জুন ২৪, ২০১৮ ১৬:২১ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা ইরানের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প নিয়ে কথা বলেছি। আজকের আসরে আমরা ইরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-চামড়াশিল্প নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

ইরানি চামড়াশিল্প

আপনারা জানেন যে চামড়া শিল্প পৃথিবীর প্রাচীনতম শিল্পগুলোর একটি। ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী মানুষ যখন জামা কাপড় তৈরি করতে শেখে নি তখনও তারা তাদের শরীর ঢাকতো। শীতে উষ্ণতার প্রয়োজনে, প্রখর রোদে ছায়ার প্রয়োজনসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রয়োজনে মানুষ তাদের শরীর ঢাকতো বিভিন্ন পশুর চামড়া দিয়ে। কালের পরিক্রমায় মানুষ শিখেছে কীভাবে পদার্থ ও রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে পশুর ওই চামড়াকে শিল্পে পরিণত করা যায় এবং সেটাকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করা যায়। যাই হোক, ইরানের এই চামড়া শিল্পের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। আমরা আজ এ বিষয়ে কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

বলছিলাম চামড়াশিল্প বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন একটি শিল্প। ইরানেও এই শিল্পের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। প্রাচীনকালের যেসব শিল্প ও নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলোর মধ্যেও এই চামড়া শিল্প যথেষ্ট প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ বলে প্রমাণ হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব ভাস্কর্য, ঐতিহাসিক বিভিন্ন নকশা ও ডিজাইন পাওয়া গেছে সেগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে বহু দেশই সভ্যতার দিক থেকে ছিল অগ্রসর ও সমৃদ্ধ। ইরান সেসব দেশের একটি। এই সভ্যতার সমৃদ্ধির পাশাপাশি আরও যে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে তাহলো মানুষের জীবনে সেই প্রাচীনকাল থেকেই চামড়ার প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার কত বেশি জমকালো ছিল। ইরানে প্রায় তিন হাজার বছর আগে থেকেই চামড়া শিল্পে সক্রিয় তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়।

ইরানের চামড়া শিল্পে এই তিন হাজার বছরের তৎপরতা থেকে যেটা অনুমিত হয় তাহলো চামড়া শিল্পের শিল্পপতি কিংবা শ্রমিক শ্রেণীর মেধাবী পদক্ষেপ। তাদের কর্মতৎপরতায় বিভিন্ন রকমের পোশাক আশাক তৈরি, জুতা তৈরি, ঘোড়ার লাগামসহ ঘোড়াকে গাড়ির সঙ্গে জোড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি তৈরি করাসহ ঘরে ব্যবহার্য বিভিন্ন তৈজস তৈরিতেও এই চামড়ার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। অ্যাঙ্গেলবার্ট ক্যাম্পফার কিংবা জন শার্দিনের মতো ফরাসি ভুবন পর্যটকগণ সাফাভি শাসনামলে ইরান সফর করেছিলেন। সফর শেষে তারা তাদের ভ্রমণ বৃত্তান্তে ইরানের চামড়া শিল্পের বাজার এবং এ বিষয়ক তৎপরতার জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থার কথা লিখেছেন। এ প্রসঙ্গে আমরা আরও কথা বলবো একটু মিউজিক বিরতির পর।

ফরাসি ভুবন পর্যটকদের লেখা ভ্রমণ বৃত্তান্তে ইরানের চামড়া শিল্পের উল্লেখের কথা বলছিলাম। পর্যটক শার্দিন চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রে ইরানি শিল্পীদেরকে অপরাপর শিল্পীদের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ ও নিপুণ বলে মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে ট্যানারির কাজে তথা পশুর চামড়া পরিশোধন করা এবং চামড়ায় পরিণত করার কাজের ক্ষেত্রে ইরানি শিল্পীদেরকে অতুলনীয় ও অনেক বেশি দক্ষ বলে প্রশংসা করেছেন তিনি। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছেন সে সময় ইরান থেকে ঘোড়া,গাধা ইত্যাদির কর্কশ কাঁচা চামড়া পরিশোধন করে ভারতসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করা হতো। এ বিষয়ে তিনি বেশ খোলামেলা আলোচনা করেছেন। এ ধরনের চামড়াকে বলা হতো 'সগারি' চামড়া।  সাফাভি শাসনামলে 'সগারি' বলতে সাধারণত তাব্রিজ শহরে যেসব চামড়া পরিশোধন করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা হতো সেগুলোকেই বোঝানো হতো।

এই সগারি চামড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বুট ও জুতা তৈরি করার কাজেই ব্যবহার করা হতো। এগুলো বেশ দামী পণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। সাধারণত ধনী লোকেরাই এসব জুতা ব্যবহার করতে পারতো কিংবা সাফাভি শাসনামলের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। ইরানে চামড়া দিয়ে তৈরি বিচিত্র হস্তশিল্পেরও ব্যবহার ছিল প্রচুর। বই বা কিতাবের কভার তৈরি করা হতো চামড়া দিয়ে। চামড়ার ওপরে তাপ দিয়ে নকশা করা হতো। চামড়ার ওপর বিভিন্ন ডিজাইন ও দৃশ্য আঁকা হতো। একইভাবে চামড়া কেটে কেটেও বিভিন্ন ডিজাইন তৈরি করা হতো। এইসবই চামড়া শিল্পীরা হাতে তৈরি করতো সুনিপুণভাবে এবং এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো বিভিন্ন ধরনের চামড়া।

চামড়া শিল্পের সমৃদ্ধ ইতিহাসে ইরানের যেসব শহর এই শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল সেসব শহরের মধ্যে রয়েছে তাবরিজ, শিরাজ এবং হামেদান। এই শহর কয়টিকে তখনকার যুগের মানুষেরা চামড়া শিল্প পণ্যের শহর হিসেবেই চিনতো। হামেদান শহরটি ছিল ইরানের সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকেও ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ। কাজার শাসনামলে শহরটি ছিল রাজধানী। এই শহরের চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পপণ্য এতো বেশি উন্নত ও বিশ্বখ্যাত ছিল যে 'হামেদানি চামড়া' একটি পরিভাষায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। হামেদানি চামড়ার অনন্য বৈশিষ্ট্যটি ছিল এটা দুম্বার চামড়া থেকে তৈরি করা হতো। হামেদানের পাশাপাশি এই কাজারি আমলে আস্ফাহান, তাব্রিজ শহরের চামড়াও রাশিয়া, ভারত এবং বর্তমান তুরস্ক তথা তৎকালীন ওসমানী সাম্রাজ্যে রপ্তানি করা হতো।

সামগ্রিকভাবে চামড়াকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। পাতলা, মোটা এবং আধা-মোটা। এগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো সময় আজ আর আমাদের হাতে নেই।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/  ২৪