মার্চ ০৮, ২০১৯ ২০:১৮ Asia/Dhaka

আইন-আদালতের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব নয়, রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ২৯ তারিখ রাতে একধরনের নির্বাচনী খেলার মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে।

সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া গণফোরাম নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদকে অঙ্গীকার ভঙ্গকারী গণশক্র বলে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপির এই নেতা।

অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়া

বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা প্রসঙ্গে শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসনে চিকিৎসা নিয়ে যে আচরণ করছেন সেটি  কোনো সভ্য দেশে কখনই সম্ভব হতো না।

শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বর্তমান সরকারের পতন ছাড়া এখানে সভ্য-ভব্য, আইনের শাসন ও মানবিক বিষয়ের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।

বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করেছে তারপরও বিএনপিকে ধ্বংস করা যায় নি। বিএনপি এতটাই সুদৃঢ়ভাবে আছে যে তাকে নির্বাচনে মোকাবেলা করার মতো নৈতিক শক্তি বর্তমান সরকার হারিয়ে ফেলেছে।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: শামসুজ্জামান দুদু, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে দলটি ৬ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে-আইনিভাবে মোকাবেলার পরিবর্তে কেন আপনারা মুক্তির দাবি করছেন?

শামসুজ্জামান দুদু: দেখুন, বাংলাদেশের হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা এরইমধ্যে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আইনের মাধ্যমে বিচার অঙ্গনের তৎপরতায় খালেদা জিয়ার মুক্তির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তারা স্পষ্ট করে একথাও বলেছেন যে, অতীতে পাকিস্তান আমলে মাওলানা ভাসানি, শেখ মুজিবর রহমান বা অন্যান্য জাতীয় নেতাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং গ্রেফতার করা হয়েছিল। তখন যেভাবে রাজপথের আন্দোলনে জাতীয় নেতাদের  মুক্ত করা হয়েছিল ঠিক তেমনি বাংলাদেশের চার বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও মুক্ত করতে হলে সংবিধানে যেসব কথা লেখা আছে, আইন আদালত বলে যা আছে তার মধ্য দিয়ে মুক্তির প্রত্যাশা না করাই ভালো। রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।

রেডিও তেহরান: মানববন্ধন থেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য জনগণের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। জনগণের ঐক্য বলতে আসলে আপনারা কী বোঝাতে চেয়েছেন এবং সেটা কী সম্ভব? 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

শামসুজ্জামান দুদু: দেখুন, যেমনটি অতীতে আমরা দেখেছি আইয়ুব খানের শাসনামলে-বেসিক ডেমোক্রেসি ও উন্নয়নের নামে নির্বাচনকে ভণ্ডুল করে মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে ১০ বছর দেশ পরিচালনা করেছিলেন। ঠিক তেমনটি ১৯৮৩ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ এর গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন। আর সেই রাষ্ট্রপরিচালনায় কখনও কখনও আওয়ামী লীগ এবং অনান্য রাজনৈতিক দলের একধরনের সমর্থন পেয়েছে। বর্তমানেও শেখ হাসিনা তথাকথিত নির্বাচনের নামে ১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এবং ২০১৮ সালের ২৯ তারিখ রাতে একধরনের নির্বাচনী খেলার মধ্য দিয়ে তারা ক্ষমতায় আছে আর এক্ষেত্রে তার সহযোগী হচ্ছেন এইচ এম এরশাদ যাকে একসময় শেখ হাসিনা সমর্থন দিয়েছিলেন। 

বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের যে সভ্য-ভব্য রীতি-নীতি ছিল সেটা এখন আর কার্যকরভাবে দেখছে না দেশবাসী। বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তন সম্ভব বলে আমরা মনে করছি না। আর সে কারণে জনতার ঐক্য অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বনাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে একটি আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে তৈরি করা এবং সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে কাজ করা। আর এটাকেই আমরা বলছি জনতার ঐক্য।

রেডিও তেহরান:  জনাব শামসুজ্জামান দুদু, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদের সংসদে শপথ নিয়েছেন এবং এরইমধ্যে তাকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তো  তার এ শপথ নেয়া সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?

শামসুজ্জামান দুদু: দেখুন, সুলতান মোহাম্মাদ মনসুর আহমেদ একসময় ডাকসুর ভিপি ছিলেন। সেই ভিপি হওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করবেন এবং গণঅভ্যত্থানের নেতৃত্ব দেবেন। আর একথা বলে তিনি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে সময় আমি তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম। কিন্তু সেটি তিনি করতে পারেন নি। পরবর্তীতে আমান-খোকনের নেতৃত্বে ছাত্রদল ডাকসুতে বিজয় লাভ করে। এর এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এইচ এম এরশাদের পতন ঘটে। সেই সুলতান মোহাম্মাদ মনসুর আহম্মেদ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে গণফোরামের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ মার্কা নিয়ে জনতার কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন। অথচ এই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত যে নির্বাচনের রায়কে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বর্জন করেছে। জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের আরও নির্বাচিত সদস্য শপথ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন আর তিনি শপথ নিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করে জনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাকে আমরা এখন গণশক্র হিসেবে মনে করছি। অঙ্গীকার ভঙ্গকারীকে আল্লাহও পছন্দ করেন না সে কারণে তার এ উদ্যোগকে দেশের মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।

রেডিও তেহরান: আপনারা আরেকটি দাবি করছেন যে, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে কী খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা দিচ্ছে না সরকার? এজন্য সরকার আসলে কী করতে পারে?

শামসুজ্জামান দুদু: দেখুন, আসলে দেশে একপক্ষীয়, কতৃত্ববাদী বা স্বৈরতান্ত্রিক একটি সরকার ক্ষমতা দখল করে আছে। ফলে স্বাভাবিক কারণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের মাধ্যমে পরাজিত করতে পারবেন এমনটি মনে করেন না বলেই নির্বাচনী ব্যবস্থা ভণ্ডুল করেছেন। 

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে আচরণ করছেন সেটি  কোনো সভ্য দেশে কখনই সম্ভব হতো না। বেগম খালেদা জিয়ার সুচিৎসার জন্য আমরা বারবার  আদালতে গেছি এবং হাইকোর্ট বারবার তার চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলেছে কিন্তু হাইকোর্টের কথা সরকার কোনোভাবে গুরুত্বসহ নেয় নি। যেমন এখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বা সরকারের মুখপাত্র ওবায়দুল কাদের সাহেব অসুস্থ হওয়ার পর আমরা দেখলাম দেশ এবং বিদেশের বহু চিকিৎসকে এনে তাকে দেখানো হয়েছে এবং সরকার দাবি করেছেন একইসাথে ভারতের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. দেবি শেঠীও বলেছেন বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ওবায়দুল কাদেরকে খুব ভালো চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তারপরও ওবায়দুল কাদের সাহেবকে এয়ার বাসে করে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়েছে। 

একজন মন্ত্রী বা একটি দলের সাধারণ সম্পাদকের জন্য সরকার অনেক বেশি উদ্বিগ্ন অথচ সাবেক ৩/৪ বারের প্রধানমন্ত্রী এবং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের চেয়ারপাসনের প্রতি রয়েছে ভীষণভাবে অবহেলা। স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দিলে বোঝা যায় আসলে সরকারের অবস্থানটা কী! আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে বর্তমান সরকারের পতন ছাড়া এখানে সভ্য-ভব্য, আইনের শাসন ও মানবিক বিষয়ের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।

রেডিও তেহরান:  জনাব শামসুজ্জামান দুদু, সম্প্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখেন? 

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি

শামসুজ্জামান দুদু: দেখুন, বিএনপি বেশ কয়েকবার বড়রকমের আক্রমণ ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। শহীদ জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন। তাকে হত্যা করা হয়। আর ঠিক তখন বিএনপিকে ধ্বংস করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকে দল থেকে ভাগিয়ে নেয়া হয়েছিল ও নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল। দীর্ঘ নয় বছর বেগম খালেদা জিয়া এবং তার সহকর্মীদেও ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছিল সেটা ইতিহাসে বিরল ঘটনা তারপরও ১৯৯০ এর গণ অভ্যুত্থান খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির মাধ্যমেই সংঘঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের নামে একটি জনপ্রিয় সরকারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। শুধু উচ্ছেদই করা হয়নি সেসময় সংবিধান বহির্ভূত অনেকগুলো ঘটনা ঘটতে দেখেছি।

আর গত দশ বারো বছরের আক্রমণের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে যে, বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করা হয়েছে। তারপরও বিএনপিকে ধ্বংস করা যায় নি। বিএনপি এতটাই সুদৃঢ়ভাবে আছে যে তাকে নির্বাচনে মোকাবেলা করার মতো নৈতিক শক্তি বর্তমান সরকার হারিয়ে ফেলেছে। যে কারণে সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং সরকার ৩০ ডিসেম্বরে নির্বাচনের কথা বলে তার আগের রাতে নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। আর সে কারণেই বলব তারা বিএনপিকে নির্বাচনে পরাজিত করতে পারে নি এবং বিএনপি একমাত্র শক্তি যারা গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য ফিনিক্স পাখির মতো আবার জেগে উঠবে।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৮