'ব্যবসার জন্য বিশ্বের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশ ইরান'
৪০ বছরে ইরানের বিপ্লব আরও শক্তিশালী হয়েছে। এবারের বিপ্লব বার্ষিকীর দিনে কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণের চিত্র সাম্রাজ্যবাদীদের হতাশ করেছে। ইরান সফরে এসে রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাসনাইন শিশির।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসার ক্ষেত্রে বিশ্বের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশ ইরান। তাছাড়া বেড়ানোর জন্য ইরানের তুলনা হয় না।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: সম্প্রতি ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উদযাপিত হলো। এই যে বিপ্লব সফল হয়েছে- এর প্রধান অর্জনগুলো কী?
হাসনাইন শিশির: দেখুন, আপনার এ প্রশ্নের জবাব খুব সংক্ষেপে দেয়া সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কার্যক্রম যদি আমরা বিভিন্ন দেশে দেখি তাহলে বোঝা যাবে তারা একটি জাতিকে দুটি ভিন্ন মতাদর্শে প্রথমে ভাগ করে তারপর দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই বাধিয়ে দেয়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করো এবং শাসন করো। এভাবে একটি জাতিকে তারা ধ্বংস করতে চায়। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ৪০ তম বিপ্লব বার্ষিকীতে দেশটির কোটি কোটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোকে এই ম্যাসেজ দিচ্ছে যে, তোমরা আমাদের জাতীয় ইসলামি ঐক্যতে কখনও ভাঙন ধরাতে পারবে না। ইরানের এবারের বিপ্লব বার্ষিকীর চিত্র মূলত সাম্রাজ্যবাদীদের হতাশ করে দিল। ইরানের সাধারণ মানুষ ৪০ তম বিপ্লব বার্ষিকীর দিনে রাস্তায় নেমে এই ম্যাসেজ দিল যে আমরা এখনও ইসলামি বিপ্লবের চেতনাকে ভীষণভাবে ধারন করি এবং এই বিপ্লবের চেতনা নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যাব।
রেডিও তেহরান: ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ইরান কী এখন সেই অবস্থানে টিকে আছে বলে আপনি মনে করেন?
হাসনাইন শিশির: দেখুন, আমি এর ইতিবাচক দিকটা দেখতে চাই। আমার কাছে মনে হয় শুরুতেই যেভাবে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছিল বর্তমানে ইরান আরও শক্তিশালীভাবে সেই অবস্থানে টিকে আছে। উদাহরণ হিসেবে আমি বলতে চাই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইরানের ওপর একতরফাভাবে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে।
বিভিন্ন দেশে আপনারা দেখে থাকবেন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর আচরণ! যদি কোনো দেশের সাথে তাদের ঐক্যমত না হয় তাহলে তারা সামরিক হস্তক্ষেপও করে থাকে কিন্তু কোনোভাবে ইরানের ওপর সামরিক হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা তাদের নেই। আর সে কারণে তারা ইরানের ওপর অন্যায়ভাবে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের বিষয়টি চাপিয়ে দিয়েছে। আর এটাই ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সফলতা।
এই মুহূর্তে ইরান যে অবস্থানে আছে তাতে কোনো সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে ইসলামি বিপ্লবকে ভেঙ্গে দেয়ার ক্ষমতা বা সরকার পতনের ক্ষমতা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নেই। আর সে কারণে তারা বিকল্প হিসেবে অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে বিপ্লবের বিরুদ্ধে একটা চেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা করছে। তবে আমি মনে করি তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ। আর ব্যর্থ এই কারণে যে, বিপ্লবের চল্লিশতম বার্ষিকীতে কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণ। ইরানের মানুষ তাদের ইসলামি সরকারের প্রতি সন্তুষ্ট সেটার প্রমাণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
রেডিও তেহরান: জনাব হাসনাইন শিশির, এবার আপনার ইরান সফর নিয়ে কথা বলতে চাই। যতটুকু জানি এটি আপনার ইরানে প্রথম সফর নয়; কয়েকবার ইরানে এসেছেন। তো ইরান আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
হাসনাইন শিশির: জ্বি ইরানে আমার এটি প্রথম সফর নয়। আমি প্রায় দীর্ঘ দশ বছর ধরে ইরানের সাথে ব্যবসায়ী কাজে জড়িত। ২০১৩ সাল থেকে ইরানে আমার যাওয়া আসা।
প্রথমেই আমি ইরান সম্পর্কে যেটা বলতে চাই সেটি হচ্ছে, সাংস্কৃতিকভাবে দেশটি বেশ সমৃদ্ধ। আমি ইরানের প্রতিবেশী বেশ কিছু মুসলিম দেশে ঘুরেছি। সেসব দেশের সাথে ইরানের তুলনা করলে এই দেশটি সাংস্কৃতিকভাবে বেশ উন্নত বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশের সাথে ইরানের এই পার্থক্যটাই আমার চোখে বেশি পড়েছে।
রেডিও তেহরান: আপনি ইরানের সাথে আপনি ব্যবসা করেন বলে জানি। তো বর্তমানে ইরানের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক কেমন?
হাসনাইন শিশির: আসলে ২০০৮ বা ২০০৯ সালের দিকে যখন আমি ইরানের সাথে প্রথম ব্যবসা শুরু করি তখন দেশটির বিভিন্ন ব্যাংক যেমন- ব্যাংকে মেল্লি, ব্যাংকে শেফা, ব্যাংকে তেজারাত এর সাথে বাংলাদেশের আর্থিক লেনদেন অর্থাৎ লেটার অব ক্রেডিটের সুযোগ ছিল। এসব ম্যাকানিজম দিয়ে আমরা তখন ব্যবসা করতে পারতাম। কিন্তু কালক্রমে ইরানের ওপর এমনভাবে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যে সম্ভবত ২০১২/১৩ সালের পর থেকে আর এলসির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের সুবিধাটা পাচ্ছি না। বলাচলে ইরানের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেনটা অত্যন্ত কঠিন হয়েছে।
রেডিও তেহরান: জ্বি, আপনি ইরানের কোথায় কোথায় গেছেন, কেমন লেগেছে সেসব জায়গা?
হাসনাইন শিশির: আমার অনেকবারের ইরান সফরে সবচেয়ে বেশি যে জায়গায় গিয়েছি এবং থেকেছি সেটি হচ্ছে কাশান। যেহেতু আমি কার্পেট ব্যবসার সাথে জড়িত এবং কার্পেটের ফ্যাক্টরিগুলোতে কাঁচামাল সরবরাহ করে থাকি। আর কার্পেটের বেশিরভাগ কারখানা কাশানে। এই শহরটি আমার কাছে অনেক বেশি ভালো লাগে। বলতে পারেন এই শহরটিকে আমার কাছে নিজের বাড়ির মতো মনে হয়। কাশান ছাড়াও কোম, ইস্ফাহান,মাশহাদ, গার্মসারসহ বেশকিছু জায়গায় গেছি।
রেডিও তেহরান: ব্যবসায়ী প্রসঙ্গে আবার একটু ফিরে আসব। আপনি যেহেতু কার্পেট ব্যবসার সাথে জড়িত। বিশ্বজুড়ে ইরানি কার্পেটের ব্যাপক সুনাম আছে। তো শুধু কার্পেট নয় ব্যবসার অন্যান্য সেক্টরেও ব্যবসার কেমন সম্ভাবনা আছে..
হাসনাইন শিশির: একজন ব্যবসায়ীর দৃষ্টি থেকে আমি বলতে পারি ইরান ব্যবসার জন্য বিপুল সম্ভাবনার দেশ। কারণ লিটারেলি বলা যায় ইরান সম্পদে ভরপুর একটি দেশ। শুধু কার্পেট না আরও বিভিন্ন সেক্টর এখানে রয়েছে। আমার বর্তমান সফরের উদ্দেশ্য ইরান থেকে মার্বেল এবং গ্রানাইট বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের বায়াররা অতীতে মার্বেল এবং গ্রানাইট তুরস্ক বা ইন্ডিয়া থেকে নিয়ে আসত। অথচ ইরানের মার্বেল এবং গ্রানাইটের মান ও দাম অত্যন্ত ভালো। আর সেকারণে ইরানকে আমরা এক্ষেত্রে অনেক বেশি সম্ভাবনাময় বলে মনে করছি। আশা করছি অদূর ভবিষ্যতে এসব পণ্য আমরা ইরান থেকে বাংলাদেশে নিয়ে বাজারজাত করতে পারব।
রেডিও তেহরান: জনাব শিশির ইরান সফরে এসে চলতে ফিরতে এখানকার নারীদের দেখেছেন। তো নারী স্বাধীনতা, হিজাব এবং তাদের উন্নয়ন কেমন দেখলেন?
হাসনাইন শিশির: দেখুন, একটি জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য তার নারীদের বিশেষ করে শিক্ষিত নারীদের যে অবদান থাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সেক্ষেত্রে পর্দার মধ্যে থেকে ইরানের নারীরা কি পরিমাণ ভূমিকা রাখতে পারে তা এখানকার একটি পেট্রল স্টেশন থেকে শুরু করে ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দরসহ সর্বত্র গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এবং পদে দেখলে বোঝা যায়। সর্বত্র নারীরা আসীন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী কর্মকর্তাদের দেখতে পাই। আমি মনে করি এটি ইসলামি ইরানের অনেক বড় একটি সফলতা। ইসলাম নারী শিক্ষা, নারী স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নারীদের দমিয়ে রাখতে চায় এমন ম্যাসেজ যারা দিতে চায় তা ভুল প্রমাণ করল ইসলামি ইরান। কারণ ইসলামি বিপ্লবের পর আজ এখানকার নারীদের শালীন পোশাকে যে সর্বত্র কর্মযজ্ঞের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি সেটাই প্রমাণ করে ইসলামি ইরান নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এবং নারীদের যথাযোগ্য সম্মান দেয়। আমি আপনাদের যে স্টুডিওতে বসে কথা বলছি সেখানেও দায়্ত্বিরতরা বেশিরভাগ নারী। ইরানের সর্বত্র নারীদের শিক্ষা, সমস্ত কাজে অংশগ্রহণ এবং যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে সেটি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের অনেক বড় সফলতা বলে মনে করি।
রেডিও তেহরান: ইরানের সামগ্রিক উন্নয়নকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
হাসনাইন শিশির: ইরানের সামগ্রিক উন্নয়নের বিষয়টি বলতে গেলে আপনাকে একটু পেছনে নিয়ে যাব। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পূর্ববর্তী অবস্থা কী ছিল নিশ্চয়ই তা আপনার স্মরণে থাকার কথা। সেই সময়কার অবস্থার সাথে যদি আপনি বর্তমান অবস্থার তুলনা করেন তাহলে বোঝা যাবে তফাৎ কতটা। বিশেষ করে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ইরানের উন্নতি এককথায় চমৎকার। পরমাণু বিষয়ে অ্যাডভ্যান্স সেন্ট্রিফিউজ ইরান আবিষ্কার করেছে। এই প্রযুক্তি কেবলমাত্র আমেরিকা ও জাপান ছাড়া অন্য কারও কাছে নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যাপক উন্নতি করেছে। আমি মনে করি অবরোধ আরোপের ফলে ইরানের বিজ্ঞান চর্চা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের অর্জনগুলো সত্যিই বিস্ময়কর।
রেডিও তেহরান: জনাব হাসনাইন শিশির, সবশেষে ইরানে প্রকৃতি এবং পরিবেশ সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?
হাসনাইন শিশির: দেখুন,আমি পাহাড় খুব পছন্দ করি। ইরানের রাস্তা-ঘাট দিয়ে যখন চলাফেরা করি গাড়ির জানালা দিয়ে পাহাড় দেখি। আর পাহাড়ের ওপর যখন শুভ্র বরফ দেখি তখন সত্যিকথা মন জুড়িয়ে যায়। আমি যখন আপনাদের স্টুডিওতে আসি তখন চারদিকে ঘেরা পাহাড়গুলো মনভরে দেখলাম। মনোরম দৃশ্য। আর শুধু তেহরান নয় ইস্ফাহান, কাশান-সব জায়গার কথা বলছি। গোটা ইরানের প্রকৃতি ও পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমি গেছি, বেড়িয়েছি। বেড়ানোর জন্য ইরানকে আমার কাছে অদ্বিতীয় বলে মনে হয়েছে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৬
- খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন