ইরানের পণ্য-সামগ্রী: ইরানি চামড়াশিল্প (২)
ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত বিচিত্র সামগ্রীর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের সাপ্তাহিক আয়োজন "ইরানের পণ্য সামগ্রী" শীর্ষক আসরের আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

গত আসরে আমরা ইরানের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-চামড়াশিল্প নিয়ে কথা বলেছি।
বলেছিলাম যে, সামগ্রিকভাবে চামড়াকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। পাতলা, মোটা এবং আধা-মোটা বা মাঝামাঝি ধরনের মোটা। এগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো সময় গত আসরে আমাদের হাতে ছিল না। সুতরাং আজকের আসরে এ নিয়েই আলোচনা শুরু করবো ইনশাআল্লাহ।
পাতলা চামড়া বলা হয় সেসব চামড়াকে যেগুলো দুম্বা, ছাগল বা এ ধরনের পশু থেকে পাওয়া যায়। এ ধরনের চামড়া বেশ হালকা-পাতলা এবং নরম। এ ধরনের পাতলা চামড়া দিয়ে হাতের গ্লবস, জামা, কোট জাতীয় পোশাক তৈরি করা হয়। আর যেগুলো তেমন একটা উন্নত নয় সেগুলো দিয়ে জুতা বা কভার টাইপের পণ্য সামগ্রি তৈরি করা হয়। মাঝামাঝি ধরনের মোটা চামড়াগুলো কুমির জাতীয় জন্তু থেকে পাওয়া যায়। এগুলো যেহেতু সহজলভ্য নয় সেজন্য এই শ্রেণীর চামড়ার দাম একটু বেশি। সুতরাং দামি চামড়াগুলো দিয়ে সৌখিন বা আরামপ্রদ জিনিসপত্র তৈরি করা হয় কিংবা গৃহসজ্জার কাজে ব্যবহার করা হয়। আর মোটা চামড়াগুলো আসে গরু, মহিষ, উট ইত্যাদি এই জাতীয় পশু থেকে। এই মোটা চামড়া দিয়ে জুতার তলি যাকে আউট-সোল বলা হয় এবং জুতার শুকতলা ইত্যাদি তৈরি করা হয়। শক্ত এবং মজবুত হবার কারণে কল-কারখানার বিভিন্ন মেশিনের বেল্টও তৈরি করা হয় মোটা চামড়া দিয়ে।
مراحل تولید چرم
বিভিন্ন ধরনের পশুর চামড়ার মধ্যে গরুর চামড়া তুলনামূলকভাবে একটু নরম। বিশেষ করে মহিষের চামড়ার চেয়ে নরম এবং দুম্বার চামড়া থেকে একটু পুরো হবার কারণে অন্যান্য পশুর চামড়ার তুলনায় গরুর চামড়াই বেশি ব্যবহৃত হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে চামড়াশিল্পের ইতিহাস যদিও তাঁত এবং বুণন শিল্পেরও আগের তবু বলাই বাহুল্য যে এই চামড়া শিল্পের প্রযুক্তি ও কারিগরি উন্নয়ন বিগত দুই শতাব্দিতে খুব একটা ঘটে নি। চামড়া শিল্পের শ্রমিকেরা বা প্রক্রিয়াজাতকারী জনশক্তি এখনও বেশ কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করে পশুর কাঁচা চামড়া থেকে মূল চামড়াটিকে পৃথক করে। বিচিত্র রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যে তারা চামড়া তার প্রাথমিক অবস্থা থেকে বের করে এনে স্থায়ী এবং নষ্ট না হবার মতো অবস্থায় পরিবর্তন করে। এ নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো খানিক মিউজিক বিরতির পর।
চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। এ কাজটা যেখানে করা হয় তাকে বলা হয় ট্যানারি। লবণ দেওয়া চামড়াকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় পরিণত করার প্রাথমিক পর্যায়ে পশুর চামড়াকে তিন থেকে ছয়দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। পানিতে ভেজানোর ফলে চামড়া থেকে লবণ বেরিয়ে যায় এবং শুষ্ক ভাবটাও কেটে যায়। এরপর ধোয়া হয়। ধোয়ার পর চামড়ায় লেগে থাকা পশম ও বাড়তি গোশতগুলোকে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর একটা বিশেষ তরলে বা চুনের জলে ভিজিয়ে রাখা হয় যাতে চামড়ায় খামিরের মতো জমে যাওয়া অংশগুলো ফেলে দেয়া যায়। এই অবস্থায় কেবল বাড়তি চর্বি কিংবা মাংসই নয় বরং পশমগুলোকেও খুব সহজেই পরিষ্কার করে ফেলা যায়। এগুলো না ফেললে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। সেজন্যই এগুলো ফেলতে হয়। কখনো ফিটকিরিও ব্যবহার করা হয়। এসব বাড়তি জিনিস পরিষ্কার করা হলে চামড়া নরম হয়।
লবণের ব্যবহার বেশ কয়েক পর্যায়ে করা হয়। বাড়তি জিনিস পরিষ্কারের পরও লবণ-তরলে ফেলা হয় চামড়াকে। ছোটো ছোটো কূপ বা গর্ত করে তাতে লবণ জল দেয়া হয় এবং সেই তরলে চামড়াগুলোকে ডুবিয়ে রাখা হয়। দুই থেকে দশদিন পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখে চেষ্টা করা হয় যাতে জল চামড়ায় ভালোভাবে প্রবেশ করে। তারপরে চামড়াকে শুকানো হয়। লবণ জলে ভেজানোর ফলে ওই চামড়া আর দূষিত বা নষ্ট হয় না। রোদে আধাআধি শুকানোর পর বিশেষ ধরনের পাথর দিয়ে ঘঁষা দেয়া হয় যাতে লবণ-স্ফটিকের স্তর না থাকে। এই পর্ব শেষ হলেআধা শুকনো চামড়াটিকে আবারও রোদে দিয়ে পুরোপুরি শুকানো হয়। এরপর পশুর চর্বি ব্যবহার করে চামড়াকে নরম করা হয় এবং সবশেষে ধোয়া হয়। চামড়াকে রঙীন করার জন্য প্রাচীনকালে বিশেষ ধরনের উদ্ভিদ বা হারবালের সাহায্যে তৈরি কমলা রঙ ব্যবহার করা হত।
চামড়ার রঙ নিয়ে কথা বলছিলাম। আজকাল চামড়া শিল্পের বাজারে বিচিত্র রঙ চলে এসেছে। তারপরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন সেই কমলা রঙই চামড়ার প্রকৃত রঙটি ধরে রেখেছে। যাই হোক,রঙ লাগানোর পর চামড়া শুকিয়ে গেলে চকচকে ভাবটা আনার জন্য ইয়াশ্ম পাথর ব্যবহার করা হয়। এটা এক ধরনের সবুজ এবং পরিষ্কার পাথর। ভালোভাবে পরিশোধিত চামড়া পোড়ে না,নষ্ট হয় না,গন্ধ হয় না। প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে চামড়াকে ব্যবহারযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করতে তিন মাসের মতো সময় লাগে। অবশ্য আধুনিক প্রযুক্তি আসার ফলে এখন চামড়ার গুণগত মান যেমন বেড়েছে তেমনি ত্বরান্বিত হয়েছে এর প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজও। বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে ইরানের হামেদান ও তাব্রিজ শহরে আধুনিক প্রযুক্তিময় কারখানা গড়ে ওঠায় প্রাচীন পদ্ধতি প্রায় বিলুপ্ত হবার পথে।পরবর্তীকালে মাশহাদ,তেহরানসহ আরও অনেক শহরে চামড়ার কারখানা গড়ে উঠেছে।
শহরের নামে পরিচিত চামড়াগুলো এবং চামড়ার তৈরি পণ্য সামগ্রি এখন ইরানের বিভিন্ন শহরসহ দেশের বাইরেও রপ্তানি হচ্ছে। পোশাক,ব্যাগ, জুতা,চামড়ার কার্পেট,মানিব্যাগ,সোফাসেটসহ আরও বিচিত্র সামগ্রি তৈরি হয় এসব চামড়া দিয়ে। ছাগল বা দুম্বার পাতলা চামড়া উৎপাদনের দিক থেকে ইরান মৌলিক তিনটি দেশের একটি। চামড়া শিল্পের জন্য বিশ্বে ইরানের অবস্থান তাই গুরুত্বপূর্ণ। পাতলা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ ক্রমান্বয়ে উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। ভবিষ্যতে ইরানের অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের পাশাপাশি চামড়া শিল্পও স্থান করে নেবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। #
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ৩০