কারবালার মহাবিপ্লব ও এর শাশ্বত শিক্ষা (পর্ব-৬)
'কারবালার মহাবিপ্লব ও এর শাশ্বত শিক্ষা' শীর্ষক বিশেষ আলোচনার ষষ্ঠ পর্বে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
গত কয়েক পর্বে আমরা কারবালার মহাবিপ্লবের মহানায়ক ইমাম হুসাইনের মর্যাদা ও এ বিপ্লবের পটভূমি ও ঘটনা-প্রবাহ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। মুয়াবিয়ার শাসনামলের বিষয়ে আমরা ইমাম হাসান ও হুসাইনের অভিন্ন নীতির নানা কারণ সম্পর্কেও আলোচনা করেছি। আজও এ বিষয়ে কিছু কথা বলব।
ইমাম হাসান (আ) মু‘আবিয়ার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে দিলেও এ দুই মহান ভ্রাতা আনুষ্ঠানিকভাবে মু‘আবিয়ার অনুকূলে বাইআত হননি। বলা হয় মুয়াবিয়া ইমাম হুসাইনের সঙ্গে সংঘাতে না নামতে ও তাঁর কাছ থেকে জোর করে বাইআত আদায় না করতে ইয়াজিদকে উপদেশ দিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু উদ্ধত অহঙ্কারী ইয়াযীদ তার বাবার উপদেশ উপেক্ষা করে হযরত ইমাম হুসাইনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাঁর কাছ থেকে বাইয়াত আদায়ের চেষ্টা করে। এ অবস্থায় ইমাম হুসাইনের একদল অনুসারী জীবন দিয়ে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত থাকলেও যেহেতু তাঁর উদ্দেশ্য রাষ্ট্রক্ষমতা ‘দখল করা’ ছিলো না,তাই তিনি রক্তপাত এড়াতে রাতের অন্ধকারে মদীনা ছেড়ে মক্কার পথে রওনা হন এবং মক্কায় এসে আল্লাহর ঘরের পাশে আশ্রয় নিয়ে সত্যপ্রকাশের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। এ অবস্থায় ইয়াযীদ হজ্বের সমাবেশে ভীড়ের মধ্যে তাঁকে হত্যার জন্য গুপ্তঘাতক পাঠায়। ইমাম হুসাইন (আ) তা জানতে পারেন। তিনি মসজিদুল হারামে বা পবিত্র ‘আরাফাহর ময়দানে তাঁর রক্তপাত হোক তা চান নি। অন্যদিকে কুফাবাসীরা সেখানে গিয়ে তাদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তাঁকে শত শত চিঠি পাঠায়। ফলে তিনি হজ্বের আগের দিন মক্কা ছেড়ে কুফার পথে রওয়ানা হন।
আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খানের কণ্ঠে শুনব ইমাম হুসাইন সম্পর্কিত একটি হাদিস:
"মহানবীর স্ত্রী উম্মে সালামাকে একবার কাঁদতে দেখে জিজ্ঞাসা করা হল: আপনি কাঁদছেন কেন? তখন তিনি জানান, আমি মহানবী (সা)কে স্বপ্নে দেখলাম যে তাঁর মাথায় ও দাঁড়িতে মাটি লেগে রয়েছে। আমি বললাম, হে রাসুলুল্লাহ! আপনার কি হয়েছে? তিনি বললেন, এইমাত্র আমি হুসাইনকে নিহত হতে দেখেছি কারবালায় ।"
ইমাম হুসাইন কুফার জনগণের চরিত্র সম্পর্কে জানতেন যে,তাদের অঙ্গীকারের ওপর আস্থা রাখা যায় না। কিন্তু কেউ কার্যত অপরাধ না করা পর্যন্ত তাকে অপরাধী গণ্য করা চলে না বিধায় তিনি তাদের ডাকে সাড়া না দিলে এটা ইসলামী আচরণবিধি অনুযায়ী খারাপ দৃষ্টান্ত হতো এবং যে কারো জন্য যে কারো সাথে কেবল সন্দেহবশে আচরণ করার বৈধতা সৃষ্টি হয়ে যেতো। অবশ্য কারবালায় উপনীত হবার পর তাঁর কাছে কুফা-বাসীদের প্রায় সবার বিশ্বাসভঙ্গের বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যায়।

এরপর আর ইমাম হুসাইন (আ)'র জন্য কুফায় যাওয়ার নৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকেনি। এ অবস্থায় তিনি অন্যত্র চলে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু নিজ তাবেদারদের প্রতি ইয়াযীদের নির্দেশ ছিলো হযরত ইমামের কাছ থেকে বাইআত আদায় করার বা তাঁকে হত্যা করার।
হযরত ইমাম হুসাইন (রা)-এর পক্ষে ইয়াযীদের অনুকূলে বাইআত্ হওয়া সম্ভব ছিলো না। এমতাবস্থায় তিনি নীরবে যালেমের তলোয়ারের নীচে মাথা পেতে দেবেন এটাও ছিলো অচিন্ত্যনীয়। অন্যদিকে তিনি যুদ্ধ ও রক্তপাতও এড়াতে চাচ্ছিলেন। তাই ইমাম যেখান থেকে এসেছেন সেখানে ফিরে যাবার বা দেশের সীমান্তের বাইরে হিজরত করার বিকল্প প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইয়াযীদের পক্ষ থেকে যে দু’টি বিকল্প দেয়া হয়েছিলো তার ভিত্তিতে ইয়াজিদ-বাহিনী ইমামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে ইমামকে অস্ত্র হাতে নিতে হয় এবং ইসলামী আদর্শকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে যে প্রয়োজনে জীবন দিতে হবে তাঁর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এ অসম যুদ্ধে বাহাত্তর জন সঙ্গীসাথী শাহাদাত বরণ করেন।

কেবল স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও সত্য প্রচারের কারণে এভাবে হযরত ইমাম হুসাইন (আ) ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের যেভাবে হত্যা করা হয় তা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর চেতনাকে এমনভাবে নাড়া দেয় যে,তা তাদের মধ্যে ঈমানদীপ্ত নতুন প্রাণের সঞ্চার করে এবং ইসলামের ইতিহাসে সত্যের জন্য আত্মত্যাগের এক নতুন ধারা সৃষ্টি করে,শুধু তা-ই নয়,তিনি সমগ্র মানবতার জন্য সংগ্রামী প্রেরণার দৃষ্টান্তে পরিণত হন। তাঁর শাহাদাতের মাধ্যমে তিনি দ্বীনের যে খেদমত আঞ্জাম দিলেন তিনি বেঁচে থাকলে অনুসারীগণসহ সর্বস্ব বিনিয়োগ করে প্রচারকার্য চালিয়েও তা পারতেন না।
এ থেকে সুস্পষ্ট যে হযরত ইমাম হুসাইন (আ) যুদ্ধবাজ ছিলেন না,কিন্তু তিনি ছিলেন নিজ নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের প্রশ্নে আপোষহীন। তিনি ছিলেন স্বৈরতন্ত্র ও সুবিধাবাদ – এ দুই-ই প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে পাহাড়ের মতই অবিচল।

এটা স্পষ্ট কুফাবাসীদের দাওয়াতের ইস্যু না থাকলেও ইমাম হুসাইন ইয়াজিদকে সহ্য করতেন না। তিনি সুনিশ্চিত শাহাদাতগামী আন্দোলনের পথ বেছে নিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে দুনিয়ার মানুষ জেনে রাখুক যে,এ হুসাইন ইবনে আলীর (আ.) খ্যাতি অর্জনের কোনো লোভ নেই, ক্ষমতারও কোনো লোভ নেই। বরং তিনি একজন সংস্কারক। যুগ যুগ ধরে ইসলামে যে বিদআতের আচ্ছাদন সৃষ্টি করা হয়েছে-তিনি সে সব আচ্ছাদন ছিন্ন করে ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে মুক্ত করতে চান। তাই ইয়াজিদের মত শতভাগ ধর্মহীন এবং লম্পট ও ফাসিক শাসকের শাসনকে স্বীকৃতি দেয়া ছিল ইমাম হুসাইনের জন্য চরম অকল্পনীয় বিষয়।
ইমাম হুসাইন বলেছিলেন ‘অধমের পুত্র আরেক অধম (ইবনে যিয়াদ) আমাকে আত্মসমর্পণ করা নতুবা যুদ্ধের হুমকি দেখাচ্ছে। নতি স্বীকার করা আমাদের কখনোই মানায় না তথা অপমান আমাদের স্পর্শ করে না। স্বয়ং আল্লাহ,তাঁর রাসূল (সা.) ও মুমিনরা আমাদের তথা রাসুলের আহলে বাইতের নতি স্বীকারকে ঘৃণা করেন।’ #
পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৬
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন