ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯ ১৩:৫৯ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছো যে, আমাদের সমাজে এমন অনেকেই আছে  যারা সব সময় কল্পনার জগতে বাস করে। কল্পনার মাধ্যমে তারা ধনী, জ্ঞানী, নেতাসহ নানাকিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এসবের কোনটিই যে চেষ্টা-সাধনা ও পরিশ্রম ছাড়া সম্ভব নয়- তা তারা বুঝতে চান না। এর ফলে দেখা যায়- তাদের স্বপ্ন-স্বপ্নই থেকে যায়, বাস্তবের মুখ দেখে না।

আজ থেকে প্রায় দু'হাজার বছর আগে রচিত বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ ‘কালিলা ও দিমনা'তে এ সম্পর্কে একটি গল্প আছে। রংধনুর আজকের আসরে আমরা গল্পটি শোনাব। আর গল্প শেষে থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে গল্পটি শোনা যাক।

এক শহরে বাস করতেন এক সওদাগর। সওদাগরের ছিল তেলের ব্যবসা। সওদাগরের পাশের বাড়িটি ছিল এক সরলমনা দরবেশের। দরবেশের বউ, ছেলেমেয়ে কেউ ছিল না। তার ধন-সম্পদ বলতেও তেমন কিছু ছিল না। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে যা কিছু জুটতো তাই দিয়েই তিনি কোনোমতে জীবন-যাপন করতেন। দরবেশের সরলতা ও সত্যবাদিতার কারণে তার প্রতি বিশেষ ভক্তি ও সম্মান দেখাতেন সওদাগর। তিনি ওই দীনহীন দরবেশকে প্রায়ই সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। যখনই ব্যবসায় ভালো উপার্জন হতো কিংবা তেলের নতুন চালান আসতো তখনই তিনি দরবেশের জন্য এক পেয়ালা করে তেল পাঠিয়ে দিতেন। তেলের পেয়ালা নেয়ার পর দরবেশ ভাবতেন, "নিশ্চয়ই এ তেলের ভাগ প্রতিবেশীরাও পেয়েছে। তাই আমার নেয়া অন্যায় হবে না। আর তাছাড়া হাদিয়া নেয়া জায়েজ আছে। ভিক্ষা করা নাজায়েজ।"

এসব ভেবে ফকির তেল গ্রহণ করতেন। সওদাগর যে পরিমাণ তেল দিতেন তা ব্যবহারের পরও থেকে যেত। দরবেশ তা একটা কুঁজোতে ঢেলে রাখতেন। এভাবে কিছুদিন পর দেখা গেল কুজোটি তেলে ভরে গেছে। তখন দরবেশ ভাবলেন,‍ "এতো তেল দিয়ে আমি কি করব? আমার তো বউ, পোলাপান কেউ নেই। তারচেয়ে অভাব অনটনে আছে এমন কাউকে দিয়ে দিলেই ভালো হয়। কিন্তু এই মহল্লায় এমন কেউ তো নেই।"

এরপর দরবেশকে অন্য চিন্তা পেয়ে বসল। তিনি ভাবতে লাগলেন, ‍"না, কাউকে এক কুঁজো তেল দান করে লাভ নেই। সে খেয়ে খেয়েই শেষ করে ফেলবে। তাছাড়া বিনামূল্যে ও বিনা পরিশ্রমে এতো তেল পেলে তার স্বভাব-চরিত্রও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর দান করা তারই সাজে যার আয়-উপার্জন আছে। আমার এমন কি আছে যে, দানের চিন্তায় মেতে উঠেছি! তাছাড়া আমারইবা বউ, ছেলেমেয়ে এসব থাকতে অসুবিধা কি? আমিওতো আবার বিয়ে-শাদি করে সংসার গড়তে পারি। সুতরাং দান করার প্রয়োজন নেই। বরং এ তেল বিক্রি করে যে আয় হবে তা দিয়ে ছোটখাট ব্যবসা শুরু করে দেই। যখন ব্যবসার অর্থ দিয়ে অনেক টাকা আয় হবে তখন নিজেদের অভাব মিটিয়ে অন্যদের সাহায্য-সহযোগিতা করব।"

দরবেশ এরপর বসে গেলেন আকাশ-কুসুম পরিকল্পনা প্রণয়নে। মনে মনে হিসাব করতে লাগলেন এভাবে : "কুজোতে প্রায় দশ কেজি তেল হবে। তা বাজারে বিক্রি করলে পাবো তিনশো টাকা। এ টাকা দিয়ে প্রথমে ৫০/৬০টি হাঁস-মুরগীর বাচ্চা কিনবো। বছরখানেকের মধ্যে বাচ্চাগুলো বড় হয়ে ডিম পারা ও বাচ্চা দেয়া শুরু করবে। তখন আমি হাজারখানেক হাঁস-মুরগীর মালিক হবো। তখন সেগুলো বিক্রি করলে ২০/২৫টা দুম্বা কেনা যাবে। দুম্বা পালন করা একদম সোজা কাজ। সেগুলো নিয়ে যাবো মরুভূমি ও পাহাড়ে। শুধু লাঠি হাতে নেকড়ে পাহারা দেবো। একহাতে লাঠি আর অন্যহাতে তসবিহ। ইবাদত-বন্দেগীও হবে, দুনিয়াদারীও চললে। এভাবে বছর দু'য়েক কষ্ট করলেই যথেষ্ট। শত শত দুম্বায় বাড়ী ভর্তি হয়ে যাবে। এরপর দুম্বার দুধ থেকে দই, ঘি, পানির, মাখন এত্যাদি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করবো। তাছাড়া দুম্বার পশমও খুবই লাভজনক ব্যবসা। এসব করে আমি হয়ে যাবো শহরে সবচেয়ে সেরা ধনী।"

এরপর দরবেশ খুশিতে গদগদ হয়ে বলতে লাগলেন: "শহরের সেরা ধনী হওয়ার পর আয়-উপার্জনের কিছু অর্থ দিয়ে প্রথমে ঘরবাড়ি সাজাবো। কিছু ফলের বাগান কিনব। ধনসম্পদ, বাড়ীঘর, বাগবাগিচা দেখাশোনার জন্য কিছু চাকর-বাকরও রাখব। আমি শুধু চাকর-বাকরকে নির্দেশ দেবো আর তারা তা চোখের পলকে পালন করবে। ধনসম্পদ হয়ে যাবার পর নিজের ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকাতে হবে। শহরে সেরা অভিজাত পরিবারের একটা সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে করব। বছরখানেকের মধ্যে একটা সুন্দর সন্তান জন্মাবে। সন্তান ছেলে হোক মেয়ে হোক তাতে কিছু আসে যায় না। ধরে নিলাম আমার প্রথম সন্তান ছেলেই হলো। এরপর ছেলেকে মানুষ করার পালা। আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে তাকে খুব সাবধানে মানুষ করবো। অবশ্য ৬/৭ বছর বয়সে ছেলেটি স্বভাবতঃই একটু দুষ্টুমী করবে। তা করুক। দুষ্টুমী করাও বয়সের ধর্ম।"

এরপর দরবেশ ভাবতে লাগলেন: "ছেলেটি মাঝে মাঝে আবদার করবে রাখালদের সাথে মাঠে যেতে। দুম্বার সাথে দৌড়াদৌড়ি করা বাচ্চাদের কাছে এক অদ্ভুত আনন্দের বিষয়। মুশকিল হলো ছেলেটি কোনো কোনো সময় বড় দুম্বাটির পিঠে চড়তে চাইবে। কিন্তু রাখাল বেটারা হয়তো তা পছন্দ করবে না। কারণ বড় দুম্বাটি কয়েকদিন পরই বাচ্চা দেবে। রাখাল যখন দেখবে আমার আদুরে ছেলেটি ঐ দুম্বার পিঠে চড়ে বসেছে তখন ও ব্যাটা মুর্খ তো শেষমেশ রেগে জ্বলে উঠবে। দৌড়ে এসে আমার ছেলের তুলতুলে পিঠে ওই নেকড়ে মারার লাঠি দিয়ে আঘাত করবে। ব্যাটার কততো বড় সাহাস! আমার ছেলের গায়ে লাঠি পেটানো। দেখাচ্ছি তোর মজার। আমার গোলাম হয়ে আমার ছেলের গায়ে আঘাত! এই নে তোর পাওনা....।"

এই বলেই কল্পনাবিলাসী দরবেশ তার চৌকির পাশে রাখা মোটা লাঠি দিয়ে কল্পিত রাখালের গায়ে হানল জোরসে আঘাত। বিকট শব্দে তার তেলের কুজোটি ভেঙে গেল। মাটির তৈরি কুজোটি ভেঙে তেল ছড়িয়ে পড়ল সারা ঘরে এবং ছিটকে এসে লাগল তার শরীর ও মুখে। জিহবা দিয়ে মুখ চাটতেই তেলের স্বাদ পেয়ে সে কল্পনার আকাশকুসুম চিন্তার জগত থেকে ফিরে এলো বাস্তব জগতে। চোখ মেলে দেখল লাঠির আঘাতে রাখালের মাথা ফাটেনি, ফেটে চৌচির হয়ে গেছে তার এতোদিনের তেলভরা কুঁজোটি। দরবেশ এবার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল মাটিতে। সে বুঝতে পারল, জীবনের বাস্তব পরিকল্পনা আর কল্পনার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। দরবেশ এরপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। কারণ তার লাঠির আঘাতে কুজোটি ভেঙেছে, রাখালের মাথা ভাঙেনি। যদি সত্যি সত্যিই রাখালের মাথা ফাটতো তাহলে প্রথমতঃ পুলিশ দারোগা, হাকিম, মোক্তার, কোর্ট-কাচারির ঝামেলা ছিল। এরপর হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, নইলে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলা! এসব কথা মনে করে দরবেশ আবারো আল্লাহর শোকর-গুজারি করল।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২০

 খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন