অক্টোবর ০২, ২০১৮ ১৬:৩০ Asia/Dhaka

ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য। তো এগুলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের সাপ্তাহিক আয়োজন " ইরানি পণ্য সামগ্রী"র আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পণ্য আকরিক লোহা নিয়ে কথা বলেছি। আজকের আসরে আমরা আলোচনা করবো খনিজ ধাতু 'স্বর্ণ' নিয়ে।

ইরানে সোনা ব্যবহারের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ইরানে প্রাচীনতম সোনার খনি হিসেবে যে খনিটির নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় সেটি হলো 'সিস্তান" খনি। অবশ্য দমগনের 'কুহযার' খনির নামটিও এসেছে অনেক স্থানে। ইরানে এখন শিল্প এবং বাণিজ্যিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সত্তর হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান এই স্বর্ণ ও অলংকারের ক্ষেত্রে কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। খুবই নিপুণ,দক্ষ,অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ববর্গ এই শিল্পে জড়িত আছে। বিশ্বে তাই জুয়েলারি ও স্বর্ণ শিল্পে ইরান অন্যতম এক প্রতিযোগীর আসনে রয়েছে এখন। আমরা এই শিল্পের সঙ্গে আজকের আসরে আরও পরিচিত হবার চেষ্টা করবো।

স্বর্ণ একটি মূল্যবান ধাতু। বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই ধাতুর বিচিত্র ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। অলংকার সামগ্রি তৈরির বিষয়টি তো রয়েছেই। এর বাইরেও বিচিত্র তৈজস এবং দন্ত্য চিকিৎসাসহ সাধারণ চিকিৎসায় সোনার ব্যবহার চলে এসেছে প্রাচীন কাল থেকেই। কেন মানুষ এই ধাতুটির প্রতি এতো আকৃষ্ট হলো-এরকম একটা প্রশ্ন জাগতেই পারে। বলা হয়ে থাকে মূল্যবান ধাতু সোনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলো নদীর তীরে ঝকমক করতো। সেটাই চকমকে রূপই আকর্ষণের প্রধান কারণ। তাছাড়া এই বিরল ধাতুটিকে গলিয়ে সহজেই বিচিত্র রূপ দেওয়া যায়। অক্সিডেশন মোকাবেলায় এই ধাতুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশ প্রবল। এ কারণেই আবিষ্কারের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে এই স্বর্ণ ধাতুর ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিতে দেখা যায়।

প্রাচ্যভূখণ্ডে স্বর্ণ ধাতু আবিষ্কারের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। বলা হয়ে থাকে সবচেয়ে প্রাচীন যে সোনার খনিটি আবিষ্কৃত হয়েছে মেসোপটেমিয়ান অঞ্চলে সেটি ছিল সুমেরিয়দের বাসভূমি। খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে সেখানে সোনার খনি আবিষ্কার হয়েছিল। সেই খনিতে প্রাপ্ত ধাতুগুলো থেকে প্রমাণ হয় খ্রিষ্টপূর্ব তিন সহস্রাব্দে প্রাচীন মিশরের আবিদুস এবং নেগাদার লোকজন সোনা কেনাবেচার কাজ করতো। সে সময় স্বর্ণকাররা শুধুমাত্র রাজ পরিবারের লোকজন ও সভাসদদের জন্যই সোনার অলংকার তৈরি করতে পারতো। তখনকার দিনের রাজাকে বলা হতো ফেরাউন। ওই ফেরাউন, ফেরাউনের রাজদরবারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, তাদের পরিবার পরিজন, কাহেন মানে মন্দিরের পুরোহিতদের জন্যই শুধু স্বর্ণের অলংকার তৈরি করার অনুমতি ছিল। এদের বাইরে আর কারও জন্য সোনার অলংকার ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না।

ইরানেও স্বর্ণ ব্যবহারের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ইরানে সবচেয়ে প্রাচীন সোনার খনি হিসেবে ইতিহাসে যে খনিটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি 'সিস্তান' খনি। এছাড়া দমগনের 'কুহযার' সোনার খনির নামটিও ইতিহাসে পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রিসের ভূগোলবিদ স্ট্রাবুন, ফরাসি ভ্রমণবিদ ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী শর্দান, ফরাসি পুরাতত্ত্ববিদ গ্রিশম্যান তাদের নিজ নিজ গ্রন্থে প্রাচীন ইরানের ইতিহাসের বিভিন্ন যুগপর্ব এবং ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক বর্ণনা দিয়েছেন। বিশেষ করে ইরানের যেসব অঞ্চলে স্বর্ণ পাওয়া যায় বা উত্তোলন করা হয় সেসব অঞ্চলের বর্ণনা তুলে ধরেছেন। গ্রিশম্যান 'ইরান সূচনাপর্ব থেকে ইসলাম পর্যন্ত' শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। ওই বইতে তিনি উল্লেখ করেছেন: মাদ'দের যুগে হামেদান শহরের আশেপাশে সোনার খনি থেকে সোনা উত্তোলন করা হতো। 'প্রাচ্যভূখণ্ড সভ্যতার লালনভূমি' নামে একটি বই লিখেছেন বিল ডুরান্ট। কয়েক খণ্ডের ওই বইয়ের একটিতে তিনি ঐতিহাসিক এই যুগের উল্লেখ করেছেন।

বিল ডুরান্ট তার বইতে লিখেছেন, খ্রিষ্টপূর্ব ১৭ শতাব্দির ইরানি একটি গোত্র হলো মাদ গোত্র। ওই মাদ গোত্র বসবাস করার জন্য যে অঞ্চলটি বেছে নিয়েছিল সেখান থেকে তারা তামা, লোহা, সোনা, রূপা, মর্মর পাথরসহ মূল্যবান আরও অনেক পাথর সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে হাখামানেশি সম্রাটরা সেই সময় বিশ্বের বিশাল ভূখণ্ডের ওপর তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। তাদের শাসনাধীন ওই বিশাল ভূখণ্ডের বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা তাদের প্রয়োজনীয় সোনা সংগ্রহ করতো। এইসব এলাকার মধ্যে ইরানের হামেদানের সোনার খনি এবং রুমানিয়ার রুশা এলাকার সোনার খনির নাম উল্লেখযোগ্য। এই সময় মানে খ্রিষ্টপূর্ব ৫১৬ সালে হাখামানেশি সাম্রাজ্যে সোনার কয়েন বা স্বর্ণমুদ্রা চালু ছিল। ইরান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে ওই স্বর্ণমুদ্রা 'দারিক' নামে প্রসিদ্ধ।

পুরাতত্ত্ব গবেষকদের খননকাজ থেকে ইরানের হাখামানেশি শাসনকালের বিচিত্র নিদর্শন হাতে এসেছে। ওইসব নিদর্শনের মধ্যে স্বর্ণ নির্মিত বস্তুই বেশি। প্রাচীন সেই নিদর্শনগুলো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ইরানসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশের বিখ্যাত সব যাদুঘরে শোভা পাচ্ছে। সোনার বাটিতে চমৎকার কারুকাজ, সোনার বাজুবন্দ, সোনার হোমা পাখি, রিটন, সোনার বুনো ছাগল, সিংহ ইত্যাদি আরও অনেক মূল্যবান নিদর্শন যাদুঘরগুলোতে সংরক্ষিত আছে। রিটন বা রাইটন হলো ইরানি সিংহের মাথার ডিজাইনযুক্ত সোনার রাজকীয় পানপাত্র। সাফাভি শাসনামল (১৫০১-১৭২২) ইরানের হস্তশিল্পসহ বিচিত্র শিল্পের স্বর্ণযুগগুলোর অন্যতম। ইরানের ইতিহাসে প্রথবারের মতো এই যুগপর্বের মূল্যবান স্বর্ণালংকার ও স্বর্ণনির্মিত বস্তুর বেশ কিছু নিদর্শন সংগ্রহ করা হয়েছে। ইরানের 'জাতীয় স্বর্ণালংকার যাদুঘরে' যেসব নিদর্শন প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে এই ভূখণ্ডের পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া মূল্যবান সব বস্তুই শোভা পাচ্ছে।

ইরানে ছোট বড় অনেক খনি আছে যেসব খনিতে মূল্যবান সোনার মতো অনেক ধাতু রয়েছে। স্বর্ণ উত্তোলন করার জন্য সোনার খনির ওয়ার্ল্ড স্টান্ডার্ড হলো খনিতে মজুদ সোনার পরিমাণ কমপক্ষে এক শ টন হতে হবে। বৈশ্বিক এই মান অনুযায়ী ইরানে এ পর্যন্ত কমপক্ষে দশটি সোনার খনি শনাক্ত করা হয়েছে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন