কারবালার মহাবিপ্লব ও এর শাশ্বত শিক্ষা (পর্ব-৪)
৬০ হিজরিতে উমাইয়া শাসক মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়।
সে মদীনার গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেয় যে, হুসাইনের কাছ থেকে যে কোনো ভাবেই হোক আনুগত্য আদায়ের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি করবে এবং আনুগত্য এড়ানোর কোনো সুযোগ বা সময় তাকে দেয়া যাবে না। এ নির্দেশ পেয়ে মদীনার গভর্নর ওলিদ বিন উৎবা কুখ্যাত উমাইয়া নেতা মারোয়ান বিন হাকামের পরামর্শ অনুযায়ী সে রাতেই একটি সভার আয়োজন করে ইমাম হুসাইন (আ)-কে সেই সভায় আসতে বলে যাতে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর খবর প্রচারিত হওয়ার আগেই ইমামকে ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে বাধ্য করা যায়। ইমাম হুসাইন (আ) নিরাপত্তার খাতিরে তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত ত্রিশ জনের সশস্ত্র এক গ্রুপকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়ে ওই সভায় যোগ দেন। ওলিদ মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে ইমামকে আহ্বান জানান। ইমাম তাকে জানান যে:

'হে ওলিদ! আমাদের বংশ হল নবুওত ও রেসালতের খনি এবং ফেরেশতাদের আসা-যাওয়ার স্থান ও খোদায়ী রহমতের স্থান। মহান আল্লাহ নবী-পরিবারের মাধ্যমে ইসলামকে উদ্বোধন করেছেন এবং এই বংশকে সঙ্গে নিয়েই ইসলামকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেবেন। আর ইয়াজিদ যার আনুগত্য করতে তুমি আমায় বলছ সে হচ্ছে এমন এক মদখোর ও খুনি যার হাত নিরপরাধ মানুষের রক্তে রঞ্জিত। সে হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি যে আল্লাহর বিধি-বিধানের সীমানা লণ্ডভণ্ড করেছে এবং জনগণের সামনেই নানা অশ্লীল কাজ ও পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় অমন উজ্জ্বল রেকর্ড ও উন্নত পারিবারিক ঐতিহ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আমার মত একজন ব্যক্তি কী এই পাপিষ্ঠের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে বা তার নেতৃত্ব মেনে নেবে? তোমার ও আমার উচিত এ বিষয়ে ভবিষ্যতের দিকে নজর দেয়া এবং তাহলে দেখতে পাবে যে খেলাফত বা মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমাদের মধ্যে কে বেশি উপযুক্ত?'
এভাবে ইসলামের সেই চরম দুর্দিনে নানার ধর্ম ও সম্মান রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন তাঁরই সুযোগ্য নাতি হযরত ইমাম হুসাইন (অ)। মহানবী (সা) তাঁকে উম্মতের নাজাতের তরী ও হেদায়াতের প্রদীপ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর অর্থ ইমাম হুসাইনের (আ) দেখানো পথ ও আদর্শ অনুসরণ ছাড়া মুসলমানরা তাদের ঈমান ও পবিত্র ধর্মকে রক্ষা করতে পারবে না। বিশ্বনবী (সা) গোটা আহলে বাইতকে (আ) নুহের নৌকার সঙ্গে তুলনা করলেও ইমাম হুসাইনের (অ) ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ওই বিশেষণ যুক্ত করেছেন যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন ডুবন্ত বা আহত ব্যক্তিকে উদ্ধারেরর জন্য দ্রুত গতিশীল বাহন বা গাড়ি দরকার। অন্যদিকে সাধারণ রোগিকে ধীরে-সুস্থে বা কিছুটা পরেও সাধারণ কোনো গাড়িতে চড়িয়ে হাসপাতালে নেয়া যায়। কারবালার মহাবিপ্লবের আদর্শ ও ইমাম হুসাইনের (আ) ভূমিকা মৃতপ্রায় ইসলামকে বাঁচানোর জন্য দ্রুত গতিশীল নৌকা বা বাহনের ভূমিকাই পালন করেছিল। শ্রোতা ভাইবোনেরা, আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খানের কণ্ঠে শুনব ইমাম হুসাইন সম্পর্কিত একটি হাদিস: .
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহর (সা) কাছে ওহি পাঠিয়ে বলেছেন, ' ইয়াহিয়া ইবনে জাকারিয়াকে হত্যা করার কারণে ৭০ হাজার দোষী ব্যক্তিকে হত্যা করেছি এবং তোমার দৌহিত্র হুসাইনকে হত্যার প্রতিশোধে ৭০ হাজার ৭০ হাজার লোককে অর্থাৎ অগণিত দোষী ব্যক্তিকে হত্যা করব।'- এটা হচ্ছে শাফেয়ি কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের মাত্ন বা টেক্সট। কাজী আবুবকর ইবনে কামিলের হাদিসে রয়েছে, 'ইয়াহিয়া ইবনে জাকারিয়াকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে দোষীদেরকে হত্যা করেছি এবং আপনার কন্যার পুত্রকে অর্থাৎ হুসাইনকে হত্যা করার অপরাধে দোষীদেরকে হত্যা করব।'

ইমাম হুসাইন (আ.) বেশ কিছু কাল ধরে উমাইয়্যাদের চিন্তাধারার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। প্রায়ই তিনি বিপদ সংকেত দিয়ে বলতেন : ‘নিজের নীরবতার জন্য আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাই।’ কেননা, ইমাম জানতেন যে,কুরআন ও ইসলামের টিকে থাকা নির্ভর করছে তাঁর আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের ওপর। কারণ,বনি উমাইয়্যা ইসলাম বলতে রাজত্ব ও ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুই বুঝেনি। ইয়াযীদ যেমন অন্তরে ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখত না,তেমনি বাহ্যিকভাবেও তা মেনে চলত না। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) ছিলেন ঈমান ও হাকীকতের বাস্তব প্রতীক এবং দীনের প্রতি গভীর বিশ্বাস তাঁর সমস্ত শিরা-উপশিরায় বেগবান রক্তের মত ঢেউ খেলে যেত। তিনি ভাল করেই মু‘আবিয়ার দুরভিসন্ধি বুঝলেন এবং এক অগ্নিঝরা ভাষণের মাধ্যমে তাঁর নীল নকশাকে ফাঁস করে বলেন :
'হে মু‘আবিয়া! … সত্যিই কি তুমি জনগণকে ইয়াজিদের বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করতে চাও? যখন তার চরিত্রই তার উত্তম পরিচয়। তার চিন্তাচেতনা ও অভিমত তার কাজেই প্রকাশিত। তুমি ইয়াজিদ সম্পর্কে এবং আলে মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর তার কর্তৃত্বের ব্যাপারে যা ঘোষণা করেছ,তা আমি শুনেছি! তাহলে আস, এ ইয়াযীদকে কুকুর, বানর,কবুতর,নারী-আসক্তি ও ফূর্তিবাজি সম্পর্কে পরীক্ষা করে দেখ…। হে মু‘আবিয়া! শুনেছি যে,তুমি আমাদের প্রতিও ইশারা করেছ। আল্লাহ্র কসম করে বলছি, মহানবী (সা.) তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের জন্যই উত্তরাধিকার হিসাবে রেখে গেছেন।…হে মু‘আবিয়া! কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড-যেখানে যোগ্যতম লোকদের থাকা দরকার,সেখানে তাদেরকে বর্জন করছ এবং একজন পাপাচারী ও সম্ভোগে বুঁদ হয়ে থাকা লোককে অগ্রগণ্য করছ?’
কারবালার মহাবিপ্লবের পটভূমি ও ঘটনা-প্রবাহ সম্পর্কে আমরা আরও কথা বলব এ পর্বের আগামী আসরে। #
পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৫
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন