ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই মুহূর্তে যুদ্ধের আশঙ্কা নেই: অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান
ভারত পাকিস্তানের মধ্যে বর্তমানে উত্তেজনা বড় কোনো সংঘাতের দিকে যাবে না বরং নিষ্পত্তির দিকে যাচ্ছে। রেডিও তেহরানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান।
কাশ্মির সমস্যার সমধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন না। তাছাড়া সন্ত্রাসী ঘটনার জেরে ভারতজুড়ে কাশ্মিারি মুসলমানদের ওপর হামলার ঘটনা নিশ্চয়ই নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেন বিশিষ্ট এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান. ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এ মুহূর্তে চরম উত্তেজনা চলছে। এরইমধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং ভারতের দুটি বিমান ভূপাতিত করেছে পাকিস্তান।সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আপনার কী মনে হয় দু দেশের মধ্যে বড় সংঘাত শুরু হতে পারে?
অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান: না। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় কোনো সংঘাত শুরু হওয়ার মতো কোনো সম্ভাবনা আছে বলে এই মুহূর্তে আমার মনে হয় না। বরং এখন বিষয়টা নিষ্পত্তির দিকেই যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিউজ মিডিয়ার মাধ্যমে যতটুকু বোঝা গেল তাতে সম্ভাবনা নেই বলে মনে হয়। বিশেষকরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমনে চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্ব ভারতকে আহ্বান জানানো হয়েছে। তাছাড়া সমঝোতার জন্য পাকিস্তানের যে আহ্বান তাতে পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। দুদেশের মিডিয়া ও সরকারের এক্সপ্রেশন দেখে মনে হচ্ছে উভয়পক্ষ যেকোনোভাবে আক্রমণাত্মক ভূমিকা পরিহার করবে।
যদিও ভারতের দুই একটা গোষ্ঠী এখনও বলছে যে আরও দুই একদিন আক্রমণাত্মক কোনো মিশনে গেলে মন্দ হয় না। তবে এটিকে ঠিক কোনো যুদ্ধ বলা যায় না বরং অতি সীমিত নিম্ন মাত্রার সংঘাত হিসেবে গণ্য করা যায়। ইংরেজিতে আমরা একে বলি, low level conflict. লোকালাইজড কনফ্লিক্ট বললেই বোধহয় ঠিক বলা হবে। বিভিন্ন আণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয় সেদিক থেকে বলা যায়- de escalation প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। বিস্তৃতকরণ রোধ প্রক্রিয়া এরইমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তারা উভয় দেশ এখন একটা নিষ্পত্তির দিকে যাচ্ছে।
রেডিও তেহরান: কাশ্মিরের পুলওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলার যে অভিযোগে চলমান উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে সে অভিযোগকে আপনি কীভাবে দেখেন?
অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান: দেখুন, নিশ্চয়ই কোনো একটা শক্তির প্রভাব ছিল। কাশ্মিরে সন্ত্রাসী হামলার বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় দাবিকে গুরুত্ব না দেয়ার কোনো উপায় নেই। আপনি হয়তো লক্ষ্য করবেন এই ঘটনার কয়েকদিন আগে পাকিস্তান-ইরান সীমান্তে একটি মারাত্মক রক্তক্ষয়ী আক্রমণ ঘটানো হয়েছিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ওপর। আর সেই ঘটনার পেছনে পাকিস্তানের যথেস্ট মদদ ছিল। ওই ঘটনায় ইরান অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিল। আর ইরানের ক্ষুব্ধ হওয়ার পেছনে যথেস্ট যুক্তি ছিল। কাজেই ইরানের সীমান্তে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনা এবং কাশ্মিরের ঘটনাকে আলাদা করে দেখার মতো কিছু নয়। আমার মনে হয় সেখানে নিশ্চয়ই পাকিস্তানের একটা হাত ছিল। আর ভারতীয় গোয়েন্দারা যথাযথভাবে সে ব্যাপারে তথ্য নিরুপণ করতে পেরেছে।
রেডিও তেহরান: অনেকে বলছেন, ভারতের নির্বাচনকে সামনে রেখে নিতান্তই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এমন বক্তব্যকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান: ভারতের নির্বাচনকে সামনে রেখে নিতান্তই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, এমনটি যারা বলছেন বা মনে করছেন-তাদের এই মনে করা পুরোপুরিভাবে সঠিক। আর সেটাই প্রধান বিষয়। লাভবান হওয়ার জন্য নরেন্দ্র মোদি এই সুযোগটা গ্রহণ করেছে এবং তার মাধ্যমে যথেস্ট ফায়দা লুটছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আচরণ অত্যন্ত ঘৃণ্য প্রকৃতির এই অর্থে যে; সে নিজেকে যেভাবে ডিসপ্লে করছে; মাথায় পাগড়ি পরে যেভাবে সেজেগুজে যাত্রার নায়কের মতো নাটকীয়ভাবে বক্তৃতা দিল সেটি প্রকৃতপক্ষে একজন অশিক্ষিত দুর্বল মনের মানুষের পক্ষেই সম্ভব। তাঁর যদি চারিত্রিক গুণাবলী থাকত তাহলে এরকম একটা অবস্থায় ওইরকম নাটকীয় বক্তব্য দিতে পারে না। পুরো বিষয়টাই তার আগামী নির্বাচনের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
রেডিও তেহরান: কাশ্মির ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মূল দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এ সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী ভূমিকা রাখতে পারে?
অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান: দেখুন, কাশ্মির ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো ভূমিকা রাখবে না এবং রাখার মতো কোনো সম্ভাবনাও আমি দেখছি না। আর আমার কাছে মনে হয়েছে নতুন প্রজন্মের কাশ্মিরীরা যতদূর সম্ভব চেষ্টা করছে ভারতের মেইন স্ট্রিমে প্রবেশ করতে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির অঞ্চলে যে ধরনের রাজনীতি ও বাস্তবতা রয়েছে তাতে এমন কোনো ইঙ্গিত দেয় না যে সেখানে সীমান্ত রেখার কোনো পরিবর্তন ঘটবে। এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র যে কাশ্মির অঞ্চলটা একটা স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিবর্তিত হবে এবং ভারত ও পাকিস্তান দুটি দেশই পরিণতিতে কাশ্মিরের স্বতন্ত্র অবস্থানকে গ্রহণ করতে শিখবে। দেখুন, এটা আচরণ ও সংস্কৃতির ব্যাপার। ফলে আমার মনে হয় না কাশ্মিরে আন্তর্জাতিক অন্য কোনো পক্ষ নাক গলাতে চাইবে।
রেডিও তেহরান: জনাব অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান, সবশেষে আপনার কাছে জানতে চাইবো-কাশ্মির ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে সন্ত্রাসী হামলার জের ধরে পুরো ভারতজুড়ে কাশ্মিরি মুসলমানদের ওপর নানারকম অত্যাচার ও হামলার ঘটনা ঘটছে। এ পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান: দেখুন, ভারতজুড়ে কাশ্মিারি মুসলমানদের ওপর হামলার ঘটনা নিশ্চয়ই নিন্দনীয়। তবে এরকম ঘটনা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও ঘটে শুধু তাই নয় পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশেও ঘটে।
তবে কাশ্মিরের ক্ষেত্রে এসব ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত দুজন মানুষ রয়েছেন। একজন হচ্ছেন মুফতি সাঈদের কন্যা মাহবুবা মুফতি অন্যজন হচ্ছেন ওমর আবদুল্লাহ। দুজনই অত্যন্ত মেধাবী, ক্ষমতাসীন এবং কার্যকর নেতৃত্ব তাদের হাতে রয়েছে। তারা কাশ্মিরের বিষয়টি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেন এবং অত্যন্ত কার্যকরভাবে কাশ্মিরের যে আলাদা সত্ত্বা সেটা তুলে ধরতে দ্বিধাবোধ করেন না। এই দুজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং তাদের সাথে অন্যান্য যারা মেইন স্ট্রিমে আছেন তাদেরকে আমি দেখছি কাশ্মিরকে নিয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে।
অন্যান্যদের ভূমিকা কম বলে মনে হয়েছে। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এবং বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা তারা গ্রহণ করে। তাদের খুব বেশি জনসংযোগ থাকা বা ভারতের সরকারের সাথে বাস্তবভিত্তিক আলোচনা করার মতো যোগ্যতা আছে বলে আমার মনে হয় না। কাজেই আপাতত মেহবুবা মুফতি এবং ওমর আবদুল্লাহর মতো দুজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ তারা কাশ্মিরিদের অধিকার ও স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২