ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮ ১৭:২৩ Asia/Dhaka

ইরানের ইসলামি বিপ্ববের গৌরবময় ৩৯ তম বিজয় বার্ষিকী পালিত হয়েছে। বিপ্লবের প্রেক্ষাপট এবং বিপ্লব পরবর্তী সাফল্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমরা কথা বলেছি ইরান প্রবাসী বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক জনাব এ কে এম আনোয়ারুল কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেছেন, বিশ্বের দেশে দেশে স্বৈরাচারী শাসকদের একচেটিয়া শাসনের বিরুদ্ধে ইরানের ইসলামি বিপ্লব বিশ্বকে আশার আলো দেখিয়েছে।

আনোয়ারুল কবির আরো বলেন, ইসলামি বিপ্লব সফলতার পেছনে সঠিক নেতৃত্ব এবং নীতি ও কৌশল ছিল খুবই গুরুত্বপূণ। ইসলামি বিপ্লবের ক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে আলেমদের গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান:  ইরানের ইসলামী বিপ্লব ৩৯ বছর অতিক্রম করেছে। আপনার দৃষ্টিতে এ বিপ্লবের সবচেয়ে বড় বা প্রধান কয়েকটি সাফল্যের দিক কী?
 

এ কে এম আনোয়ারুল কবির: ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সাফল্যের জন্য দু-তিনটি বিষয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।
গত একশ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারি শাসকদের যে একচেটিয়া শাসন লক্ষ্য করেছি সেক্ষেত্রে ইরানের ইসলামি বিপ্লব একটি আশার আলো জাগিয়েছে। এক্ষেত্রে ইরানি জাতির প্রথম যে অর্জন সেটি হচ্ছে- অন্যান্য জাতি-রাষ্ট্রের মতো ইরানিরা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি পেয়েছে এমনটি তারা ভাবেনি বরং ইসলামি মূল্যবোধের জন্য এবং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা সংগ্রাম করেছে এটিই ছিল তাদের মূল ভাবনা। আর সেই ভাবনার লক্ষ্যে তারা পৌঁছতে পেরেছে। 
ইরানের লক্ষ্য ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সাম্রাজ্যবাদের বিরোধীতা সে লক্ষ্যে তারা পৌঁছতে পেরেছে। ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের প্রথম দিকেও ইরান যেভাবে সক্রিয় ছিল এখনও সেই একইভাবে সক্রিয় রয়েছে। ইরানের ইসলামি সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে এটাই তাদের বড় সাফল্য।

রেডিও তেহরান: ইরানের ইসলামি বিপ্লব ও ইসলামি রাষ্ট্র আধুনিক যুগে ইসলামি রাজনীতিসহ জনগণের অংশগ্রহণ-ভিত্তিক কার্যকর ইসলামি শাসনের একটি বাস্তব মডেল উপহার দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও   মুসলিম বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলে ইরানের মতো এমন সুদৃঢ় ও কার্যকর এবং অনন্য ইসলামি শাসন-ব্যবস্থা দেখা যায় না। সংক্ষেপে এর মূল কারণগুলো কি হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
 

এ কে এম আনোয়ারুল কবির: দেখুন, আমার কাছে মনে হয়েছে-ইরানের বিপ্লবী আলেমরা বিপ্লবের শুরু থেকেই সঠিক নেতৃত্ব এবং নীতি ও কৌশল গ্রহণ করেছিল। ইসলামি বিপ্লবের ক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে আলেমদের গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এমনটি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে লক্ষ্য করি না। সেসব দেশে শক্তিশালী চিন্তাবিদের অভাব রয়েছে। তাছাড়া ইসলামের বিপরীতে যেসব মতবাদ রয়েছে তার বিরুদ্ধে  ইসলামের পক্ষ নিয়ে কোনো শক্তিশালী জবাব আলেম এবং চিন্তাবিদদের পক্ষ থেকে আমরা দেখি না। একইসাথে একটি বিপ্লবকে সফল করার জন্য যে যোগ্য নেতৃত্ব এবং জনগণের সাথে নেতাদের গভীর সম্পর্ক ও একাত্মতা সেটাও দেখা যায় না। 

তাছাড়া ইসলামি সরকারের প্রতি জনগণের যে পরিমাণ আনুগত্য থাকা দরকার সেটি অন্যান্য ইসলামি দেশগুলোতে দেখতে পাওয়া যায় না। তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি এখানের আলেমদের প্রতি গোটা জাতির আনুগত্য ছিল এবং বিপ্লবের ক্ষেত্রে ঐক্য ছিল। ইরানি জাতি মনে করেছে যে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি এবং আলেমদের প্রতি সমর্থন জানাই তাহলে আমাদের মধ্যে ইসলামকে নিয়ে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে পারব। আর  সে লক্ষ্যেই ইরানি জাতি আলেম সমাজের প্রতি সমর্থন দিয়েছিল এবং গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল।

রেডিও তেহরান: মরহুম ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে এবং তিনি দীর্ঘ দিন ধরে ইরানের ইসলামি রাষ্ট্রকে নানা ক্ষেত্রে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন। ইসলামি ঐক্য প্রতিষ্ঠা, মজলুম জাতিগুলোর প্রতি সহায়তা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আপোষহীন সংগ্রামের ধারাসহ ইসলামি বিপ্লবের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনাগুলো কী এখনও আগের মতো জোরালো রয়েছে, না দুর্বল হয়ে গেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে?  
 

এ কে এম আনোয়ারুল কবির: দেখুন, ইরানের ইসলামি বিপ্লব বিভিন্ন সময়ে অনেক চড়াই উৎরাই পার করেছে একথা সত্য কিন্তু ইসলামি বিপ্লবের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং জনগণের একাত্মতা ছিল সেটা এখনও অটুট রয়েছে। পবিত্র রমজান মাসে ফিলিস্তিনীদের প্রতি একাত্মতা পোষণ করে যে আল কুদস দিবস পালন করা হয় সেখানে দেখা যায় গোটা ইরানি জাতি স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। বাইশে বাহমান যে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকী পালিত হয় সেখানেও দেখা যায় গোটা জাতি অংশগ্রহণ করে। এই ইসলামি বিপ্লব যে ইরানি জাতির নিজস্ব তার প্রমাণ তারা বাইশে বাহমানে রাজপথে দিয়ে থাকে।

রেডিও তেহরান: মরহুম ইমাম খোমেনীর ইন্তেকালের পর থেকে এ পর্যন্ত গত প্রায় তিন দশক ধরে ইরানের ইসলামী রাষ্ট্র ও বিপ্লবের মূল কান্ডারির দায়িত্ব পালন করছেন আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী। দেশের সার্বিক উন্নতিসহ এ বিপ্লবের সংরক্ষণ ও উন্নয়নে এবং বিশেষ করে বিশ্ব-রাজনীতিতে ইসলামি ইরানের আজকের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা, যোগ্যতা ও সাফল্যকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? 
 

এ কে এম আনোয়ারুল কবির: দেখুন, গত ১০ থেকে ১২ বছরে আমরা ফিলিস্তিনে যে ইন্তিফাদা বা পুনর্জাগরণ লক্ষ্য করেছি তার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরাইল বহুবার গাজায় হামলা চালিয়েছে। আর সেসব হামলার সময় ইরানের সরাসরি উপস্থিতি ছিল। ফিলিস্তিনীদের প্রতি শুধুমাত্র সমর্থনই নয় সবরকমের সহযোগিতা করেছে এবং করছে ইরান। কিছুদিন আগে হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কাছে লেখা চিঠিতে সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

ইরানের  লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে সফল বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান রাহবার আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ৩০ বছর ধরে যোগ্যতার সাথে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই আমরা লক্ষ করি বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি। রাহবার তাঁর দূরদর্শী চিন্তা-দর্শন দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনাকে জাগ্রত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর প্রতি জনগণের গভীর ভালোবাসা দেখতে পাই বিভিন্ন জনসভায়। ইরানের যেকোনো স্থানের জনসভায় রাহবার গেলে সেখানে মানুষের ঢল নামে। তাঁকে ইরানি জনগণ আন্তরিকভাবে সম্বর্ধনা দেন। তাঁর নির্দেশে সিরিয়ায় এবং লেবাননের হিজবুল্লাহকে ইরান সাহায্য ও সহযোগিতা করে যাচ্ছে। তিনি ইরানের জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতন। ইরানি জাতির অধিকারের প্রতি রাহবারের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে পারমাণু বিষয়ে সমঝোতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। জটিল কোনো বিষয়ে তিনি বারবার সরকারকে দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। ইরানের স্বার্থ যাতে কোনোভাবে ক্ষুন্ন না হয় সেজন্য তিনি সবসময় সরকারকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন । জনগণের প্রতি রাহবারের ভালোবাসা এবং রাহবারের প্রতি জনগণের ভালোবাসা যেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত।#


পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২২