সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৮ ১৫:৪৫ Asia/Dhaka

কারবালার মহাবিপ্লব ইসলামী পুনর্জাগরণ ও মৃতপ্রায় ইসলামের প্রাণ-সঞ্জীবনের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে চির-ভাস্বর হয়ে আছে।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র প্রচারিত মহান ইসলাম ধর্ম এবং উদীয়মান ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য শয়তানের দোসর আর শত্রুদের প্রচেষ্টার কখনও কোনো কমতি ছিল না। শত্রুরা যখন প্রকাশ্যে ইসলামকে মোকাবেলা করার সর্বাত্মক চেষ্টায় ব্যর্থ হল তখন তারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ও মুসলমান সেজেই ভেতর থেকে এই মহান ধর্মের ওপর আঘাত হানতে সচেষ্ট হল যাতে এই ধর্মের মূল শিক্ষা, চেতনা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিকৃত এবং বিলুপ্ত হয়। বৃহত্তর মুসলিম সমাজের নানা উদাসীনতা ও কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের চক্রান্তের পরিণতিতে ইসলামের এক সময়কার চরম শত্রু উমাইয়ারা মুসলমানদের নেতৃত্বের পদ দখল করে। তারা পবিত্র ইসলামী সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয় রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র।

উমাইয়ারা ইসলামী নেতৃত্বের প্রকৃত হকদার এবং মুসলিম সমাজের সবচেয়ে যোগ্য, জ্ঞানী ও খোদাভীরু ব্যক্তিদের তথা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য যুদ্ধ ও সংঘাতের পাশাপাশি রাজকীয় কোষাগারের সীমাহীন অপব্যবহারেও অভ্যস্ত ছিল। অর্থ-সম্পদ,ভোগ-বিলাস ও রাজকীয় পদমর্যাদার লালসায় নিমজ্জিত দরবারি আলেমরা বিশ্বনবীর পবিত্র আহলে বাইতকে বিদ্রোহী এবং পথভ্রস্ট বলে ফতোয়া দিয়েছিল। এর পাশাপাশি তারা  উমাইয়া নেতাদের ফজিলত ও মাহাত্ম্য তুলে ধরার জন্য রচনা করেছিল শত-সহস্র বা লক্ষাধিক জাল হাদিস।

উল্লেখ্য, উমাইয়া শাসক আমির মুয়াবিয়া সিরিয়ার জনগণকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষী প্রচারণায় এতোটা প্রভাবিত ও মাতিয়ে রেখেছিল যে আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ) যখন পবিত্র রমজান মাসে কুফার মসজিদে এক ধর্মান্ধ খারিজির সন্ত্রাসী হামলায় শহীদ হন তখন সিরিয়ার অনেকেই বিস্মিত হয়ে বলেছিল: আলী কি মসজিদে যেতো ও নামাজ পড়তো!!?

বলা হয় সিরিয়ার জনগণকে শৈশবেই আলী-বিদ্বেষী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মুয়াবিয়ার নেতৃত্বাধীন শাসক-গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে শিশুদের জন্য ছাগল-ছানা উপহার হিসেবে পাঠানো হত। আর শিশুরা যখন ওই মেষ শাবক নিয়ে খেলাধুলায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠার কারণে এর গভীর অনুরাগী হয়ে উঠত তখন  রাজ-দরবারের কর্মীরা এক রাতে ওই ছাগল-ছানা নিয়ে যেত। আর কে ওই ছাগল-ছানা নিয়ে গেছে শিশুরা তা জানতে চাইলে বলা হত আলী ওই ছাগল ছানা নিয়ে গেছে!! ফলে শৈশবেই সিরিয় শিশুদের কচি-মনে জন্ম নিত আলী (আ.) ও আহলেবাইতের প্রতি বিদ্বেষ। তাই বিশ্বনবীর (সা) প্রাণপ্রিয় নাতী ইমাম হুসাইন ও তাঁর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য এবং অনুরাগীরা কারবালায় মহানবীরই এইসব বিভ্রান্ত উম্মতের হাতে চরম নৃশংসতা ও পৈশাচিকতার শিকার হওয়াটা বিস্ময়ের কোনো ব্যাপার ছিল না। ক্ষমতা-লোভী উমাইয়া শাসক মুয়াবিয়া সন্ধি-চুক্তি লঙ্ঘন করে ইমাম হাসানকেও বিষ-প্রয়োগে শহীদ করেছিল এবং তার চরম লম্পট ছেলে ইয়াজিদকে যুবরাজ পদে আসীন করার উদ্যোগ নেয়। শ্রোতা ভাইবোনেরা, আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খানের কণ্ঠে শুনব ইমাম হুসাইন সম্পর্কিত একটি হাদিস: 

আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত: মহানবী (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি হাসান ও হুসাইনকে ভালবাসে সে আমাকেই ভালবাসে আর যে হাসান ও হুসাইনকে ঘৃণা করে সে আমাকেই ঘৃণা করে।

অনেকেই এ প্রশ্ন করতে পারেন যে ইমাম হুসাইন (আ) যে বিপ্লব করতে চেয়েছেন তা তাঁর বড় ভাই বা পিতা কেন করেননি? আসলে ইমাম হুসাইন (আ)'র সময় যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল তার সঙ্গে অতীতের ও পরের পরিস্থিতিগুলোর কোনো মিল নেই। একই পরিস্থিতিতে বিশ্বনবী (সা)'র অন্য সদস্যরা বা আহলে বাইতের অন্য ইমামরাও একই কাজ করতেন। আর এ জন্যই বিশ্বনবী বলেছিলেন যে, কিয়াম বা বিপ্লব করুক বা না করুক হাসান ও হুসাইন মুসলমানদের ইমাম বা নেতা।

যাই হোক্, তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের জনগণ মুয়াবিয়ার শোষণ ও শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। মুয়াবিয়ার রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক নিয়োগের নীতিতে ইয়াজিদের মত লম্পট ও প্রকাশ্য অনাচারীকে মুসলিম জাহানের খলিফার পদে বসায় জনগণ আরও বেশি অসন্তুষ্ট হয়। এ অবস্থায় অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি ইমাম হুসাইন (আ)'র সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন এবং তারা ইমামের প্রতি তাদের সমর্থন ও সহানুভূতির কথা ঘোষণা করেন। কুফায় ইমাম হুসাইনের (আ) একদল রাজনৈতিক সমর্থক ইয়াজিদের অবৈধ শাসনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ইমাম হুসাইন (আ)-কে বিপ্লব করার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লেখে এবং তারা কুফায় ইমামকে আশ্রয় দেয়ারও অঙ্গীকার করে।

কুফায় ইমামের প্রতি বিপ্লবের আহ্বান জানিয়ে যারা চিঠি লিখেছিল তাদের সংখ্যা ছিল হাজার হাজার এবং  চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সমর্থকের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ।

কিন্তু ইমাম হুসাইনের এই রাজনৈতিক সমর্থকরা কুফায় মনোনীত ইয়াজিদের গভর্নর ইবনে জিয়াদের সৃষ্ট ত্রাস ও সন্ত্রাসের মুখে ইমামকে সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতিকে অমান্য করে। #

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৫

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন