রাতের আঁধারে রাষ্ট্রপ্রধান অপহৃত: আন্তর্জাতিক আইনের মৃত্যুঘণ্টা কি বেজে উঠল?
ড. হেদায়েতুল্লাহ সাজু: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে রাতের আঁধারে কারাকাস থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া, তাকে নিউ ইয়র্কে এনে বিচারের মুখোমুখি করা এবং আরও কয়েকটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সামরিক ও রাজনৈতিক হুমকি দেওয়া—এই ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুধু কূটনৈতিক উত্তেজনাই সৃষ্টি করেনি, বরং আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নিয়েই এক গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
এই বিতর্ক কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার বিষয় নয়। প্রশ্নটি আরও মৌলিক—একটি সার্বভৌম দেশের ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে একতরফাভাবে গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করা কি আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং মানবাধিকারের চূড়ান্ত অবসানের ইঙ্গিত নয়?
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব: আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ড
জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে,কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এই নীতিই আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি।
রাষ্ট্রপ্রধান কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনি প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে আন্তর্জাতিক অনুমোদন ছাড়া কোনো বিদেশি শক্তি যদি তাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালায় বা গ্রেপ্তার করে, তা কার্যত পুরো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ‘আইনের শাসন’ থেকে সরিয়ে ধীরে ধীরে ‘বলদর্পী শাসন’-এর দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে নিয়ম নয়, ক্ষমতাই শেষ কথা।
ভৌগোলিক সীমার বাইরে আইন প্রয়োগ
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তার নিজ দেশের ভূখণ্ড থেকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি মূলত extra-territorial enforcement বা ভৌগোলিক সীমার বাইরে গিয়ে আইন প্রয়োগের একটি চরম উদাহরণ।
আন্তর্জাতিক আইনে এই ধরনের আচরণ অত্যন্ত বিতর্কিত এবং সাধারণত অবৈধ বলে বিবেচিত। কোনো রাষ্ট্র নিজের আইন অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর করতে পারে না, যদি না সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সম্মতি, প্রত্যর্পণ চুক্তি অথবা আন্তর্জাতিক আদালতের স্পষ্ট অনুমোদন থাকে।
এই ক্ষেত্রে এসবের কোনোটিই উপস্থিত নয়। ফলে এটি আইন প্রয়োগ নয়, বরং শক্তি প্রদর্শনের একটি নজির, যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভারসাম্যকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নিউ ইয়র্কে বিচার: আদালত কি রাজনৈতিক হাতিয়ার?
মাদুরোকে নিউ ইয়র্কে এনে বিচারের মুখোমুখি করার সিদ্ধান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ বা অভিযোগ কি অন্য দেশের আদালতে বিচারযোগ্য হতে পারে?
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে উত্তর স্পষ্ট। কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রের ফৌজদারি আদালতের এখতিয়ার নেই, যদি না আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বা জাতিসংঘ অনুমোদিত কোনো ট্রাইব্যুনাল সে এখতিয়ার দেয়।
নিউ ইয়র্কে বিচার মানে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একই সঙ্গে অভিযোগকারী, গ্রেপ্তারকারী এবং বিচারক হিসেবে দাঁড় করানো। এটি ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আদালতকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
রাষ্ট্রপ্রধানের দায়মুক্তি: উপেক্ষিত এক প্রতিষ্ঠিত নীতি
আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানরা ভোগ করেন ব্যক্তিগত ইমিউনিটি বা Immunity ratione personae। এর অর্থ খুব পরিষ্কার— অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন, অন্য কোনো দেশের আদালত বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে পারে না।
এই নীতির একমাত্র স্বীকৃত ব্যতিক্রম হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) অথবা জাতিসংঘ অনুমোদিত কোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল। একক রাষ্ট্র নিজেকে বিচারক, জুরি এবং কার্যনির্বাহী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। এটাই আন্তর্জাতিক আইনের মূল দর্শন।
২০০২ সালের ‘অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট’ মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এই ইমিউনিটির বিষয়টি স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছিল।
মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
মানবাধিকার সর্বজনীন ঘোষণা (ইউডিএইচআর) এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর) অনুযায়ী—
- আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক করা যায় না
- আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করতে হয়
- রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল
এই অধিকার রাষ্ট্রপ্রধান ও সাধারণ নাগরিক—সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আইনের শাসন মানে পছন্দের মানুষের জন্য এক আইন এবং অপছন্দের জন্য আরেক আইন নয়।
‘বৈধ নন’ যুক্তি: আইনের বাইরে রাজনৈতিক দাবি
অনেক সময় বলা হয়, সংশ্লিষ্ট প্রেসিডেন্ট বৈধভাবে নির্বাচিত নন, তাই তাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গণ্য করা যায় না। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে অন্য দেশের সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে তার বিরুদ্ধে আইনি বা সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারে না।
সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের বৈধতা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণ অথবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহুপাক্ষিক কাঠামো। একক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান কখনোই আন্তর্জাতিক আইনের বিকল্প হতে পারে না।
বিপজ্জনক নজির এবং বৈশ্বিক বার্তা
আজ যদি রাতের আঁধারে অভিযান চালিয়ে একতরফা গ্রেপ্তারকে বৈধ বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—আজ ভেনেজুয়েলা, কাল কে?
এই নজির বিশেষভাবে ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য ভীতিকর। এতে আন্তর্জাতিক আইন আর সুরক্ষাকবচ থাকে না; বরং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর হাতে একটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়।
এই বিতর্ক কোনো একক রাষ্ট্রপ্রধানকে রক্ষা করার প্রশ্ন নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং জাতিসংঘভিত্তিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন।
বিশ্ব আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কি আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, নাকি শক্তি দ্বারা? যদি আইন সত্যিই সর্বজনীন হয়, তবে তা শক্তিশালীর জন্য এক রকম আর দুর্বলের জন্য আরেক রকম হতে পারে না।#
লেখক: পিএইডি রিসার্চ ফেলো, তেহরান ইউনিভার্সিটি অফ মেডিকেল সাইন্সেস, ইরান।
পার্সটুডে/এমএআর/৮