জানুয়ারি ১৩, ২০১৯ ১৮:০০ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনেকাংশে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জিটিভি'র এডিটর ইন চিফ ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা। নির্বাচনে অনিয়মসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষ ব্যাপার। আদালতে যদি তারা প্রমাণ করতে পারেন সেটিই হবে সঠিক কাজ।

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব ইশতিয়াক রেজা, বাংলাদেশে ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে এখনো। আপনার দৃষ্টিত কেমন হলো নির্বাচন?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন, আমি রাজধানীকেন্দ্রিক নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের প্রতিনিধিরা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর পাঠিয়েছে। তো সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে নির্বাচন অনেকাংশে স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ  ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা সব রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তবে বিরোধী পক্ষ থেকে বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টগুলো পাইনি। যদিও ওআইসিসহ বেশ কিছু দেশ এরইমধ্যে তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে জানিয়েছে।

এ নির্বাচনে একটা বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হচ্ছে  নির্বাচনে ভোটের ফলাফলে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য। বিএনপি একটি খুবই জনভিত্তি সম্পন্ন রাজনৈতিক দল। আর সেদিক থেকে চিন্তা করলে দলটির এত কম ভোট পাওয়ার কথা না। তবে কারচুপির যে প্রশ্নটি তোলা হচ্ছে সেটি তো প্রমাণ করতে হবে। আর প্রমাণ করাটাই যৌক্তিক। বিএনপির পক্ষ থেকে হয়তো সেটি প্রমাণ করার চেষ্টা করা হবে।

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

তবে একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, বিএনপি বেশ আগে থেকেই নির্বাচনের মাঠ ছেড়ে দিয়েছে। আর তার একটি বড় প্রভাব পড়েছে দলীয় কর্মী-সমর্থক এবং সাধারন ভোটারদের মধ্যে। সাধারনত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনে বড় ধরনের বাধা দেয়া হয় এবং এবারও হয়ত সেটা ছিল কিন্তু আমরা কখনও কোনো বড় দলকে হঠাৎ করে এভাবে মাঠ ছেড়ে দিতে দেখিনা। যেটি আমরা এবারের নির্বাচনের আগে থেকেই দেখেছি যে বিএনপির ওপর যেমন প্রশাসনিক চাপ ছিল তেমনি দলটি নিজেও যেন একটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল। তার একটা বড় প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক নির্বাচনে। ভোটাররা বুঝতে পারেনি তারা কাকে ভোট দেবে।

দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় হচ্ছে-বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নে অনেক নতুন মুখ এসেছে এবার। যাদেরকে দলীয় নেতা-কর্মীরা চেনে না। তারও একটা প্রভাব নির্বাচনে পড়েছে। অন্যদিকে-আওয়ামী লীগের দশ বছরের শাসনামলে উন্নয়নের প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটি ছিল। আওয়ামী লীগ অনেক গুছিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে। সেখানে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট বিচ্ছিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে অগোছালোভাবে নির্বাচন করেছে। বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নের দিকে তাকালে বুঝতে পারব একেকটি আসনে ৪/৫ জন করে প্রার্থী দিয়েছে। প্রায়ই তাদেরকে অদল-বদল করা হয়েছে। এসব কিছু মিলিয়ে প্রত্যাশিত ফল হয়নি ফলে আমি মনে করি যে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। কারণ আমাদের একটি শক্তিশালী বিরোধী দল কাম্য ছিল সংসদকে প্রাতিষ্ঠানিক জায়গায় দাঁড় করানোর জন্য এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরো এগিয়ে নেয়ার জন্য। আর সেটি একটি বড় সংকটের জায়গা বলে মনে করি। 

রেডিও তেহরান:  আপনি যেমনটি বললেন নির্বাচনের এই ফলাফলে জাতীয় সংসদের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। একথা আরে অনেকেই বলছেন, তারা আরও বলছেন জবাবদিহিতার জায়গা কমে যাবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ বিজয়ে দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে। আপনার মন্তব্য কী?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: প্রধানমন্ত্রী যেটি বলেছেন- এ বিজয়ে দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে। তিনি যথার্থই বলেছেন। বড় বিজয় মানে বড় দায়িত্ব। আমিও মনে করি বিষয়টি ঠিক তাই। আওয়ামী লীগের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং বড় সুযোগ হচ্ছে সুশাসন। কারণ আওয়ামী লীগের সামনে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। তার সামনে শুধু একটি রাস্তা সেটি হচ্ছে সুশাসন নিশ্চিত করা। আর সেটি দেবেন বলে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমরা আশা করছি এটি আমরা দেখতে পাব। আর সেই সুশাসন দেয়ার জন্য কয়েকটি বিষয় খুবই জরুরি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলা আছে। আর আমি মনে দলটির কাজ সেখান থেকেই শুরু হবে। এ ব্যাপারে নিজের দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। প্রশাসন এবং পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেক বেশি গণমুখী করে তোলা। এগুলো অনেক অনেক বেশি কঠিন দায়িত্ব কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যেহেতু প্রজ্ঞা আছে এবং তিনি গত দশটি বছরে প্রমাণ করেছেন যে তিনি পারেন। তাঁর মধ্যে রাষ্ট্রনায়ক সুলভ নেতৃত্ব আছে। ফলে তিনি এটি করতে পারবেন। অন্যদিকে একটি বড় প্রত্যাশার জাযগা থাকবে যে বিরোধী দল যত কমই থাকুক না কেন যদি একজনও থাকেন তাকে সংসদে কথা বলতে দেয়া। তাদেরকে সংসদে বেশি সময় দিতে হবে। তাছাড়া গণমাধ্যমকে সুযোগ দেয়া যাতে তারা সরকারের ভুল ক্রটির যৌক্তিক সমালোচনা করতে পারে এবং সরকারের উচিত হবে তা গ্রহণ করা।

রেডিও তেহরান:  নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাদের এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?  

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন, এটি তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার কথা বলছে আর এ বলাটা তাদের জায়গা থেকে বলাটা স্বাভাবিক। আমি তাদের এই প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টিকে অস্বাভাবিক বলছি না। তবে আমার আশা থাকবে-তারা যে কয়জনই হোক না কেন-তারা সংসদে যাবেন এবং যৌক্তিক ভূমিকা রাখবেন। সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পর সিট কম পাওয়ার কারণে সংসদ ছেড়ে দেয়াটাকে অরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে বলে আমি মনে করি। 

রেডিও তেহরান:  ইশতিয়াক রেজা, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগেও অভিযোগ করা হয়েছে এখনও সেই একই অভিযোগ নির্বাচনে সরকারী দলের ভয়-ভীতি প্রদর্শন, প্রশাসনের প্রভাব ও নির্বাচন কমিশন যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। তো তাদের এই অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন, বিভিন্ন জায়গা থেকে এই অভিযোগগুলো আমরা শুনছি। বিরোধী দল থেকেও শুনছি এসব অভিযোগ। প্রার্থীরাও বলছেন তাদের এসব অভিযোগের কথা। কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে প্রত্যাকেটি অভিযোগই প্রমাণ সাপেক্ষে বিষয়। আমাদের হাতে সেই ধরনের কোনো প্রমাণ নেই। তবে ওনারা যেটি করেছেন আমি তাকে সাধুবাদ জানাই। বিরোধী দল তাদের এমপি প্রার্থীদের ঢাকায় ডেকেছেন এবং তারা ঢাকায় এসে তাদের অভিযোগের প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। আর প্রমাণ উপস্থাপনের  পরিপ্রেক্ষিতে তারা যদি এগুলোকে নির্বাচনী ট্রাইবুনালে নিয়ে যেতে পারেন এবং একইসাথে আদালতে যদি প্রমাণ করতে পারেন সেটিই হবে সঠিক কাজ।

রেডিও তেহরান:  নির্বাচনের পর বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে যে, বিএনপি এখন কী করবে? পাশাপাশি জোট হিসেবে ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যত কী? ইস্যু দুটিতে আপনার কী মতামত কী? 

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড;কামাল হোসেন

 সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিএনপি এবারের নির্বাচনে আনতে পেরেছে সেজন্য আমরা সবাই ড. কামাল হোসেনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আর নির্বাচনে যে ফলাফল হয়েছে সে ব্যাপারে বিএনপিকে নিজের আত্মসমালোচনা করতে হবে। কোথায় কোথায় দুর্বলতা ছিল সেটি খুঁজে বের করে নতুন রাজনীতির চিন্তা করতে হবে। প্রথম কাজ হবে সংসদ নিয়ে নতুন করে ভাবা। কারণ এটি প্রতিনিয়ত বিএনপির রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কতটা ধরে রাখতে পারবে। এবারের নির্বাচন কেন্দ্রীক যে রাজনীতি হয়েছে তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে  বিএনপি একটি রাজননৈতিক দল কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি অরাজনৈতিক শাখা বেশি তৎপর ছিল। অন্যদিকে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে রাজনৈতিক শাখা বেশি কাজ করতে পারেনি। এ দুটোর মধ্যে বিএনপি কোনো ভারসাম্য করতে পারেনি। কর্মীদেরকে উজ্জীবিত করতে পরেনি। জনগণের সামনে আওয়ামী লীগের বিকল্প প্রস্তাব আনতে পারেনি। আমার মনে হয় আগামী দিনগুলোতে বিএনপির ভালো রাজনীতি করার সুযোগ রয়েছে। তাদের নিজেদেরকে গুছিয়ে নিতে হবে এবং আগামী ৫ বছর পর যে নির্বাচনটি হবে তখন যেন একটা বড় শক্তি নিয়ে নামতে পারে সেই চেষ্টা করতে হবে।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৩