ইরানের পণ্য-সামগ্রী: প্রযুক্তি এবং কারিগরি সেবার ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান
তেল সম্পদের বাইরে ইরানের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত হলো এই কারিগরি ও প্রযুক্তি খাত। গত দুই দশকে ইরান নিজেদের মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের জগতে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে।
একইসাথে কারিগরি ও প্রযুক্তি খাতেও রপ্তানি বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন দেশে যে ধরনের প্রকৌশল সেবা দিয়েছে ইরানের কোম্পানিগুলো, সেসবের মধ্যে রয়েছে শিল্প, বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, সড়ক নির্মাণ, ভবন নির্মাণ ইত্যাদি। বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রেও ইরানের রয়েছে চমৎকার ও সুনিপুণ অভিজ্ঞতা। বাঁধ নির্মাণ শিল্প নির্মাণ শিল্পেরই একটি শাখা হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিগণিত। বিভিন্ন এলাকার ভূ-বাস্তবতা মানুষকে বাধ্য করে প্রয়োজনীয় আবিষ্কারে এগিয়ে যেতে। ইরান এমন একটি দেশ যেখানে পানি আটকে রেখে কৃত্রিম হ্রদ করে করতে হয়েছে। এ জন্য বাঁধ নির্মাণ শিল্পে বহু আগে থেকেই ইরান এগিয়ে রয়েছে।

"কেবার বাঁধ" প্রাচীনতম বাঁধগুলোর একটি। এটি প্রায় ৭০০ বছর আগে ইরানে নির্মিত হয়েছে। বিশ্বের প্রাচীনতম এই বাঁধটি কোম প্রদেশে নির্মাণ করা হয়েছে এবং এটি এখনও তার অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। সুরকি পাথর নির্মিত উচুঁ এবং বাঁকা এই বাঁধের আকৃতি দেখলেই বিশেষজ্ঞগণ বুঝতে পারেন যে সেই প্রাচীন আমলেও ইরানের প্রকৌশলীরা কত দক্ষ আর সৃজনশীল ছিল। তাদের এই নৈপুণ্যের কারণে এক হাজার মিটার দৈর্ঘ্য এবং পাঁচ শ মিটার প্রস্থের বাঁধের দেয়ালও জলাধারের চাপ চমৎকারভাবে প্রতিরোধ করে টিকে থাকতে পারে। পানির চাপে ওই বাঁধ ভেঙে যায় না। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে ইরানের সক্রিয় ও অগ্রসর কোম্পানীগুলো আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এবং সেইসঙ্গে মেধাবি প্রকৌশলীদের মেধা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটিয়ে দেশের অভ্যন্তরে অন্তত ৩০০ টি অত্যাধুনিক বাঁধ নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে ইরান এখন বাঁধ নির্মাণ শিল্পে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চারটি দেশের একটি। এইসব বাঁধ অবশ্য বিভিন্ন প্রয়োজনে নির্মাণ করা হয়েছে। যেমন পানীয় জল সংরক্ষণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা, জল বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এবং কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানি মজুদ রাখা ইত্যাদি।
سد کبار استان قم- ایران
ইরান এই বাঁধ নির্মাণ শিল্পে স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়ে যাবার সুবাদে এখন নিজেদের কারিগরি ও শিল্প প্রযুক্তি দেশের বাইরেও রপ্তানি করছে। কিউবা, সুদান, জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, ইরাক, পাকিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানে এইসব প্রযুক্তি রপ্তানি করছে ইরান। প্রতিবেশি দুটি দেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশে দুটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। একটি হলো তুর্কমেনিস্তান আরেকটি আজারবাইজান। তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে নির্মিত বাঁধের নাম হলো দোস্তি বা বন্ধুত্ব আর আজারবাইজানের সঙ্গে নির্মিত বাঁধের নাম 'খোদা অফফারিন' বা আল্লাহর অনুগ্রহ। এই দুটো বাঁধই যৌথ প্রকল্প হলেও ইরানের প্রকৌশলীরাই বাঁধ দুটো নির্মাণ করেছেন।
سد دوستی در مرز ایران و ترکمنستان
سد دوستی
سد دوستی
سد دوستی
سد دوستی
سد دوستی
سد دوستی
سد دوستی
سد دوستی
سد دوستی
سد خداآفرین
سد خداآفرین در مرز ایران و جمهوری آذربایجان
سد خداآفرین
سد خداآفرین
سد خداآفرین
ইরানের প্রকৌশল ও কারিগরি সেবা যা দেশের বাইরে রপ্তানি হচ্ছে তার মধ্যে আরেকটি খাত হলো বিদ্যুৎ শিল্প। পানি ও বিদ্যুৎ শিল্প খাতকে ইরানের সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা ইরানের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আগে অর্থাৎ এখন থেকে চল্লিশ বছরেরও আগে ইরান বিভিন্ন দেশে এই দুই শিল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জামসহ সার্বিক কারিগরি সেবা রপ্তানি করে এসেছে। বর্তমানে ইরানের প্রতিবেশি চার দেশ তুরস্ক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ইরাকে ইরান বিদ্যুৎ রপ্তানি করছে। আজারবাইজান এবং আর্মেনিয়াতেও বিদ্যুৎ বিনিময়ের প্রক্রিয়া চলছে।

ইরানের খনিজ সম্পদ ও ভূতাত্ত্বিক সংস্থাও শিল্প ও কারিগরি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সক্রিয়। বিশ্বের অন্তত বিশটি দেশের সঙ্গে ইরান খনিজ সম্পদ অন্বেষণ ও ভূতত্ত্ব গবেষণাসহ আরও বহু ক্ষেত্রে সহযোগিতা দেওয়ার ব্যাপারে চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরান এই সহযোগিতা দিয়ে যাবে। যেমন ভূ-তাত্ত্বিক স্তরসমূহে অনুসন্ধান, জিওকেমিক্যাল অনুসন্ধান, স্যাটেলাইট, অর্থনৈতিক ভূতত্ত্ব, জিও ফিজিক্স ও সামুদ্রিক ভূতত্ত্ব গবেষণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সেবা দিয়ে যাবে ইরান। এই সেবা প্রদানের লক্ষ্যে গবেষণা কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করা হবে বলেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে। কোনো কোনো দেশে যৌথভাবে অনুসন্ধানের কাজ করছে ইরান। যেমন আফগানিস্তানে খনিজ দ্রব্য অনুসন্ধানে ইরান জার্মানির সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা কার্যক্রম চালাচ্ছে।

শিল্প ও কারিগরি ক্ষেত্রে ইরানের সেবা প্রদানের মধ্যে ভবন নির্মাণ, সড়ক নির্মাণ, তেল-গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতও পড়ে। অনেক দেশেই ইরান এইসব ক্ষেত্রে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছে। ইরান এখন তেল গ্যাস রপ্তানির বাইরে শিল্প ও কারিগরি ক্ষেত্রে সেবা রপ্তানির খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সাফল্য পাবার স্বার্থে নিজেদের প্রকৌশল কোম্পানিগুলোকে ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রসহ কার্যকর ও আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে তুলছে। এমনভাবে সমৃদ্ধ করছে যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো সামর্থ ও শক্তির অধিকারী হয়।
ইরানের রয়েছে উন্নত কারিগরি সক্ষমতা। রয়েছে দক্ষ ও মেধাবি তরুণ সমাজ। রয়েছে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রচুর বিশেষজ্ঞ। তারাই দেশের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে চাহিদামতো ও প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সেইসাথে দেশের বাইরেও রপ্তানি করছে নিজেদের প্রযুক্তি ও মেধা। #
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ১৪
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন