রংধনু আসর: দুই ঘোড়ার গল্প
রংধনু আসরের শিশু কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, প্রাণিদের মধ্যে মানুষের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হচ্ছে ঘোড়া। খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার বছর যাবত ঘোড়া মানুষের সঙ্গী হয়ে আছে। ঘোড়াকে সম্ভ্রান্ত জীবও বলা হয়ে থাকে। একসময় রাজা-বাদশাহ, জমিদার এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিরা যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ঘোড়া ব্যবহার করতেন। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও ঘোড়া ব্যবহার হতো। এই একবিংশ শতাব্দীতেও ঘোড়ার কদর একেবারে কমে যায়নি।
বন্ধুরা, আজকের আসরে আমরা দুই ঘোড়ার মধ্যকার প্রতিযোগিতা নিয়ে একটি গল্প শোনাব। গল্পের পর থাকবে ঘোড়া সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য এবং সবশেষে থাকবে বাংলাদেশের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।
এক জমিদার ও তার প্রজার ঘোড়া একই মাঠে ঘাস খেত। ঘাস খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে সুখ-দুঃখের আলাপ করতে করতে একসময় তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। একবার কথা বলতে শুরু করলে যেন আর শেষ হতে চায় না। হঠাৎ একদিন জমিদারের ঘোড়ার মনে হলো- আরে! কার সাথে কথা বলছি আমি! কার সাথে বন্ধুত্ব করেছি? ও কি আমার সমান, ও তো সাধারণ জাতের একটা ঘোড়া, যার না আছে মান ইজ্জত, না আছে ভালো থাকার জায়গা। মাঠে আর কোনো ঘোড়া নেই বলে ওর সাথে কথা বলেছি। তাই বলে কি ও আমার বন্ধু হয়ে গেছে, আমার বন্ধু হতে পারে অন্য কোনো জমিদারের ঘোড়া।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একদিন জমিদারের ঘোড়া প্রজার ঘোড়ার কাছে গিয়ে বলল: দেখো, তোমার মনিব যেমন সাধারণ মানুষ আর তুমিও তেমনি সাধারণ ঘোড়া। আমার মনিব জমিদার। তিনি আমাকে চিনির শরবত খাওয়ান, ছোলা খাওয়ান। আমার জন্য একজন চাকর রেখে দিয়েছেন, যে আমাকে পুকুরে নামিয়ে গা ঢলে গোসল করায়, আমার শরীরে কোথাও কোনো আঘাত পেয়েছি কি না দেখে; খাদ্য ঠিকমত খাচ্ছি কি না মনিবকে জানায় এমনকি আমার থাকার জায়গা যেন নোংরা না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখে। তোমার তো এসবের বালাই নেই, খাও কুঁড়া, ভুসি খড়। কতকাল পরে দানা চোখে দ্যাখ তার হিসাব নেই। এ জন্যই তো তোমার লোমগুলি রুক্ষ হয়ে গেছে।
একটু থেমে জমিদারের ঘোড়া আবার বলল: দেখো, তোমার ঘাড়ের কেশর এলোমেলো হয়ে আছে, তোমার চোখে ক্যাতর আর পায়ে কাদা। কিন্তু আমার শরীরে একটুও ময়লা নেই। পায়ে কাদা নেই।
সাধারণ ঘোড়াটি বলল, ঠিকই বলেছ। জমিদার যখন তোমার পিঠে সওয়ার হয়, তখন তুমিও তো জমিদার!
একথা শুনে গর্বিতভাবে এদিক ওদিক তাকালো জমিদারের ঘোড়া। মনে হলো পারে তো চিৎকার করে জানিয়ে দেয়, হ্যাঁ আমি জমিদার। আমার সাথে অন্য কোনো ঘোড়ার তুলনা চলে না।
-কিন্তু বন্ধু…
-- বন্ধু বলছো কেন? সাহেব বলো, স্যার বলো।
- ঠিক আছে। কিন্তু ঘোড়া সাহেব। আপনি কি আমার মতো দৌড়াতে পারবেন? আমার মতো রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পিঠে বোঝা নিয়ে হাঁটতে পারবেন।
-- আরে কী যে বলো। তা না পারলে জমিদার কি আমাকে এমনি এমনি রেখেছে নাকি? জমিদার যখন আমার পিঠে চড়েন তখন আমি দৌড়ালে, জমিন চারপাশের গাছপালা-বাড়িঘর সব আমার পেছেনে পড়ে থাকে- মনে হয় শুধু আমি চলছি আর পৃথিবীর সব কিছু থেমে আছে। তুমি ওসব বুঝবে কি করে? তোমার ওপর তো কেউ সওয়ারই হয় না। আর হলেও ছালা বিছিয়ে সস্তা লাগাম দিয়ে তোমাকে দাবড়ায়। জানো, আমাকে যে লাগাম দেয়া হয় তা সোনার তৈরি। যে রশি দিয়ে লাগাম বাঁধা হয়েছে সেটা নাইলনের আর আমার পিঠে যে গদি চাপান হয় সেটা বিদেশি চামড়ার। যে চাবুক নিয়ে জমিদার সাহেব আমার পিঠে সওয়ার হন, তাতে হীরে লাগানো আছে!
এসব শুনে সাধারণ ঘোড়াটি মনে মনে বলল, যে চাবুক দিয়ে আঘাত করে তার মধ্যে হীরে আছে বলেও এর গর্ব। শোনা যাক আর কী বলে!
জমিদারের ঘোড়াটি আর কিছু বলল না। সে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। এসময় সাধারণ ঘোড়াটি বলল, এই যে মশাই শুনুন-
- আবার কী বলবে?
-- এতক্ষণ তো আপনার কথা বললেন, এখন আমার কথা শুনুন।
- তোমার কথা কি শুনবো, কি-ই বা বলার আছে তোমার?
--তেমন কিছু নয়, তবে খড় কুঁড়ো খেয়ে মুক্ত মাঠে ঘুরে ধুলোবালিতে গড়াগড়ি করে এখনো আমার শরীরে যে শক্তি আছে, আপনার কিন্তু রাজকীয় হালে থেকেও তা নেই।
- অসম্ভব, কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না তোমার কথা।
-- মেনে নিতে না পারলে প্রমাণ করুন।
- ঠিক আছে। আজ রাতেই তোমার এ কথার প্রমাণ দেবো।
জমিদারের ঘোড়াটা আস্তাবলের কাছে চলে গেল। এরপর দানা-পানি খেয়ে শুয়ে পড়লো আস্তাবলের বাইরে। যে লোকটা ঘোড়ার যত্ন নিত সে ঘোড়া বাইরে শুয়ে আছে দেখে মনে করল আজ গরম দেখে বোধহয় এখানে শুয়ে আছে- থাক, রাত গভীর হলে একে আস্তাবলের ভেতর ঢুকিয়ে দেবো। ততক্ষণ বিশ্রাম করুক। সে আস্তাবলের পাশের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
যথাসময়ে জমিদারের ঘোড়াটি গিয়ে হাজির হলো সাধারণ ঘোড়াটির কাছে। জ্যোৎস্না রাত। চাঁদের আলোর যেন বাঁধ ভেঙেছে। জমিদারের ঘোড়াকে দেখে সাধারণ ঘোড়াটি বলল:
- এসেছেন?
-- হ্যাঁ, এলাম।
- তাহলে দাঁড়ান।
-- দাঁড়িয়ে কী করব?
- এই যে বিরান ভূমি দেখা যায়, এটাতে আমরা দু’জনে দশটা করে পাক দেবো।
- এটা কোনো ব্যাপার নয়। চলো।
-- সবেমাত্র ফসল কাটা হয়েছে, এখানে উঁচু-নিচু জমিতে ছড়িয়ে আছে খাস জঙ্গল, আর মাটির ঢেলা। কোনো কোনো জায়গায় পানিও জমে আছে। চি হি হি শব্দ করে দৌড়াতে শুরু করলো দুই ঘোড়া।
জমিদারের ঘোড়াটি মাঠের মধ্যে এক পাক দিয়েই তার সঙ্গীকে বলল, তুমি তো সারাদিন এ মাঠের মধ্যেই ছিলে, দানা পানিও খাওনি। হয়রান হয়েছ একটু জিরিয়ে নাও।
সাধারণ ঘোড়াটি কোনো উত্তর দিল না। সে পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাকল।
দ্বিতীয় রাউন্ডে এসে আবার জমিদারের ঘোড়ার একই কথা, ক্লান্ত হয়েছ রেস্ট নাও।
সাধারণ ঘোড়াটি ছোট্ট করে জবাব দিল- দরকার নেই।
চতুর্থ রাউন্ডে এসে জমিদারের ঘোড়াটি তার প্রতিপক্ষকে ধমক দিয়ে বলল, কী করছ, পড়ে যাবে তো জিরিয়ে নাও।
- কোনো ভয় নেই। আমি ঠিকই আছি।
এই ভাবে এক রাউন্ড শেষ হয় আর জমিদারের ঘোড়া তার প্রতিপক্ষকে জিরিয়ে নেয়ার কথা বলে। একসময় জমিদারের ঘোড়ার পায়ে কাদা, জঙ্গল জড়িয়ে যায়। সে দৌড়াতে গিয়ে সামনে বাড়াতে পারে না। শেষে বলে দেখো, তুমি সাধারণ ঘোড়া হলেও আমার বন্ধু। তোমার কোনো ক্ষতি করতে চাই না। জেদের বশে জীবন দেবে?
সাধারণ ঘোড়াটি এসব কথা কান না দিয়ে দৌড়াতে থাকে, দশটি চক্কর শেষ করে কোনো কথা না বলে।
জমিদারের ঘোড়াটি বলে, কী ব্যাপার? পাগল হলে নাকি? এই কাদা জঙ্গলের মধ্যে সারারাত দৌড়াবে?
-আরো দশটা চক্কর মারবো তার পর থামব।
একথা শুনে জমিদারের ঘোড়াটি তখন শুয়ে শুয়ে হাঁপাতে লাগল। তার এখন হুঁশ হয়েছে। কাউকে ছোট ভাবতে নেই। নিজের বুদ্ধি আর শক্তির অহঙ্কার করলে এভাবেই বেইজ্জতি হতে হয়।
ঘোড়া সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য
বন্ধুরা, শিক্ষণীয় গল্পটি শুনলে। এটি লিখেছেন মাখরাজ খান। বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আমরা ঘোড়া সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য তোমাদেরকে শোনাব।
ক) জন্মের একঘন্টা পরই ঘোড়া দৌড়াতে পারে।
খ) স্থলজ যেকোনো স্তন্যপায়ীর চেয়ে ঘোড়ার চোখ বড় হয়।
ক) ঘোড়ার চোখগুলো মাথার দুইপাশে অবস্থিত বলে ঘোড়া ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত দেখতে পায়।
খ) যে ঘোড়ার লেজে লাল রিবন থাকে সেই ঘোড়া লাথি মারে।
ক) ঘোড়া দাঁড়িয়ে ও শুয়ে উভয়ভাবেই ঘুমাতে পারে।
খ) ঘোড়ার দাঁত দেখেই স্ত্রী ও পুরুষ ঘোড়া শনাক্ত করা যায়। পুরুষ ঘোড়ার ৪০টি দাঁত থাকে এবং স্ত্রী ঘোড়ার থাকে ৩৬টি।
ক) ঘোড়া মিষ্টি স্বাদ পছন্দ করে এবং টক বা তিক্তস্বাদ এড়িয়ে চলে।
খ) কোন গন্ধ ভালো না খারাপ তা বোঝার জন্য ঘোড়া তার নাককে বর্ধিত করার একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে যাকে 'ফ্লিমেন' বলে। এটি করার সময় ঘোড়াকে দেখে মনে হয় ঘোড়া হাসছে।
ক) এক সময় মনে করা হতো ঘোড়া বর্ণান্ধ। কিন্তু আসলে এটি ঠিক নয়। তারা রক্তবর্ণ বা বেগুনি বর্ণের চেয়ে হলুদ বা সবুজ রঙ ভালো দেখে।
খ) ঘোড়া তার মেজাজ প্রকাশের জন্য নাক, কান ও চোখ ব্যবহার করে। মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে তারা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে।
ক) অনেকগুলো ঘোড়া একসাথে কখনোই শুয়ে থাকে না। অন্তত একজন সজাগ থাকবে তার সঙ্গীদের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য।
খ) ঘোড়া রাতে মানুষের চেয়ে ভালো দেখে। তবে আলো থেকে অন্ধকারে বা অন্ধকার থেকে আলোতে অ্যাডজাস্ট করতে মানুষের চেয়ে ঘোড়ার বেশি সময় লাগে।
ক) ঘোড়ার হৃদপিণ্ডের ওজন ৯ থেকে ১০ পাউন্ড!
খ) ঘোড়ার প্রতিটা কানে ১৬টি মাংসপেশি থাকে, যার ফলে তারা কানকে ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরাতে পারে।
ক) ঘোড়া দৈনিক ২৫ গ্যালন পানি পান করে। গরমের সময় আরো বেশি পান করে।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৬
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন