জানুয়ারি ১৬, ২০১৮ ১৩:১৯ Asia/Dhaka

আমাদের বহু ভাইবোন ইরানের কৃষ্টি-কালচারের পাশাপাশি এখানকার জনজীবন, বাজারঘাট, এখানকার বিভিন্ন পণ্য ইত্যাদি সম্পর্কে প্রায়ই জানতে চান। বিশেষ করে ইরানে কী কী ফলফলাদি পাওয়া যায় সে সম্পর্কে জেনে নিজেদের কৌতূহল নিবারণ করতে চান। ইরানের কৃষিপণ্য, বাগানের উৎপন্ন পণ্য, শিল্প কল-কারখানায় উৎপন্ন পণ্য সামগ্রি সম্পর্কেও জানতে চান।

আমরাও দীর্ঘদিন থেকেই ভেবেছিলাম আপনাদের এ সংক্রান্ত কৌতূহল মেটানোর লক্ষ্যে একটি ধারাবাহিকের আয়োজন করবো। কিন্তু সময় এবং সুযোগ হয়ে ওঠে নি এতোদিন।

"দেখবো ঘুরে ইরান এবার" ধারাবাহিকটি শেষ হয়ে যাওয়ায় সেই সুযোগটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি আমরা। এ আসরে "ইরানের পণ্য-সামগ্রী" নামে আমরা নতুন একটি ধারাবাহিক শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এ আসরে আপনারা আপনাদের সেইসব কৌতূহলপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন বলে আশা করি। আমাদের এই ধারাবাহিক মনযোগের সঙ্গে শুনে যদি আপনাদের মনে কোনো প্রশ্ন জাগে অবশ্যই আমাদের জানাতে দ্বিধা করবেন না। ইরানি বাজারের পণ্য সামগ্রীসহ রপ্তানীমুখি পণ্যগুলোর কথাও আমরা তুলে ধরবো এ আসরে। সুতরাং যারা সংস্কৃতিমনা কিংবা অর্থ ও বাণিজ্য নিয়ে যাদের কৌতূহল আছে, যারা বিশ্ববাজারের ওপর নজর রাখেন সবার জন্যই এ আসরটি উপযোগী হবে বলে মনে করি। তো চলুন কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক আজকের আসর। ও হ্যাঁ!

 পেস্তা বাদাম

কৃষিকাজের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। মানব সভ্যতার ইতিহাস যখন থেকে শুরু হয়েছে কৃষিকাজের ইতিহাসও সে সময় থেকেই শুরু হয়েছে। বলা বাহুল্য, বিশ্বের মধ্যে যেসব দেশে কৃষিকাজ প্রথম শুরু হয়েছিল ইরান সেইসব দেশের একটি। ভ্যাভিলভের মতো বিখ্যাত চিন্তাবিদগণ মনে করেন ক্ষেত-খামারে কৃষিকাজ ও উদ্ভিদের চাষের ক্ষেত্রে মৌলিক একটি কেন্দ্র ও উৎস ছিল ইরান। ইলাম প্রদেশের মেহরান প্রান্তর কিংবা চোগাগালন, কাশানের সিয়ালক টিলা, শুশ শহরে পাওয়া নিদর্শনাদির মতো ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে পুরাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে সেসব থেকে প্রমাণিত হয় শতাব্দির পর শতাব্দি আগে থেকেই ইরান বুনো গাছ গাছালি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ চাষে দক্ষতা অর্জন করেছে।

খাল কেটে কেটে কিংবা বিচিত্র উপায়ে পানির ব্যবস্থা করে উন্নত কৃষি পদ্ধতি চালু করেছে। রুশ মধ্যপ্রাচ্যবিদ পেট্রোসফস্কি ইরানের সাসানি যুগের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর লেখা একটি বইতে ইরানে বিচিত্র ফুল ও ফলের গাছের পাশাপাশি বহু রকমের সব্জি চাষের কথাও লিখেছেন। এসব গাছের মধ্যে একটি হলো "পেস্তা বাদাম" গাছ। সুদূর অতীতে জনগণ পেস্তার খোসা ফেলে দিয়ে ভেতরের বাদামটাকে ব্যবহার করে মজার একটি শক্তিবর্ধক খাবার তৈরি করতো। প্রাচীন দলিল দস্তাবেজ এবং ধর্মীয় লেখাতেও এই পেস্তার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। হিজরি তৃতীয় শতকে মুহাম্মাদ বিন জারির তাবারি পেস্তার জন্ম হজরত আদম (আ) এর সময়েই হয়েছে বলে মনে করতেন।

তাবারির লেখার কথা বলছিলাম। তিনি লিখেছেন: হজরত আদম (আ) পৃথিবীতে আগমনের সময় ত্রিশ প্রকারের ফল জমিনে দেয়া হয়েছিল। দশ প্রকারের ফল ছিল চামড়াযুক্ত, দশ প্রকারের ফল ছিল বিচিযুক্ত আর দশ প্রকারের ছিল চামড়া এবং বিচিহীন। আখরোট, পেস্তা, বাদাম ইত্যাদি ছিল চামড়া বা খোসাযুক্ত ফলের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র তাওরাতেও পেস্তার প্রসঙ্গ আনা হয়েছিল। বলা হয়েছে: ইউসুফ (আ) এর দরবারে ছেলেদের পাঠানোর সময় হযরত ইয়াকুব (আ) তাদের বলেছিলেন, ইউসুফের জন্য নিজেদের ভূখণ্ডের পণ্য যেন উপহার হিসেবে নিয়ে যায়। এই উপহার সামগ্রির মধ্যে পেস্তাও ছিল।

পেস্তা বাগান

পেস্তা গাছ প্রাপ্তিস্থান নিয়ে মতানৈক্য আছে। এর মত বৈচিত্র্যের কারণ সম্ভবত গবেষকগণ নির্দিষ্ট কোনো একটি জাতের পেস্তার কথা বলেন নি বরং বিভিন্ন জাতের পেস্তা তথা পেস্তা পরিবারের প্রতিই তাঁরা সামগ্রিক দৃষ্টি দিয়েছিলেন। সে কারণে পেস্তা গাছ রোপণ করা হতো যে যে এলাকায় তাঁরা সেইসব এলাকার নাম একত্রে উল্লেখ করে গেছেন। সুতরাং বিভিন্ন বিশ্বকোষে যেমন এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় পেস্তার উৎপাদন স্থান হিসেবে ইরান এবং এশিয়া মাইনরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আমেরিকান এনসাইক্লোপেডিয়ায় বলা হয়েছে, পেস্তা গাছের উৎসস্থল পশ্চিম এশিয়া। "ইরানি পেস্তা" নামক বইতে গ্রন্থকার মুহাম্মাদ হাসান আবরিশামি পেস্তা গাছ লাগানোর সূচনার প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছেন: "যে ভূখণ্ডটি প্রথমে পার্ত এবং পরবর্তীকালে খোরাসান নাম ধারণ করেছে সে এলাকাতেই পেস্তা গাছ সর্বপ্রথম লাগানো হয়েছিল"।  

খোরাসানের পশ্চিম প্রান্তে একেবারে নিশাবুর পর্যন্ত এই পেস্তা গাছের চাষ করা হয়েছিল এবং পূর্ব প্রান্তে বালখ আর জেইহুনের দুই দিকে পেস্তা গাছ লাগানো হয়েছিল। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণে দেখা গেছে, প্রাচীনকালে ইরান থেকে যত পেস্তা রপ্তানি করা হতো বেশিরভাগই ছিল এইসব এলাকার। মার্কিন ইরানবিদ বার্টোল্ড লুফার ১৯২৬ সালে তাঁর প্রকাশিত বইতে ইরানের স্থানীয় ফলফলাদির নাম উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি বিশেষ করে পেস্তার কথা লিখতে ভোলেন নি। তিনি এও লিখেছেন যে ইরানিদের জীবনে এই পেস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পেস্তাকে প্রাচীন ফার্সিতে বলা হতো পিস্তাকা। পাহলাভি যুগে বলা হতো পিস্তাক আর বর্তমানে বলা হচ্ছে পেস্তা।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/১৬