ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮ ১৬:৫৩ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দুরবস্থার জন্য অর্থমন্ত্রী অনেকাংশে দায়ী অথচ তিনি তা স্বীকার করেন না। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ এম হাফিজউদ্দিন খান। পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ

তিনি বলেন, ব্যাংক কর্মচারীদের সাথে যোগসাজশে ভুয়া প্রজেকেন্টর মাধ্যমে এত বড় অংকের টাকা লোপাট হয়েছে। 

  • ব্যাংকে দুরবস্থার জন্য অনেকাংশে অর্থমন্ত্রীই দায়ী; অথচ তিনি স্বীকার করেন না।
  • অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিতের পেট শব্দ হচ্ছে জাস্ট রাবিশ; বোগাস।
  • ব্যাংকের রেগুলেটর কন্ট্রোলার হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাক। অথচ এখানে অর্থমন্ত্রণালয় তদারকি করেছে এবং নানারকম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এই গোলমাল বাধিয়েছে। কোনো দেশে এমনটি হয় না। 

রেডিও তেহরান: জনাব,এম হাফিজউদ্দিন খান সম্প্রতি সিপিডি তাদের গবেষণা প্রতিবেদেন বলেছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত থেকে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। এখানে যে প্রশ্ন খুব বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে তাহলো- কীভাবে এই ঘটনা ঘটতে পারল? আপনার কী মনে হয়?

বাংলাদেশ ব্যাংক

এম হাফিজউদ্দিন খান: দেখুন, যখনই বাংলাদেশের ব্যাংক খাত থেকে অর্থ লোপাট হয়েছে অর্থাৎ গত দশ বছরে ব্যাংক খাত থেকে যে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে সে বিষয়টি কিন্তু সংবাদপত্রে এবং মিডিয়ায় এসেছে। যারা এই অর্থ লোপাট করেছে তারা ব্যাংক কর্মচারীদের সাথে যোগসাজশে এত বড় অংকের টাকা লোপাট করেছে। বিভিন্ন রকমের ভুয়া প্রজেক্টের নাম দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে যোগসাজশে একটি শ্রেণি এই অর্থ লোপাট করেছে।

রেডিও তেহরান: সিপিডির প্রতিবেদনকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘জাস্ট রাবিশ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য?

এম হাফিজউদ্দিন খান: দেখুন, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে কোনো কিছু পছন্দ না হলে উনি বলেন জাস্ট রাবিশ; বোগাস ইত্যাদি। এসব শব্দ ওনার পেট (প্রিয়) বক্তব্য। উনি এসব কথা প্রায়ই বলে থাকেন। বর্তমানে ব্যাংকের যে দুরবস্থা তার জন্য অনেকাংশে অর্থমন্ত্রীই দায়ী। আর সেকথাটা উনি স্বীকার করবেন না এটাই স্বাভাবিক।

রেডিও তেহরান: ব্যাংক খাতের এই লোপাটের ঘটনায় সরকারের করণীয় কী ছিল?

বাংলাদেশ সরকার

এম হাফিজউদ্দিন খান: দেখুন, গত দশ বছরে ব্যাংকগুলোকে যেভাবে ম্যানেজ করা হয়েছে সেটাকে স্বাভাবিক বলা যাবে না। ব্যাংকের রেগুলেটর কন্ট্রোলার হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাক বা বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ এখানে অর্থমন্ত্রণালয় তদারকি করেছে এবং নানারকম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এই গোলমাল বাধিয়েছে। কোনো দেশে এমনটি হয় না।  কাজটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তাছাড়া তাদের উৎসাহে ব্যাংকের মালিকদের একটা এসোসিয়েশন হয়েছে তারা কোনটার কি রেট হবে সে ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়। কোনো এমনটি দেশে হয়না। অথচ বাংলাদেশের চিত্রটা এমন। সিপিডি রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর অর্থমন্ত্রণালয় প্রতিবাদ করে জানিয়েছে যে ব্যাংকের কোনো খারাপ অবস্থা নেই। যদি খারাপ অবস্থা নাই থাকবে তাহলে প্রতিবছর কেন তাদের পুঁজি ঘাটতি দেখা দেয় এবং সরকার তাদেরকে পুঁজি দেয়। এর কোনো প্রতি উত্তর তো নেই।

রেডিও তেহরান:  জনাব, এম হাফিজউদ্দিন খান, ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন কিছু পদ্ধতি যে গত দুএক বছরে গ্রহণ করা হয়েছে সেই পদ্ধতিও কতটা গ্রহণযোগ্য,ব্যাংকের উন্নতির জন্য বা অর্থনীতির ক্ষেত্রে কী ভালো? 

টাকা

এম হাফিজউদ্দিন খান: দেখুন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায়নি। গত দশ বছর আগেও এমনটি ছিল না। আমি নিজেও বিভিন্ন সময়ে তিনটি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে কাজ করেছি। আমি কখনও এরকম অবস্থা দেখিনি। অগ্রণী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছি প্রায় ৬ মাস। তখনও এমন ঘটনা ঘটতে  দেখিনি। বর্তমানে এসব ঘটনা ঘটছে এবং সরকার কিছুই বলছে না। যারা ব্যাংক লুটপাট করছে তারা সব সরকারি লোক বলেই মনে হয়। তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে না। ব্যাংকের কর্মচারী যারা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তার বিরুদ্ধে কিছুই করেনি সরকার। এই হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংক ব্যবস্থা।

রেডিও তেহরান:  সিপিডি তাদের আরেকটি প্রতিবেদনে জনিয়েছে, বাংলাদেশে বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আপনার কী তাই মনে হয়?

সিপিডি

এম হাফিজউদ্দিন খান: সিপিডি যে প্রতিবেদনে বলেছে গত পাঁচ বছরে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এটি তাদের গবেষণার ফল। তারা এটা শুধু শুধু বলেনি। সিপিডিতে অনেক ভালো ও যোগ্য গবেষক আছেন। যারা অর্থনীতি বিষযে নিয়মিত বড় বড় গবেষণা করে থাকেন। তাদের গবেষণার ফল হচ্ছে দেশে ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে। এটিই হচ্ছে বাস্তবতা। এই যে বর্তমান বাস্তবতায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন। তারা যে সম্পদের বিবরণ দিয়েছে তা শুনলে তো অবাক হতে হয়। কেউ চল্লিশ কোটি টাকা  আবার কেউবা পঞ্চাশ কোটি টাকার মালিক। এটা কীভাবে সম্ভব? তাহলে তাদের অর্থ সম্পদ কিরকম বেড়েছে তা বুঝতে তো কিছু বাকি থাকে না। অন্যদিকে আমরা যারা সরকারি চাকরি করেছি আমাদের তো অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং আমাদের দিন দিন অবনতি হচ্ছে। অবশ্য এখন যারা চাকরি করছে সরকার তাদেরকে অনেক টাকা পয়সা দিচ্ছে। বেতনসহ নানাকিছু বেড়েছে। অথচ আমরা তো কিছু পাইনি। এখানেই তো বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। আমি পোস্টে থেকে অবসরে গেছি বর্তমানে সেই পোস্টে থেকে যিনি অবসরে যাবেন তারসঙ্গে তো আমার অনেক বৈষম্য। ফলে বৈষম্য এখন একটি বাস্তবতা।

রেডিও তেহরান: সমাজে বিরাজমান এই বৈষম্য কীভাবে দূর করা যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য

এম হাফিজউদ্দিন খান: দেখুন, সমাজের এই বিরাজমান এই বৈষম্য হঠাৎ করে দূর করা সম্ভব নয়। বৈষম্য দূর করার জন্য সরকারের পলিসিগত উদ্যোগ নিতে হবে। সামাজিকখাতে সরকারের খরচ বাড়াতে হবে। যাদের আয় বেশি তাদের কর বাড়াতে হবে। এভাবে নানা সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বৈষম্য দূর করা সম্ভব। এটি একদিনে হবে না। পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈষম্য দূর করার সম্ভব।

রেডিও তেহরান: জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান, সবশেষে আপনার কাছে যে বিষয়টি জানতে চাইব সেটি হচ্ছে-ব্যাংকিং খাতের যে অনিয়ম, দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা যেটাই বলুন না কেন এটি কী আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে, এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?

এম হাফিজউদ্দিন খান: এ অবস্থা চলতে থাকলে তার পরিণতি খুব খারাপ হবে। অনেকেই বলছে ব্যাংক সব কোলাপস করবে।যেমন ফার্মার্স ব্যাংকের কথা বলা যায়। ব্যাংকটি তো কোলাপস হয়ে গিয়েছিল সরকার এটাকে ঠেকা দিয়ে রেখেছে। তবে এভাবে হয়না। আমরা তো ভয় পাচ্ছি। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম দুর্নীতির কারণে মানুষ শঙ্কিত।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৯