অক্টোবর ০৯, ২০১৮ ১৭:২১ Asia/Dhaka

আপনারা জানেন যে, ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য। তো এগুলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের সাপ্তাহিক আয়োজন " ইরানি পণ্য সামগ্রী"র আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ধাতু 'স্বর্ণ' নিয়েকথা বলেছি। সময়ের স্বল্পতার কারণে আলোচনা অসম্পূর্ণ রেখেই পরিসমাপ্তি টেনেছিলাম আসরের।

অবশ্য কথা দিয়েছিলাম যে আজকের আসরের সূচনা করবো খনিজ ধাতু 'স্বর্ণ' নিয়েই। বলেছিলাম ইরানে ছোট বড় অনেক খনি আছে যেসব খনিতে মূল্যবান সোনার মতো অনেক ধাতু রয়েছে। স্বর্ণ উত্তোলন করার জন্য সোনার খনির ওয়ার্ল্ড স্টান্ডার্ড হলো খনিতে মজুদ সোনার পরিমাণ কমপক্ষে এক শ টন হতে হবে। বৈশ্বিক এই মান অনুযায়ী ইরানে এ পর্যন্ত কমপক্ষে দশটি সোনার খনি শনাক্ত করা হয়েছে। সমগ্র ইরানের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এইসব সোনার খনি। চলুন পর্ব আলোচনার ধারাবাহিকতায় শুরু করা যাক আজকের আসর। আপনাদের মূল্যবান সঙ্গ যথারীতি প্রত্যাশা করছি।

ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশে অবস্থিত তাকব উপশহরে বড় বড় দুটি সোনার খনি রয়েছে। একটির নাম 'যাররে শুরন' সোনার খনি এবং অপরটির নাম 'অক দাররে' সোনার খনি। এসব সোনার খনি থেকে সেই প্রাচীনকালেই স্বর্ণ উত্তোলনের কাজ করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। যাররে শুরন সোনার খনিটি প্রাচীন নিদর্শন সোলায়মানের প্রাসাদ বা তাখতে সোলায়মান নামের প্রাচীন কমপ্লেক্স থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই খনিটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় সোনার খনি। এই খনিতে মজুদ সোনা বিশুদ্ধতার দিক থেকে উন্নতমানের এবং মজুদের দিক থেকেও বৃহৎ। সোনার মতো মূল্যবান খনির কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি খনি হিসেবে এই খনিটিকে বিবেচনা করা হয়।

এই খনির পাশেই রয়েছে বৃহৎ সোনার খনি 'অক দাররে'। এই সোনার খনি থেকে বছরে দুই টনের বেশি 'অপরিশোধিত সোনা' উত্তোলন করা সম্ভব। আরও একটি বড় সোনার খনি হলো 'মুতে সোনার খনি'। এই সোনার খনিটি ইরানের সুন্দর ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে ভরপুর ইস্ফাহান প্রদেশে অবস্থিত। ইস্ফাহানকে বলা হয় নেসফে জাহান মানে অর্ধবিশ্ব। অর্থাৎ এই প্রদেশ দেখলে অর্ধবিশ্ব দেখা হয়ে যায়। এখানকার মুতে সোনার খনি থেকে প্রাচীনকালেই কমবেশি সোনা উত্তোলন করা হয়েছে। পুরাতত্ত্ব বিজ্ঞানীরা এই এলাকায় গবেষণামূলক খননকাজ চালিয়ে বেশ কিছু প্রাচীন নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন। মুতে সোনার খনি কমপ্লেক্সে ৯টি বিভাগ মানে ছোট বড় সোনার খনি রয়েছে। গবেষকরা মনে করছেন এখানে ২০ লাখ টন অপরিশোধিত সোনা বা গোল্ড স্টোনের মজুদ রয়েছে। তাদের মতে নয়া আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এইসব খনি থেকে প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৫০০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ পাওয়া যেতে পারে।

বর্তমানে যেসব সোনার খনি থেকে সোনা উত্তোলনের কাজ চলছে সেগুলোর পাশাপাশি আরও বহু এলাকাতেও সোনা আবিষ্কার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহত গতিতে চলছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশ, কুর্দিস্তান প্রদেশ, কেরমান প্রদেশ, খোরাসানে রাজাভি এবং দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশ, ইস্ফাহান প্রদেশ, ইয়াজদ প্রদেশ, হামেদান প্রদেশ, মারকাজি বা কেন্দ্রিয় প্রদেশ এবং সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশ।

স্বর্ণ একটা মূল্যবান ধাতু একথা আমরা সবাই মোটামুটি জানি। মজার ব্যাপার হলো মূল্যবান এই খনিজ ধাতুকে বিশুদ্ধ করার জন্য যেসব প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেয়া হয় তা থেকে পাওয়া যায় আরও বেশ কয়েক রঙ ও রকমের মিশ্রধাতু। এগুলোর কোনোটি লাল, কোনোটি সবুজ আবার কোনোটি সাদা। শিল্প কল-কারখানায় এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

 

এইসব মিশ্রধাতু যেসব বস্তু তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে রয়েছে ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রনিক শিল্পপণ্য, আধুনিক টেকনোলজির সাহায্যে নির্মিত প্রতিরক্ষা পদ্ধতির বিচিত্র সরঞ্জাম এবং মহাকাশ শিল্প। স্বর্ণ বেতার তরঙ্গের মতো চমৎকার একটি তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ সহায়ক ধাতু। এই ধাতুকে একেবারে নাজুক করা সম্ভব। এতো নাজুক বা পাতলা করা সম্ভব যে তার ভেতর দিয়ে আলো সরবরাহ করতে পারে। স্বর্ণের এই বিশেষত্বের কারণে অধিকাংশ উড়োজাহাজের পাইলটের রুমের কাঁচে এই ধাতু ব্যবহার করা হয়। কেননা স্বর্ণের নাজুক স্তর দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ হবার কারণে উষ্ণতা সৃষ্টি হয়। সুতরাং পাইলটের রুমের কাঁচে আর বরফ বা কুয়াশা জমতে পারে না।

স্বর্ণ এবং তার মিশ্রধাতু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ২৪ ক্যারেটের খাঁটি সোনা খুবই নরম একটি ধাতু। সে কারণে ওই স্বর্ণকে কাজে লাগানো খুবই সহজ। বিশেষ করে দন্ত্য চিকিৎসায় খুব ব্যবহার হয় সোনা। কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্বর্ণ খুবই মৌলিক ভূমিকা পালন করে। কেননা টাকার সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। আবারও অন্যান্য বস্তুর মতো স্বর্ণের ক্ষয়ক্ষতি তেমন একটা নেই। কাগজের মুদ্রার মান উঠানামা করার কারণে কিংবা পরিবর্তনের শঙ্কার কারণে ধনীরা সবসময় স্বর্ণ কিনে জমিয়ে রাখে। মালামালের পরিবর্তে কিংবা সম্পদ জমানোর লক্ষ্যে অনেক সময় স্বর্ণকে ব্যবহার করা হয়। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে স্বর্ণকে তখন কৌশলগত ধাতু বলে গণ্য করা যায়। স্বর্ণের বিচিত্র আকৃতি রয়েছে। অলংকারের বৈচিত্র্য তো বিশ্বব্যাপী লক্ষ্য করা যায়। গোল্ড বারও স্বর্ণ বহন করার জন্য সুবিধাজনক। আবার স্বর্ণমুদ্রা বা গোল্ড কয়েনও বিশ্ববাজারে কেনাবেচা হয়ে থাকে অহরহ।

ইরানে এখন স্বর্ণ ও অলংকারের ক্ষেত্রে সত্তর হাজারের বেশি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। খুবই নিপুণ,দক্ষ,অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ববর্গ এই শিল্পে জড়িত আছে। বিশ্বে তাই জুয়েলারি ও স্বর্ণ শিল্পে ইরান অন্যতম এক প্রতিযোগীর আসনে রয়েছে এখন। স্বর্ণসহ আরও বিচিত্র ইরানি পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করার লক্ষ্যে ইরান ব্যাপক সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞগণ বিশেষ করে অর্থনীতিতে অভিজ্ঞ মহল লক্ষ্যে পৌঁছতে নিজেদের মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে নিরন্তর চেষ্টা প্রচেষ্টা যাচ্ছে। সুতরাং ইরানি এই খনিজ ধাতু স্বর্ণের ভবিষ্যত উজ্জ্বল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ৯

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন