রংধনু আসর: মাকড়সা, ফড়িং ও মৌমাছির বন্ধুত্ব
রংধনু আসরের বন্ধুরা, আজকের আসরের শুরুতেই রয়েছে মাকড়সা, ফড়িং ও মৌমাছির বন্ধুত্ব নিয়ে একটি গল্প। গল্পটি লিখেছেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব চেচুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক জুবাইর জসীম। গল্পের পর থাকবে মৌমাছি সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য। আর সবশেষে থাকবে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার এক নতুন বন্ধুর গানসহ সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।
মাকড়সা ও ফড়িং- দুইবন্ধু। গলায় গলায় ভাব। একে অপরকে না দেখলে থাকতে পারে না। রোজ বিকেলে তারা একটা মাঠে বসে। আড্ডা দেয়। গল্প করে। সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে আসে। উৎসব-পার্বণে একে অপরকে দাওয়াত করে। এভাবে চলতে থাকে তাদের বন্ধুত্ব।
একদিন মাকড়সা বলল: বন্ধু, চলো আমরা এক জায়গায় বাসা নিই। তাহলে সব সময় এক সঙ্গে থাকতে পারব। খেলতে পারব। গাইতে পারব।
ফড়িং বলল: সুন্দর আইডিয়া। খুব মজা হবে। মাকড়সার কথায় সায় দিল সে।
এরপর একদিন ফড়িং মাকড়সার সঙ্গে প্রস্তাবিত বাসাটি দেখতে বের হল। বনের পাশে সুন্দর নিরিবিলি একটা জমি। শত্রুপাখির উৎপাতও নেই। কিন্তু জায়গাটা ফড়িঙের পছন্দ হলো না। কারণ জমিতে তেমন ঘাস নেই। এক-আধটুকু থাকলেও তাতে কাজ হবে না। মাকড়সার তেমন সমস্যা নেই। বনের গুল্ম-লতা, ঝোপ-ঝাড়ে বাসা বুনে দিব্যি থাকতে পারে সে।
মাকড়সা বলল, দোস্ত, আমি থাকতে তোমার কোনো চিন্তা নেই। তোমার মনের কথা আমি বুঝে গেছি। তোমাকে সুন্দর বাসা বুনে দেব। একদম চিন্তা করো না।
ফড়িং বলল, তুমি একা কেন করতে যাবে! আমিও তোমার সঙ্গে থাকব। মাকড়সা বলল, ঠিক আছে। দুজনে মিলে কাজ করব।
কিছু দিনের মধ্যে পুরো জমি সবুজ হয়ে ওঠে। উঁচু উঁচু ঘাস। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। ঝিরঝির বাতাসে হিল্লোল ওঠে ঘাসের বুকে। নরম তুলতুলে কচিকচি ঘাস। একটা-দুটো ফুলও ফোটে ঘাসের মাথায়। মধু খেতে দুয়েকটা মৌমাছিও আসে। দেখে তাদের মন ভরে ওঠে। দুইবন্ধু ঘাসের পাটিতে বসে গল্প করে প্রতিদিনের মতো।
ফড়িং বলল, দোস্ত, অনেক দিন পর একটা মনের মতো বাসা পেলাম। অনেক আরাম। খুশিতে গান করে সে। সঙ্গে মাকড়সাও।
নতুন বাসায় দুইবন্ধু অনেক মজা করে। তাদের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হতে থাকে। মাকড়সা সারা রাত জাল বুনে। খাবার ধরে খায়। ফড়িং ঘাসের বুকে আরাম করে। রাতে শুয়ে শুয়ে চাঁদনী দেখে। শত্রুপাখি দেখলে ঘাসপাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। এখানে তারা খুব সুখী।
তবে সুখ বেশি দিন সইল না। এক হরিণ শাবকের নজরে পড়ল এই ঘাসজমি। হরিণের প্রিয় খাবার এসব কচিঘাস। এমন মজার খাবার না খেয়ে কী পারে! তাই পাশের বন থেকে রোজ সকালে শাবকটি এখানে ঘাস খেতে চলে আসে। এসেই গপাগপ খেতে থাকে কচিঘাসগুলো। উফ! সুন্দর পরিপাটি বাসাটি তছনছ হয়ে যাচ্ছে তাদের সামনে।
হরিণ শাবক যখন এক পা দু পা করে ঘাস খেতে খেতে এগুতে থাকে তখন তাদের বাচ্চাগুলো ভয়ে লাফ দেয়। পাশে ওঁৎ পেতে থাকা শত্রুপাখিরা এসে ধরে খেয়ে ফেলে। পোকাখেকো পাখিরা হরিণের পিঠে চড়ে কিংবা গাছের ডালে উৎপেতে থাকে। সুযোগ পেলে বাচ্চাগুলোকে ধরে পেটে চালান দেয়। দুইবন্ধু মহাবিপদে পড়ে গেল। তারা কোনোমতে লুকিয়ে বাঁচল সেদিন। কিন্তু বাচ্চাদের কী অবস্থা হবে! তারা শংকিত হয়ে পড়ল। মাকড়সা বলল, বন্ধু, বিপদে ধৈর্য ধরতে হয়। কৌশলে কাজ করতে হয়। চিন্তা করিও না। আমার এক মৌমাছিবন্ধু আছে। আমরা ওর সাহায্য নিতে পারি। ওর বাহিনী অনেক শক্তিশালী। বনের বড় বড় প্রাণীকেও ওরা হুল ফুটিয়ে শায়েস্তা করতে পারে। ওদের হুলে প্রচণ্ড বিষ। চলো, আমরা তার কাছে যাই। নইলে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না।
রাতে দুইবন্ধু মিলে মৌমাছির কাছে গেল। পুরো ঘটনা তার কাছে খুলে বলল। ফড়িং কেঁদে কেঁদে বলল, আপনার সাহায্য না পেলে আমাদের বংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। দয়া করে আপনি আমাদের সাহায্য করুন। আমরা ভীষণ বিপদে। তাদের কথা শোনে মৌমাছি খুব দুঃখ পেল। মৌমাছি তাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, টেনশন করো না। কাল সকালে আমার বাহিনী তাকে পাকড়াও করবে।
তারা মৌমাছির কথায় আশ্বস্ত হয়ে ফিরে এল। কিন্তু ভয়ের রেশ কাটল না। নির্ঘুম রাত কাটাল তারা। ফড়িং ভয়ে অস্থির, থতমত।

ভোর ফুটল। একটু একটু আলো দেখা যাচ্ছে জারুল বনের ফাঁকে। পাখিরা কিচিরমিচির শব্দ করে বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। হয়ত খাবারের সন্ধানে। এদিকে হরিণ শাবক সেদিনের মজার খাবারের কথা ভুলতে পারেনি। সকালে আবারও আসল ঘাস খেতে। দুইবন্ধু চুপেচুপে গিয়ে মৌমাছিকে খবর দিল।
মৌমাছি খবর পেয়ে আর দেরি করল না। তারা ঝাঁক বেঁধে এসে হরিণ শাবককে ঘিরে ফেলল। কেউ মুখে, কেউ চোখের পাতায়, কেউ কানে, কেউ পায়ে, কেউ পেটে, কেউ পিঠে বসে হুল ফুটিয়ে দিল।
যন্ত্রণায় আর থাকতে পারল না হরিণ শাবক। চিৎকার করে বনে পালিয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে দুইবন্ধু ভীষণ খুশি হলো। বিপদে এগিয়ে আসার জন্য তারা মৌমাছিকে ধন্যবাদ জানাল। তাদের উপকার করতে পেরে মৌমাছিও উৎফুল্ল। তারা একসঙ্গে জয়গান গেয়ে উঠল। সেই থেকে মৌমাছিও তাদের বন্ধু হয়ে গেল। তিনবন্ধু মিলে সেখানে এক সুখের রাজ্য গড়ে তুলল।
মৌমাছি সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য
বন্ধুরা, মাকড়সা, ফড়িংয়ে বিপদে মৌমাছির ভূমিকা সম্পর্কে গল্পটি নিশ্চয়ই ভালো লেগেছে তোমাদের। আসরের এ পর্যায়ে মৌমাছি সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য জানাবো তোমাদের।
তোমরা শুনলে অবাক হবে যে, ছোট্ট প্রাণী মৌমাছি নিয়ে গবেষণা করে ১৯৭৩ সালে অস্ট্রিয়ার এক বিজ্ঞানি চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। শুনলে আরো অবাক হবেন যে, আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন এবং তাঁর প্রিয় বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে আমাদের মৌমাছি ও মধু সম্পর্কে যেসব তথ্য জানিয়েছেন, সেগুলোর ওপর গবেষণা করেছেন এ বিজ্ঞানী। নাম তার কার্ল ভন ফ্রিচ। তার বিখ্যাত বইয়ের নাম Dancing Bees বা 'নৃত্যরত মৌমাছি'।

মৌমাছি কীভাবে জীবন যাপন করে, কীভাবে এরা সংঘবদ্ধ থাকে, কীভাবে মধু সংগ্রহ করে আর এই মধু আমাদের জীবনে কীভাবে রোগ প্রতিরোধ করে আমাদের সুস্থ রাখতে সাহায্য করে তা তিনি খুঁজে বের করেছেন।
তবে এসব তথ্য আমাদের মুসলমানদের কাছে অনেক পুরোনো। মুসলমান মাত্রই এসব তথ্য কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে বহু আগে থেকেই জানে। আর মুসলিম অনেক বিজ্ঞানী এবং কবি মৌমাছির জীবন ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে অনেক আগেই অনেক বই লিখেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুসলমানেরা আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান বিমুখ এবং তার জ্ঞানের আধার খুঁজে বেড়ায় অমুসলিমদের কাছে। অথচ নিজেদের ভাণ্ডারে যে বিশাল জ্ঞান লুকিয়ে রয়েছে সেদিকে লক্ষ্যও করে না।
বন্ধুরা, ছোট্ট প্রাণী মৌমাছিকে তোমরা নিশ্চয়ই ভয় পাও? ভয় পাওয়ারই কথা। কারণ মৌমাছি তার বিষাক্ত হুল ফুটিয়ে দিলে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। হুশ ফোটানোর কারণে মৌমাছি আমাদের তত প্রিয় না হলেও মৌমাছির সংগৃহীত মধু আমাদের অনেকেরই প্রিয়। তাছাড়া, মধু অনেক রোগের মহৌষধ। যেসব রোগের চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনো আবিষ্কার করতে পারে নি, সেসব রোগের জন্য মধু অলৌকিক কাজে দেয়। এমনকি ক্যান্সার কিংবা এইডস-এর মতো রোগে মধুর ব্যবহারে পেতে পারেন অকল্পনীয় ফলাফল। আর সে ফলাফলের কথা আল্লাহপাক ১৪০০ বছর আগেই পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন এভাবে: “তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে তার অন্তরে ইঙ্গিত দ্বারা নির্দেশ দিলেন পাহাড়ে, বৃক্ষে ও মানুষের ঘরের চালে গৃহ নির্মাণ কর। এরপর প্রত্যেক ফল থেকে কিছু কিছু আহার কর, অতঃপর তোমার প্রতিপালক তোমার জন্য যে পদ্ধতি সহজ করেছেন তা অনুসরণ কর, তার উদর থেকে নির্গত হয় বিবিধ বর্ণের পানীয়। এতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য রয়েছে নিদর্শন।” (১৬:৬৮-৬৯)
বন্ধুরা, তোমাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, মধু কেন এত মিষ্টি হয়? এ সম্পর্কে ইরানের বিখ্যাত কবি মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি তাঁর মসনবী শরীফে লিখেছেন, মৌমাছি ফুলের নির্যাস নিয়ে ফিরে যাবার সময় রাসূল (সা.)-এর উপর দরুদ পাঠ করতে থাকে। আর এই দরুদের বরকতে বিভিন্ন ফুলের নির্যাস থেকে সংগ্রহ করা মধু এতো সুমিষ্ট হয়।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৩
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন