ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯ ১৭:৪৩ Asia/Dhaka

বিএনপির ভোট থাকলেও মাঠে আন্দোলন করার মতো অবস্থা তাদের নেই। এটি হচ্ছে বিএনপির একটি বড় দুর্বলতা। তাছাড়া রয়েছে নেতৃত্বের দুর্বলতা। ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যত যৌক্তিক কথাই বলুক না কেন ওইসব কথা সরকারের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। সরকার ওইসব কথায় কান দেবে না। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বাংলাদেশের সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও সাপ্তাহিক'এর সম্পাদক জনাব গোলাম মোর্তজা।

তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ বা ক্রটিযুক্ত নয় তারচেয়েও বড় কিছু।গোলাম মোর্তজা বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দ্রুত ভেঙ্গে যাবে এমনটি মনে হয় না। আর সংসদের বর্তমান বিরোধীদলও কোনও বিরোধীদল নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব গোলাম মোর্তজা, বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসেছে। তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। কীভাবে দেখছেন সামগ্রিক বিষয়কে?

গোলাম মোর্তজা: দেখুন, বিএনপি যা বলেছে তা বিএনপির নিজস্ব ভাষ্য। আমি বিষয়টিকে কিভাবে দেখছি সেটা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব।

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

বাংলাদেশের নির্বাচনের যে ধারাটি আমি দেখেছি তাতে নির্বাচন নিয়ে একটি প্রশ্ন সবসময়ই ছিল কম বেশি। তারপরও মাঝে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে কটি নির্বাচন হয়েছে সেসব নির্বাচনে পরাজিত দল অভিযোগ করলেও গণমাধ্যম এবং দেশের সাধারণ মানুষের বিবেচনায় নির্বাচন সুষ্ঠু, সঠিক, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। দেশি-বেদেশিরা সবাই সেকথা বলেছে। তারপর বিএনপি সরকারের সময় একটা নির্বাচন হয়েছিল- যেটি ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হয়েছিল। এই দুটি নির্বাচন খুব বড় রকেমর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ছিল এবং মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের নির্বাচনটি ব্যাপক আশা-প্রত্যাশার নির্বাচন ছিল কিন্তু এবারের ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি খুব বড় মাপের প্রশ্নবিদ্ধ একটি জায়গাতে গেছে। 

আর নির্বাচনের প্রশ্নবিদ্ধ জায়গাটি টিআইবি রিপোর্টে উঠে এসেছে। টিআইবি বলেছে-৫০ টি আসনের মধ্যে ৪৭ টিতে অনিয়ম, ৩৩/৩৭ টিতে রাতের বেলায় ব্যালট ভরা হয়েছে। আর আমরা যা দেখেছি তাতে মনে হয়েছে খুব বড় মাপের একটা দুর্বল নির্বাচন, বড় মাপের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হয়েছে।

রেডিও তেহরান: জনাব গোলাম মোর্তজা, আপনি যে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কথা বললেন, তো এই প্রেক্ষাপটে সংসদ বাতিল করে নতুন নির্বাচনের যে দাবি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জানিয়েছে তার যৌক্তিক ভিত্তি  আছে নিশ্চয়ই আপনি কী বলবেন?

গোলাম মোতর্জা: তাদের দাবির যৌক্তিক ভিত্তি আছে কিন্তু কেবল যৌক্তিক ভিত্তি থাকলেই তো হবে না যদি ইতিহাস দেখেন তাহলে দেখবেন বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তখন ন্যায্য বা অন্যায্য কোনো দাবিতেই তারা কর্ণপাত করেন না। ততক্ষণ পর্যন্ত কর্ণপাত করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যায় এবং বাধ্য করা যায়। সেটা বিএনপি সরকার, অতীতের সামরিক সরকার বা বর্তমান আওয়ামী লীগের সরকার যাকেই বলুন না কেন।

যেহেতু বিএনপির নেতৃত্বাধীন বা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অনেক ভালো ভালো কথা বলছে, যৌক্তিক কথা বলছে কিন্তু যেহেতু তারা মাঠে আন্দোলন করতে পারছে না এবং চাপ প্রয়োগ করতে পারছে না সেকারণে যত যৌক্তিক কথাই হোক ওইসব কথা সরকারের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। সরকার ওইসব কথায় কান দেবে না। তাছাড়া যৌক্তিক কিনা তারচেয়েও বড় কথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কথাগুলোকে সরকার বা সরকারি দল কোনোভাবেই কোনোরকমের বিবেচনায় নেবেন না। সরকার তাদের মতো করে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে একধনের দমন-পীড়ন ও প্রভাব তৈরি করেই তারা ক্ষমতায় থাকবেন।

রেডিও তেহরান: গোলাম মোর্তজা আপনি যে চাপ প্রয়োগের কথা বললেন, তো সংসদ অধিবেশনের প্রতিবাদে বিএনপি ঢাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। গণশুনানী করেছে। নতুন নির্বাচনের দাবিতে এসব কর্মসূচি কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে আপনি মনে করেন?-তাদের অবস্থাটা আসলে কী!

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

গোলাম মোর্তজা: দেখুন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে ড. কামাল হোসেন বা অন্যান্য যেসব নেতা আছেন তারা ভদ্রচিত রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, তারা মাঠের রাজনীতিতে পারদর্শী নন। এটা হচ্ছে বিএনপি ছাড়া অন্যদের অবস্থা। মাঠে থেকে কাজ না করলে আমাদের দেশের সরকার সেটাকে ধর্ত্যব্যের মধ্যে নেন না। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। তবে তারা এইমুহূর্তে মাঠে থেকে আন্দোলন করবেন, মার খাবেন সেরকম অবস্থা বিএনপির নেই। বিএনপির ভোট থাকলেও মাঠে থেকে আন্দোলন করার মতো অবস্থা তাদের নেই। এটি হচ্ছে বিএনপির একটি বড় দুর্বলতা। তাদের আরেকটি দুর্বলতা হচ্ছে- আমার ধারনা বিএনপির নেতৃত্বটি একটি জায়গা থেকে পরিচালিত হচ্ছে না সে কারণে একটি বড় জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেল সেই নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত বিএনপি কি করবে; কোন্‌ পথে এগোবে সেটা এখনও দলটি ঠিক করতে পারেনি। 

বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তাদের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমিছিল। তাদের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর নামে মামলা আছে, বহু নেতাকর্মী এলাকা ছাড়া। নির্বাচনের পর সেইসব নেতাকর্মীদের অবস্থা কি হলো, তারা কতজন জেলে আছে, কতজনের নামে মামলা আছে, কতজন ঘর ছাড়া এসবের খোঁজ-খবর বিএনপি করতে পারেনি।

নির্বাচনের পর বিএনপি বড় আন্দোলন করতে পারুক বা নাপারুক, সরকার তাদের আন্দোলন করতে দিক বা না-দিক যদি তাদের নেতারা উপজেলা শহর বা জেলাশহরগুলোতে জনসভা করতেন বা স্থানীয় নেতাদের কাছে যেতেন তাহলে হয়তো নেতারা একটু মানসিক জোর পেতেন যে কেন্দ্রীয় নেতারা আমাদের সঙ্গে আছেন। কিন্তু আমরা দেখছি বিএনপির মুখপাত্র পার্টি অফিসে বসে কিছু বিবৃতি এবং প্রেস কনফারেন্স করা ছাড়া বিএনপির আর কোনো কার্যক্রম দেখছি না।

বিএনপি এই যে তাদের নেতাকর্মীদের কাছে যেতে পারলেন না বা যাচ্ছেন না; আমার ধারনা এটি তাদের নেতৃত্বের সংকট। এই সংকট বলতে আমি বুঝাতে চেয়েছি- মির্জা ফখরুল বা তাদের মতো বড় বড় নেতারা থাকার পরও নেতৃত্বের সংকট তৈরি হচ্ছে তার কারণ হচ্ছে-একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কি পুরো দলকে পরিচালনা করতে পারছে নাকি লন্ডন থেকে তারেক রহমানের নির্দেশিত পথে তাকে চলতে হচ্ছে।

আমার ধারনা; আমি বহুদিন থেকে বলছি-বিএনপি মোটামুটি ভালো মতো চলবে তাদের স্থানীয় নেতৃত্বে। অর্থাৎ বাংলাদেশে অবস্থান করা নেতাদেরকে যদি দল পরিচালনার শতভাগ স্বাধীনতা দেয়া হয় তাহলে হয়তো দলটি রাজনীতি করতে পারবে। তাতে দলটি সরকারের ওপর চাপ যতটা সৃষ্টি করতে পারুক না কেন দল গোছানোর কাজটি তারা করতে পারবে। আর এই কাজটি যদি না করতে পারে এবং বিএনপির নেতৃত্ব যদি ভাগ ভাগ অবস্থায় থাকে তাহলে দল হিসাবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দল ভেঙ্গে যাবে, দল হারিয়ে যাবে, থাকবে না এমনটি আমি মনে করি না। তবে দল হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সরকার চাপ অনুভব করবে না এবং নেতাকর্মীরা একধরনের নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। 

রেডিও তেহরান: বর্তমান সরকার দাবি করছে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। দেশে গণতন্ত্র রয়েছে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সুন্দর। অন্যদিকে দেশ বিদেশের বিভিন্ন মিডয়া এবং আপনারা বলছেন নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হয়নি এবং দেশে গণতন্ত্রের অবস্থা ভালো নয়। তাছাড়া রয়েছে সরকারের কথার সাথে বাস্তবতার নানা বৈসাদৃশ্য। তো এই অবস্থা সম্পর্কে আপনার বিশ্লেষণ কী? 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

গোলাম মোর্তজা: দেখুন, অল্প সময়ের মধ্যে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। আর আমরা বারবার বলছি যে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। আসলে প্রশ্নবিদ্ধ বা ক্রুটিযুক্ত নির্বাচন হলেও সেটাকে মেনে নেওয়া যায় কিন্তু সত্যিকারার্থে ৩০ ডিসেম্বরে যে নির্বাচন হয়েছে সেটি কোনো নির্বাচনই না। সেটি ক্রটিযুক্ত বা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন নয়; সেটি তারচেয়েও বড় কিছু! ফলে যে নির্বাচন কোনো নির্বাচন নয়, যে নির্বাচনে ভোটারের কোনো ভোটাধিকার নেই সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে গণতন্ত্র বাংলাদেশে আছে সেটি গণতন্ত্র নয়। আর সত্যিকারভাবে এ ধরনের গণতন্ত্রের সমাধান হবে সে সম্ভাবনাও দৃশ্যমান না। কবে কখন হবে তাও জানিনা।

রেডিও তেহরান: জনাব গোলাম মোর্তজা, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কী ভেঙে যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

গোলাম মোর্তজা: আমার ধারনা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হুট করে ভেঙ্গে যাবে না। তবে ঐক্যফ্রন্ট যে প্রক্রিয়াতে আছে এবং বিএনপি যদি তার নিজের রাজনৈতিক শক্তিকে গোছানোর চেষ্টা করে তাহলে ঐক্যফ্রন্ট মাঠপর্যায়ে আন্দোলনকেন্দ্রিক চাপ দিতে না পারলেও রাজনৈতিক একধরনের চাপ প্রয়োগ করতে পারবে বলে আমার ধারনা। তবে এই মুহূর্তে সেই অবস্থার চিত্র আছে বাস্তবতা সেকথা বলে না।

রেডিও তেহরান: এরশাদের জাতীয় পার্টি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও এ সংসদে তারা বিরোধীদল হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন? কীভাবে দেখছেন বিষয়টিকে?

গোলাম মোর্তজা: দেখুন, এখানে জনগণের মতামতের বা ভোটের প্রতিফলন ঘটেছে সেরকমটি আমাদের কাছে মনে হয়নি। ফলে বর্তমানে যে সংসদ এবং সরকার গঠিত হয়েছে সেই সংসদ এবং সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা করার খুব বেশি কিছু আছে! তার কারণ হচ্ছে এটি একটি একতরফা সংসদ। একটি দল বা একটি জোটের অধীনে যারা জয়ী হয়ে এসেছে তাদের ভেতর থেকে একটি দলকে বিরোধী দল বানানো হয়েছে। কারণ এখানে কোনো বিরোধী দল নেই। আর বানানো বিরোধী দল আসলে কোনো বিরোধী দল হয়না। সেই অর্থে সংসদে কোনো তর্ক-বিতর্ক হবে না, জনগণের কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে না। জনমানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ও এই সংসদে আলোচনা হবে না। দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নিয়েও বর্তমান সংসদে কোনো আলোচনা হবে বা সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হবে এমনও কিছু হবে না। পুরোটাই সরকারি দল এবং সরকারি জোট। আর সেই সরকারি জোট তাদের নিজেদের সুবিধার জন্য এবং দেশবাসীকে দেখানোর জন্য একটি বিরোধী দল তৈরি করেছে। আর একইসাথে সরকারি দলের ও বিরোধী দলের চাপি প্রধানমন্ত্রীর হাতে। এরকম একটি একতরফা জায়গায় একটি দল, একটি জোট বা একজন ব্যক্তি যখন সবকিছু পরিচালনা করবেন সেখানে জনমানুষের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হলো, কতোটা দেখা হলো বা আদৌ দেখা হবে কিনা এসব বিষয়ে প্রত্যাশা করার কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৩