী এবং আল্লাহ' এই দুটোর সাথে একমত হতে পারলেই মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য সম্ভব। ইরানের ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ পালনের মধ্যে সেখানে প্রত্যাবর্তনের একটা তাগিদ আছে। ফলে এই ঐক্য সপ্তাহ পালনের মধ্যে আমরা সুফল ও কল্যাণ দেখছি। ফলে সবাইকে ঐক্য সপ্তাহ পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।
রেডিও তেহরান: আচ্ছা, মুসলমানদের মধ্যকার অনৈক্যের কারণগুলো কি বলে আপনি মনে করেন।
মাসুদ মজুমদার: বর্তমানে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্যের প্রধান কারণ হলো আমরা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়েছি। আমরা আল্লাহর নবীর আদর্শ থেকে দূরে সরে গেছি। জাহেলিয়াতের মধ্যে ঢুকে পড়েছি।
আমাদের মধ্যে বস্তুবাদের আকর্ষণ বেশি হয়েছে। আমাদের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সামাজিক অনাচার চেপে বসেছে। দেখা যাচ্ছে আমাদের মধ্যে কেউ পাশ্চ্যত্য আবার কেউ প্রাচ্যপন্থি। কেউ রাশিয়া, কেউ চীনপন্থি আবার কেউ সৌদি আরবপন্থি। এভাবে ভাগ হয়ে গিয়ে আমরা মূল কালেমা তাইয়্যেবা থেকে দূরে সরে গেছি। আমাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যদি রাসুলে খোদার আদর্শে ফিরে আসতে পারি তাহলেই মুসলমানদের মধ্যে আবার ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
রেডিও তেহরান: জনাব মাসুদ মজুমদার, অনেকে মনে করেন মুসলিম বিশ্বে অনৈক্য সৃষ্টির পেছনে আমেরিকা-ইসরাইল নানাভাবে কাজ করছে। তারা দায়েশের মতো সন্ত্রাসীগোষ্ঠী সৃষ্টি করে ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুসলমান নামধারী কতিপয় শাসকগোষ্ঠী আমেরিকা-ইসরাইলের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে। এই অবস্থায় মুসলিম বিশ্বে কিভাবে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব?
মাসুদ মজুমদার: দেখুন, হান্টিংটন সভ্যতার সংঘাতের কথা বলেছেন এবং পশ্চিমা সভ্যতা ও সমাজবাদী সভ্যতা সেটাকে সেটাকে গ্রহণ করেছে। সেই সংঘাতটা হচ্ছে ইসলাম বনাম বস্তুবাদ, ইসলাম বনাম সাম্রাজ্যবাদ। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই অবস্থাটা তৈরি করেছে। আর এরমধ্যে জড়িয়ে গেছে মুসলমান নামধারী শাসক ও শোষকরা। ইহুদি-নাসারারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে এবং যার প্রতিনিধিত্ব করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর তাদের সহযোগী হিসেবে আমাদের শাসকগোষ্ঠীর একটি অংশ জড়িয়ে গেছে। এর সাথে রয়েছে ইসরাইল। তারা মানবতার ধর্ম ইসলামকে জঙ্গিবাদ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তারা পরিকল্পিতভাবে চাচ্ছে ইসলামের ভাবমর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করতে।
অথচ ইসলাম হচ্ছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান। ইসলামে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। হেদায়েতের মালিক আল্লাহ। আল্লাহর নবী বলেছেন- যার যার নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। ইসলামের সেই সুন্দর ব্যবস্থা এবং অবস্থান থেকে সরিয়ে নিয়ে কিছু মন্দ ভূমিকা পালনের ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। ফলে মুসলমানদের আজকের সংকট তৈরি হয়েছে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ একটাই-আর সেটি হচ্ছে ইসলামের শক্রদেরকে চিহ্নিত করে দূরে ঠেলে দিতে হবে এবং বন্ধুদের কাছে টানতে হবে। আর সে কারণে ইরানের ঐক্য সপ্তা পালনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আমরা ঐক্য সপ্তাহ পালনকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি।
রেডিও তেহরান: জনাব মজুমদার আপনি যে কথা বললেন, মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্যের পেছনে নানারকম ষড়যন্ত্র রয়েছে। মুসলমানদের শাসকগোষ্ঠীর একটা অংশ ষড়ন্ত্রকারীদের সাথে হাত মিলিয়েছে। তো এক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ মুসলমানদের করণীয় কী?
মাসুদ মজুমদার: আমার মতে- আগে মুসলমানদের শক্র-বন্ধু চিনতে হবে। মুসলমানদের মধ্যে মুনাফেক আছে। মুসলিম শাসকদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যারা ইসলাম পছন্দ করেন না। এমনও অনেকে আছেন যারা সরাসরি ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদকে সমর্থন করে। তারা সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদীদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে। ওইসব মুসলিম শাসককে বয়কট করতে হবে। যারা রহমাতুল্লিল আলামিনকে বিশ্বাস করে তাদেরকে নিয়ে নতুন করে ঐক্যের শপথ নিতে হবে। তাহলেই কেবল অনৈক্যের হাত থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হবে। আর সেক্ষেত্রে ঐক্য সপ্তাহ ভূমিকা পালন করবে বলে আমরা আশাবাদী।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৯