রায়ের ফলে বিএনপির বড় কোনো ক্ষতি হবে না: নাঈমুল ইসলাম খান
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় নিয়ে রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাঈমুল ইসলাম খান বলেছেন, এ রায়ের ফলে বিএনপির বড় কোনো ক্ষতি হবে না। তবে নির্বাচনের আগে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না বলে তিনি মনে করেন।
নাঈমুল ইসলাম খান আরো বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলামের বক্তব্য রাজনৈতিক। আর তারেক রহমান সম্পর্কে বলেন, তার রাজর্ষিক প্রত্যাবর্তনও অসম্ভব নয়।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব নাঈমুল ইসলাম খান-২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়েছে। রায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অনেকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে। রায়কে আপনি কীভাবে দেখছেন?
নাঈমুল ইসলাম খান: আমার মনে হয় এ রায়ের ফলে রাজনীতির ক্ষেত্রে নতুন বড় কোনো অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেনি। তাৎক্ষণিখাবে যেটা হতে পারত। তারেক রহমানকে যদি ফাঁসি দেয়া হতো তাহলে হয়তো পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন হতো। আমরা দেখেছি বিএনপির প্রতিক্রিয়ায় এই রায়কে নাকচ করা হলেও তারা কঠিন কোনো কর্মসূচি দেয়ার কথা বলেনি। সুতরাং একথা বলা যায় স্বাভাবিকভাবে রায়ের ফলে বিএনপির কিছু কর্মসূচি ও প্রতিক্রিয়া থাকলেও আমার মনে হয় যে নির্বাচনের দিকে ঘটনা প্রবাহ এগিয়ে যাবে। নির্বাচনের পর এ বিষয়গুলো ব্যাপক এবং জরুরি আলোচনায় আসবে। তবে তা নির্ভর করবে আগামী জাতীয় নির্বাচনটা কেমন হয় তার ওপর। কারণ আমার কাছে মনে হচ্ছে এখন যা কিছুই ঘটুক না কেন নির্বাচন পরবর্তী সময় ছাড়া বড় মাপের কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে না।
রেডিও তেহরান: বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ রায়কে ‘ফরমায়েশি রায়’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার এ মন্তব্য সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?
নাঈমুল ইসলাম খান: দেখুন, একজন ব্যক্তি হিসাবে বুঝি বিচারে যদি কোনো অন্যায় হয় সেক্ষেত্রে বিষয়টি কেবল সময়ের ব্যাপার। কোনো অন্যায় হলে সেটা অবশ্যই উন্মোচিত হবে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাটি বিএনপির আমলে যেভাবে পরিচালিত হয়েছিল-সেখানে 'জজ মিয়া' নামের একটি চরিত্র সৃষ্টি করা হয়েছিল। সে যেমন ওভারটাইম টেকানো যায়নি একইভাবে এখনও যদি কোনো অন্যায় থাকে সেটাও সময়ে চ্যালেঞ্জ হবে। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেবের যে বক্তব্যটির কথা বললেন, তিনি বলেছেন 'ফরমায়েশি'। আরো অনেক মামলার ব্যাপারে এই কথা বলা হয়েছে। খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়েও 'ফরমায়েশি' রায় বলা হয়েছে। মোটামুটিভাবে আমি বলব এটি একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। একথা বলে আমি এটা বুঝাতে চাচ্ছি না যে কোনো একটা রায় সম্পূর্ণ সঠিক হয়েছে বা সম্পূর্ণ অন্যায় হয়েছে।
Unless I go through the whole judgment. এইমুহূর্তে সেটা করার সুযোগ আমার এখনও হয়নি ফলে বিস্তারিত বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সাধারণভাবে আমি বলছি, রায় প্রত্যাখ্যানের এই ভাষাটা নতুন কিছু নয়।
রেডিও তেহরান: আদালতের এই রায়ের কারণে দল হিসেবে কী বিএনপি বড় ক্ষতির মুখে পড়ল বলে আপনি মনে করেন?
নাঈমুল ইসলাম খান: না, আদালতের এই রায়ের ফলে বিএনপি বড় ক্ষতির মুখে পড়ল বলে আমার মনে হয় না। এখানে বিএনপি বিষয়টিকে যত স্মর্টলি কাজে লাগাবে ততই ভালো। তাতে এধরনের বিপদ কখনও কখনও নিজেদের অনুকূলেও আসতে পারে। এগুলো রাজনীতির কৌশলের ব্যাপার। বিএনপি সেটা কতটা দেখাতে পারবে সেজন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে আমরা এটি বলতে পারি যে গত বেশ কয়েকমাস বলা চলে প্রায় বছরখানেক ধরে বিএনপি কৌশলগতভাবে ভুল বেশ কম করছে। পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি, দলীয় কর্মসূচি, জোটের কর্মসূচি দিচ্ছে। যেটি আমার দৃষ্টিতে খুবই সময়োপযোগী হচ্ছে। এটি আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ। ফলে আমার ধারনা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত তারা পর্যবেক্ষণ করবে। তারপরই তারা ঠিক করবে কিভাবে দল চালাবে।
আপনি যদি দেখেন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারেও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীসহ আরো দুএকজন ছোটো নেতার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। তারপর কিন্তু বিএনপি তীব্র কোনো কর্মসূচি দেয়নি। বাহ্যিকভাবে এটা তারা সামাল দিতে পেরেছে। সুতরাং এই মুহূর্তে আমার মনে হয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না কারণ তিনি দেশের বাইরে। সুতরাং এই রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বাস্তবসম্মত কোনো প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হচ্ছে না। এটা কেবলই রাজনীতির বার্তা-পাল্টা বার্তা দেয়াতে সীমাবদ্ধ রাখলে তাদের বিশেষ কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সুতরাং আমার মনে হয় বিএনপি যদি সাধারণ স্মার্টনেসটা রাখতে পারে তাতেই হবে। এ বিষয়টি বড় কোনো সমস্যা তৈরি করবে না কিন্তু তারা যদি এটা গায়ে মাখে বেশি তাহলে কিছুটা সময় তাদেরকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ফেলতে পারে।
রেডিও তেহরান: তারেক রহমানের প্রসঙ্গেটি যখন আনলেন তখন জানতে চাইব-এ রায়ের কারণে তারেক রহমান কী প্রকাশ্য রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন? যদি না পারেন তাহলে বিএনপি’র কৌশল কী হতে পারে
নাঈমুল ইসলাম খান: দেখুন, এটা খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয়। তারেক রহমান প্রকাশ্যে রাজনীতিতে কতটুকু অংশ নিতে পারবেন বা উনি কখন দেশে আসতে পারবেন তা নির্ভর করে বিএনপি এদেশের রাজনীতিতে কতোটা প্রাধান্য বিস্তার করে তার ওপর। দেখুন পৃথিবীর বহু নেতাকে ন্যায্য বা অন্যায্যভাবে দেশান্তরে থাকতে হয়েছে। ফলে পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসে বিদেশে থাকার ক্ষেত্রে তারেক রহমান প্রথম কোনো ব্যক্তি নয়।
দেখুন, ইরানের কথা যদি ধরেন তাহলে সেখানে ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (র) দেশের বাইরে থেকে যে সফলতা দেখিয়েছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
তারেক জিয়ার ক্ষেত্রেও রাজর্ষিক প্রত্যাবর্তন অসম্ভব নয় কিন্তু সেটা বিএনপি করতে পারবে কি না, তাদের সেই স্মার্ট অ্যাপ্রোচ থাকবে কি না, তাদের সেই ভাগ্য আছে কি না- তা নিয়ে মাঝে মাঝে আমার কাছে সন্দেহ হয়। কখনও কখনও আমার কাছে মনে হয় তারা অতটা স্মর্ট নয়। তারপরও আমি বলব গত প্রায় একবছর বিএনপির ভুল অনেক কম। যদি এটাই তাদের প্রবণতা হয়, তারা যদি কৌশলটা স্মার্ট রাখতে পারে তাহলে আমার মনে তারা তাদের রাজনীতিও চালু রাখতে পারবে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৩