ডিসেম্বর ২৪, ২০১৭ ১৫:৫৭ Asia/Dhaka

গত পর্বে আমরা ফার্সি কবিতার জনক নামে খ্যাত কবি রুদাকির জীবনী প্রসঙ্গে বলেছি রুদাকি কেবল কবিতাই লেখেননি, তিনি ছিলেন সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ। রুদাকি ‘চাঙ্গ’ নামের বাদ্য যন্ত্র খুব ভালোভাবে বাজাতে পারতেন।

কোনো কোনো জীবনী-লেখক ও গবেষক মনে করেন রুদাকি ১৩ লাখেরও বেশি দ্বিপদী পংক্তি বা শ্লোক লিখেছেন। এই সংখ্যাটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে অতিরঞ্জন বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতার দিকে দৃষ্টি দিলে কিংবা তাঁর রচনাশক্তির দিকে তাকালে বিশেষ করে কালিলা এবং দেমোনার মতো বিশাল রচনার দিকে তাকালেই এই সত্য বাস্তব বলে মেনে নিতে অসুবিধা হবার কথা নয় । কিন্তু বর্তমানে তাঁর বিশাল কাব্য ভাণ্ডারের মধ্যে আমাদের হাতে যেটুকু কাব্য পংক্তিএসে পৌছেঁছে তার পরিমাণ এক হাজারেরও কম ।

বিশেষজ্ঞমহল রুদাকির কবিতার এই অবলুপ্তির বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন । রুদাকির ৩০০ বছর পর খোরাসান এবং উজবেকিস্তানের বেশ কিছু এলাকা কয়েকবার হামলার শিকার হয় । এসব হামলার ফলে ফার্সি সাহিত্য-সংস্কৃতির বহু নিদর্শন ধ্বংস হয়ে যায় । ধ্বংস হয় বহু লাইব্রেরী। নিহত হন বহু জ্ঞাণী-গুণী ও মনীষী । ফার্সি কবিতার জনকের কবিতা ভাণ্ডারও এই ধ্বংসলীলার হাত থেকে রেহাই পায় নি । রুদাকির মাসনাভিগুলো ছিলো দারুন জনপ্রিয় । সেই মাসনাভিগুলোও এখন আর অবশিষ্ট নেই । মাত্র শ'দুয়েক বয়াত বা পংক্তি অবশিষ্ট রয়েছে ।

মাসনাভির বাইরে রুদাকির অন্যান্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যেপ্রশংসাগীতি,কসিদা,গজল এবং মর্সিয়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিশেষজ্ঞরা রুদাকির বর্ণনার স্টাইল, উপমা ব্যবহারের শক্তি এবং প্রকৃতির সাথে তার কবিতার অর্থের মিল রাখার নিপুন ক্ষমতাকে নজিরবিহীন বলে প্রশংসা করেছেন।  

প্রাচীন ফার্সি সাহিত্যের যেসব নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়,সেসবের মধ্যে প্রশংসা গীতি ধারার রচনারই প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায় । প্রশংসা গীতিকাররা ছিলেন প্রাচীন কবিতার সম্রাট । তাদেরই ছিল সবচে বেশি কদর । ফার্সি কবিতায় তাই কসীদা রচয়িতাদের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে । রুদাকি নিজেও ছিলেন এই ধারার একজন শ্রেষ্ঠ কবি। এমনিতে রুদাকির কবিতার ভাষা ছিল সহজ-সরল বোধগম্য ও প্রাঞ্জল। সেজন্যে তাঁর লেখা সহজেই পাঠকদের আকৃষ্ট করতো। তাঁর লেখার এতো বেশি ভক্ত ছিলো যে,বহু কবি নিজেকে রুদাকির ছাত্র বলে পরিচয় দিয়ে গর্ব বোধ করতেন। 

রুদাকির শ্রেষ্ঠ যে শিল্পকর্মটি,তাহলো কালিলা ও দেমোনা। যদিও তার বিক্ষিপ্ত কিছু অংশ ছাড়া তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। সম্ভবত ৩২০ হিজরীতে তিনি এটি লিখেছেন। কারণ, মহাকবি ফেরদৌসী তাঁর শাহনামায় এ গ্রন্থটির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন তাঁর সমকালে এই গ্রন্থটির ভীষণ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা ছিল । কালিলা ও দেমোনা আসলে একটি অনুবাদ গ্রন্থ । এর মূল যে গ্রন্থটি তা ছিল ভারতীয়। বইটির নাম ছিল পঞ্চতন্ত্র । বোরযুইয়ে তাবিব এই পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থটি ইরানে নিয়ে আসেন এবং তিনি গ্রন্থটিকে পাহলভি ভাষায় অনুবাদ করেন। তারপর আব্দুল্লাহ বিন মাকফা বইটিকে আরবী ভাষায় অনুবাদ করেন।

সামানীয় শাসক নাসর বিন আহমাদের সময় তাঁর নির্দেশে এই গ্রন্থটি তাঁরই মন্ত্রী আবুল ফাযল বালামি দারি ফার্সিতে রূপান্তর করেন। তারপর আবু নাসর বালামির নির্দেশে রুদাকি বইটিকে কাব্যরূপ দেন । তাঁর সেই কাব্য কালীলা ও দেমোনা নামেই বিখ্যাত। এখন মাত্র ১১৫ টি বয়াত বা পংক্তি বিক্ষিপ্তভাবে পাওয়া যায় যার সূচনার দিকের কয়েকটি পংক্তিতে বলা হয়েছে:

 

هر که نامُخت (نیاموخت) از گذشت روزگار

نیز ناموزد ز هیچ آموزگار

تا جهان بود از سر آدم فراز

کس نبود از راز دانش بی نیاز

 

অর্থাৎ

অতীত হতে নেয়নি শিক্ষা যে জন
শিক্ষক থেকে কিছুই শেখে না সেই জন

সেই আদম থেকে আজতক সবে

ছুটছে জ্ঞান-রহস্যের পিছে, তা জানতেই হবে।

কালিলা ও দেমোনা ছাড়াও আরও ছয়টি দ্বিপদী বা মাসনাভি কাব্য গ্রন্থ লিখেছিলেন রুদাকি। তবে সেসব থেকে অতি অল্প কটি পংক্তি আজ টিকে আছে।

হিজরি চতুর্থ শতক বা খ্রিস্টিয় দশম শতক ছিল ইরানি ফার্সি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। বহু খ্যাতিমান কবি তাদের অসাধারণ শিল্পকর্ম উপহার দিয়েছেন এ যুগে। এইসব কবির মধ্যে দাকিকি তুসি অন্যতম।

ওস্তাদ আবু মানসুর মুহাম্মাদ বিন আহমাদ দাকিকি সামানিয় যুগের অন্যতম প্রধান বা বড় কবি।খুব সম্ভবত তিনি হিজরি চতুর্থ শতকের প্রথমার্ধে পূর্ব ইরানের তুস শহরে জন্ম নিয়েছিলেন। দাকিকিকে বলা হয় মহাকবি ফেরদৌসির অগ্রদূত।

দাকিকি যৌবনেই কবিতা লেখা শুরু করেন। আর খুব একটা বয়স্ক না হতেই নিজ দাসের হাতে নিহত হন। তিনি প্রথম দিকে কাসিদা ও গজল লিখেছেন। শেষের দিকে তিনি রাজা-বাদশাহদের প্রংশসাগীতি তথা শাহনামা জাতীয় গীতিকাব্য লেখায় হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যু তাকে সেই কাব্য সম্পূর্ণ করার সুযোগ দেয়নি।

দাকিকির এই অসম্পূর্ণ শাহনামা ‘গাশতাসবনামে’ সুপরিচিত। গাশতাসব ছিলেন ইরানের অন্যতম বাদশাহ। দাকিকির এই শাহনামা মুসলিম ইরানের অন্যতম সেরা বীরত্ব-গাঁথা হিসেবে খ্যাত। বিশেষজ্ঞদের মতে দারি ফার্সি কাব্য-সাহিত্যের পথিকৃতদের প্রসঙ্গ এলে দাকিকির নাম এড়িয়ে যাওয়া দুঃসাধ্য বিষয়।  

লুবাবুল আলবাব নামের বইসহ নানা বইয়ে দাকিকির নানা কাসিদা, গজল ও সাহিত্যকর্মের কথা আলোচিত হয়েছে। তবে দাকিকির অমর শিল্পকর্ম হল ‘গাশতাসবনামে’। 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৪