নভেম্বর ০১, ২০১৮ ১২:৪৭ Asia/Dhaka

বিশ্বের প্রবীণদের বর্তমান ও অনাগত সমস্যা-সংকট নিয়ে ইরান, হেলপ এজ ইন্টারন্যাশনাল ও ইউএনএফপিএ'র যৌথ উদ্যোগে যে কনফারেন্স হলো তেহরানে সেটা খুবই ভালো হয়েছে। আমার কাছে ইরান খুব ভালো লেগেছে। ইরানের সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য খুবই সুন্দর। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। তিনি বলেন, ইরান একটি প্রবীণবান্ধব দেশ।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

  • ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনের কারণে প্রবীণ বিশেষ করে নারী প্রবীণরা নানা ধরনের সমস্যায় পড়বেন।
  • প্রবীণদের সমস্যা সমাধানে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে নানা প্রস্তুতি নিতে হবে।
  • ইরানে ইসলামি মূল্যবোধের বাস্তবায়ন দৃশ্যমান।
  • বাংলাদেশে ২০১৩ সালে প্রবীণবান্ধব নীতিমালা হয়েছে।
  • বাংলাদেশে যেভাবে প্রবীণদের জন্য একটি নীতিমালা করা হয়েছে সেই আলোকে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে যদি আন্তর্জাতিক সনদ করা হয় তাহলে প্রবীণদের জন্য একটা সুখী সমাজ আমরা বিশ্বের দেশে দেশে গড়ে তুলতে পারব।
  • বাংলাদেশে মানবাধিকারের কিছু কিছু বিষয়ে কিছু মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে।

রেডিও তেহরান: জনাব রিয়াজুল হক- ইরানে কী আপনার এটি প্রথম সফর।

কাজী রিয়াজুল হক: জ্বি ইরানে এটি আমার প্রথম সফর। 

রেডিও তেহরান: ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সফরে এসে কেমন লেগেছে আপনার।

কাজী রিয়াজুল হক: ভালো লেগেছে। বিশেষত যে কনফারেন্সে এসেছি-সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পার্টিসিপেন্টরা এসেছেন। বিশেষ করে ইউএনএফপিএ, হেলপ এজ ইন্টারন্যাশনাল এবং ইরান সরকার যৌথভাবে এ কনফারেন্সের আয়োজন করেছে। আয়োজনটি বেশ ভালো হয়েছে।

রেডিও তেহরান: আপনি যে হেলপ এজের কনফারেন্সে যোগ দিলেন- তো সে সম্পর্কে যদি বলেন..?

তেহরানে প্রবীণদের সমস্যা  ও সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্মেলন

কাজী রিয়াজুল হক: দেখুন, তিন দিনের কনফারেন্স ছিল। বিভিন্ন সেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের  প্রবীণ নাগরিকরা (সিনিয়র সিটিজেন) যে ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই  তুলনামূলক অনুপাতে প্রবীণদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। আর প্রবীণদের মধ্যে বিশেষ করে নারী প্রবীণ এবং যাদের বয়স আশি বছরের ওপরে হবে তারা নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়বেন। আর প্রবীণদের সেইসব সমস্যার ব্যাপারে এখন থেকেই নানাধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে। এসব বিসয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

কনফারেন্সের আলোচনার মধ্যে আমরা দেখেছি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবীণ নাগরিকদের সমস্যার  ব্যাপারে বেশ সুন্দর কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তারমধ্যে প্রবীণদের ব্যাপারে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের উদ্যোগ আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। ইরান একটি প্রবীণবান্ধব দেশ। আর এর পেছনে আমার কাছে মনে হয়েছে ইসলামিক ভ্যালুসগুলো কাজ করেছে। ইসলামি সংস্কৃতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশের সাথে তুলনা করে দেখেছি সেখানেও কিন্তু সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

২০১৩ সালে বাংলাদেশে একটি প্রবীণ নীতিমালা করা হয়েছে। সেটি অত্যন্ত প্রবীণবান্ধব নীতিমালা। সেখানে প্রবীণদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার জন্য একটি প্রস্তুতির ইঙ্গিত রয়েছে। একই বছর আরেকটি আইন করা হয়েছে। আইনটি খুবই ভালো একটি আইন। ওই আইনে বলা হয়েছে, পিতা-মাতার প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে কোনো সন্তান যদি কোনোরকমের অবহেলা করে বা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করে তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন না করা, অবহেলা করা বা দুর্ব্যবহার করার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। আর সেটি হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পৃথিবীর সবদেশেই যদি বাংলাদেশে যে নীতিমালা করা হয়েছে ২০১৩ সালে-তার আলোকে একটি আইন করা যায় তাহলে আমার মনে হয় বিশ্বের প্রবীণদের সমস্যা ও সংকট সমাধানে আমরা অনেকটা এগিয়ে যেতে পারব। 

রেডিও তেহরান: প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেনদের নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে এবং বাংলাদেশে কী ধরনের কাজ হচ্ছে..

সিনিয়র সিটিজেনদের সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা

কাজী রিয়াজুল হক: দেখুন, আন্তর্জাতিভাবে জাতিসংঘ এরইমধ্যে একটা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রবীণ নাগরিক অর্থ্যাৎ সিনিয়র সিটেজেনদের অধিকার সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘের একটা  আন্তর্জাতিক সনদ তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। আমি কনফারেন্সে বলেছি, বাংলাদেশে যেভাবে প্রবীণদের জন্য একটি নীতিমালা করা হয়েছে সেই আলোকে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে যদি আন্তর্জাতিক সনদ করা হয় তাহলে প্রবীণদের জন্য একটা সুখী সমাজ আমরা বিশ্বের দেশে দেশে গড়ে তুলতে পারব। আজকে যারা প্রবীণ তাঁরা আমাদেরকে অনেক কিছু দিয়েছেন। আজ যারা নবীন আছেন তারাও একদিন প্রবীণ হবেন। ফলে নবীনদের প্রতিটি বিষয় প্রবীণবান্ধব হিসেবে চিন্তা করতে হবে।

প্রবীণদের সাস্থ্যসেবা বা স্বাস্থের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রবীণদের জন্য  একটি বিশ্বজনীন সোশ্যাল পেনশান স্কিম চালু করতে হবে প্রতিটি রাষ্ট্রকে। আর সেজন্য একটা একটা বীমা ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। আর যারা প্রবীণদের সেবা দেবেন তাদেরও একটা দায়িত্ব রয়েছে। তারা যখন প্রবীণ হবেন তখন যেন তাদেরকে ওইসব সমস্যার মুখোমুখি  না হতে হয়। ফলে আমাদেরকে লাইফ সাইকেল একটা পরিকল্পনা করতে হবে। এসব করা গেলে আমরা একটা প্রবীণবান্ধব বিশ্ব গড়ে তুলতে পারব।

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে যদি একটু বলতেন।

কাজী রিয়াজুল হক: দেখুন, বাংলাদেশের মানবাধিকারের কথা বলার আগে মানবাধিকারের বিষয়টি বলতে হয়। আর সেটি খুব বড় একটা বিষয়। ফলে ব্যাপক অর্থে মানবাধিকার বলতে যেটি বোঝায় সেটা হচ্ছে একজন মানুষ তার জন্ম থেকে যে অধিকারগুলো নিয়ে আসে এবং তা সমানভাবে ভোগ করার অধিকার তার থাকে। আর এসব অধিকারের মধ্যে খাবারের অধিকার, তথ্য পাওয়ার অধিকার, স্বাস্থের অধিকারসহ আরো অনেক কিছু মিলিয়ে। তো এসবের মধ্য থেকে বাংলাদেশে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে আলোচিত বিষয় হচ্ছে মৌলিক অধিকারের বিষয়। 

আমাদের যে মৌলিক চাহিদা আছে সেটাও যেমন মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে তেমনি মৌলিক অধিকারও মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। যেমন ধরুন- সমাবেশ করার অধিকার, কথা বলার অধিকার ইত্যাদি। আর এসব মিলিয়েই মানবাধিকার। তো মৌলিক চাহিদা যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নারীর ক্ষমতায়ন-এসব বিষয়ে কিন্তু আমরা অনেকটা এগিয়েছি। খুব ভালো উন্নতি হয়েছে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। তবে এটাও ঠিক যে কিছু কিছু বিষয়ে কিছু কিছু মানুষের উদ্বেগ (কনসার্ন) রয়েছে। যেমন ধরুন-মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারে মানুষের উদ্বেগ আছে। আর উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি মানুষের যে মৌলিক অধিকার আছে সেগুলো ভোগ করার সুযোগ থাকা উচিত। একইসাথে যারা মৌলিক অধিকারগুলো ভোগ করবে তাদেরও কিন্তু একটা দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন রয়েছে। দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই কিন্তু মৌলিক অধিকারগুলো ভোগ করতে হবে। তো এ দুটোর যদি আমরা সমন্বয় ঘটাতে পারি তাহলে আর উদ্বেগ থাকে না। আমি মনে করি এজন্য রাষ্ট্রের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এমন কোনো আইন হওয়া উচিত নয় যাতে কারও মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। যেকোনও আইন হবে মানুষের মঙ্গলের জন্য। কোনো আইন মানুষের ভেতরে শঙ্কা সৃষ্টি করছে কীনা সে ব্যাপারে রাষ্ট্রকে সজাগ থাকতে হবে। অন্যদিকে সংবিধান যে অধিকার মানুষকে দিয়েছে সে অধিকার ভোগ করার সময় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

রেডিও তেহরান: কাজী রিয়াজুল হক আবার ইরান প্রসঙ্গে জানতে চাইব-কেমন দেখলেন আপনি ইরানকে।

কাজী রিয়াজুল হক: দেখুন, ইরানে এসে বিভিন্ন সময় যত লোকের সঙ্গে মিশেছি তাতে খুব ভালো লেগেছে। এখানে কিছু জিনিষ আমরা দেখেছি। আমাদেরকে মিলাদ টাওয়ারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে স্থানীয় অনেকের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। তাজরিশে একটা বাজারে গিয়েছিলাম। তাছাড়া আমরা এসতেগ্বলাল হোটেলে ছিলাম সেখানে বলতে গেলে সবাই ইরানি। ইরান সরকার যেহেতু এই আয়োজনের সঙ্গে ছিল। ইরানের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই কনফারেন্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। তাঁদের অনেকের সাথে কথা হয়েছে। সবাইকে মনে হয়েছে অনেক বেশি আন্তরিক। আমাদেরকে ইরানিরা খুব ভালো চোখে দেখেছেন। অনেক বেশি আন্তরিকতার সাথে আমাদের সমস্যার কথা শুনেছে। আমাদেরকে সেভাবেই সেবা দেয়ার চেষ্টা করেছেন সবাই।

 রেডিও তেহরান: জ্বি সবশেষে -ইরানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে চাইব..

কাজী রিয়াজুল হক: দেখুন, ইরানের বিশেষ সংস্কৃতি আছে। তাঁদের বেশ-ভূষা, আচার-আচরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে নিজস্ব সংস্কৃতি আছে সেটাকে তারা অনুসরণ করছে।

আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখেছি। সেটি হচ্ছে ইরানের যে ঐতিহ্যগুলো রয়েছে-সেগুলোকে তারা অত্যন্ত যত্নের সাথে সংরক্ষণ করে যাচ্ছে। পৃথিবীর যেকোনো জাতিকে তাদের ঐতিহ্যকে কিন্তু সংরক্ষণ করতে হবে। আমাদের সুযোগ হয়েছিল গুলিস্তান প্যালেসে যাওয়ার। রেজা শাহ পাহলভীর প্যালেসে গেছি। এগুলোসহ প্রায় সব ঐতিহ্যকে তারা সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করেছে। সবকিছু মিলিয়ে বলব ইরান আমার কাছে ভালো লেগেছে।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১