'ইরান ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে চিন্তা ও সাংস্কৃতিক ঐক্যবোধ রয়েছে'
ফার্সি নতুন বছর নওরোজ উপলক্ষে তেহরানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ কে এম মজিবুর রহমান ভূঁঞা রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানে ফার্সি নতুন বছর নওরোজ ও বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ-এই দুই উৎসবের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে। মিল রয়েছে ঐতিহ্যগত।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা। এটি উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
শ্রোতা/পাঠক, আপনারা জানেন ফার্সি নতুন বছরকে নওরোজ বলা হয়। ইরানিদের সবচেয়ে বড় উৎসব হচ্ছে নওরোজ। ফার্সি "নওরোজ" শব্দটির অর্থ নতুন দিন। নওরোজ বিশ্বের প্রাচীনতম উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। জনপ্রিয় এ সংস্কৃতি ও উৎসব আজ শুধু ইরানের জাতীয় উৎসব নয়, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক ও ইরাকেও এ উৎসব জাতীয় পর্যায়ে পালিত হয়। এ উৎসব কম-বেশি পালিত হচ্ছে জর্জিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও। সাধারণত ২০ বা একুশে মার্চ ফার্সি নববর্ষ শুরু হয়। বসন্ত ঋতু শুরু হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় এ নববর্ষ।
রেডিও তেহরান: জনাব মুজিবর রহমান ভূঁঞা, প্রথমেই আপনার কাছে জানতে চাইব যে বিষয়টি সেটি হচ্ছে- বাংলাদেশ এবং ইরান দুটি দেশেই নববর্ষ পালিত হয়। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ–বাংলা নববর্ষ এবং ইরানের ফার্সি নববর্ষ হচ্ছে-নওরোজ। গতকাল ছিল ফার্সি নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ নওরোজ। এটিই ছিল বসন্তের প্রথম দিন। এই নওরোজ উৎসব চলবে প্রায় দুই সপ্তা ধরে। তো ইরানের নববর্ষ বা নওরোজ এবং বাংলাদেশের নববর্ষ এই দুই উৎসবের মধ্যে সাংস্কৃতিক কোনো মিল আছে কি না?
মুজিবর রহমান ভূঁঞা: 'নওরোজ' সম্ভবত ইরানের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই উৎসবে ইরানের আপামর জনগণ মেতে ওঠেন। নতুন বছরকে বা নতুন বসন্তকে তারা তাদের জীবনে সাদরে গ্রহণ করেন। আর এই নওরোজ উৎসবের মাধ্যমেই ইরানিরা তাদের জাতীয় জীবনে এগিয়ে যান। একইভাবে বাংলাদেশেও পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ পালিত হয় অত্যন্ত আনন্দ ও উৎসাহের মধ্য দিয়ে। উৎসব মুখরতার ছোঁয়া থাকে বাংলা নববর্ষ পালনে। নববর্ষ পালনের রীতি-নীতি ও উৎসব মুখরতার মধ্যে দু দেশের মাঝে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়। উভয় দেশের মানুষ নববর্ষে-নতুন জীবনের জন্য নতুন ক্ষণকে আহ্বান করে থাকে। আর এর মাধ্যমে তারা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
রেডিও তেহরান: মুজিবর রহমান ভূঁঞা, আপনি যেমনটি বললেন যে ফার্সি নববর্ষ নওরোজ ও বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখের মধ্যে সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে। নওরোজ এবং বাংলা নববর্ষে ইরান ও বাংলাদেশের জনগণ নতুন ক্ষণের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান। তো এবারে আপনার কাছে জানতে চাইব ইরানি নওরোজের প্রভাব বাংলাদেশের সমাজ জীবনে কতোটা রয়েছে?
মুজিবর রহমান ভূঁঞা: দেখুন, ইরানে ফার্সি নতুন বছর বা নওরোজের প্রভাব এখানকার জাতীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে যে কতোটা জায়গা জুড়ে আছে সে সম্পর্কে বাংলাদেশের জনগণ খুব ভালোভাবে অবহিত আছেন। বাংলাদেশের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অন্যান্য কবিদের বিভিন্ন সৃষ্টির মধ্যে ইরানি নওরোজের কথা উল্লেখ আছে। কাজেই আমরা একথা বলতে পারি- ইরান ও বাংলাদেশের নববর্ষ পালনের যে ঐতিহ্য তার মাধ্যমে আমাদের চিন্তা ও সাংস্কৃতিক ঐক্যবোধের বিষয়টি আমি দেখতে পাই। আর এ কারণেই দেশ দুটির মধ্যে একটা সুন্দর এবং সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্ববোধ বিরাজ করছে।
রেডিও তেহরান: পারস্য সভ্যতা অনেক প্রাচীন। ইরানের ইতিহাস ঐতিহ্য যেমন প্রাচীন। বাংলাদেশের ঐতিহ্য কম পুরনো নয়। এ দুটি দেশের মধ্যে অনেক বিষয়ে মিল রয়েছে। তো বিভিন্ন বিষয়ে মিল সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?
মুজিবর রহমান ভূঁঞা: সুন্দর একটি প্রশ্ন করার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনি আপনার প্রশ্নের মধ্যে যে কথাটি বলেছেন তা ঠিক। ইরানের সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক দিকের যে গভীরতা তা অনেক বিস্তৃত। একইভাবে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং ইতিহাসও যথেস্ট ঐতিহ্যময় ও সমৃদ্ধ। আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব যে দুদেশের জনগণের মাঝে যথেষ্ট মিথষ্ক্রিয়া হয়েছে। সাহিত্য, ধর্ম,ইতিহাসসহ নানাভাবে দুদেশের মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া হয়েছে। আর এ বিষয়টি অনেক পুরনো। বলা চলে বহু শতাব্দী ধরে এটি ছিল। স্বল্প সময়ে একটি বিস্তৃত বিষয়ে বিশ্লেষণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে একথাটি আমরা সবাই জানি যে আমাদের ভাষা ও সাহিত্যে প্রচুর ফার্সি শব্দ রয়েছে। দুদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক নৈকট্যের প্রমাণ হিসেবে আমাদের বাংলা ভাষায় বহু ফার্সি শব্দের ব্যবহার আছে। শুধু তাই নয় আমাদের ধর্মীয় আচরণের ক্ষেত্রে ইরানের সাথে যে আমাদের অন্তরঙ্গতা ও যোগাযোগ ছিল তারও যথেস্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। আর ঐতিহাসিকভাবে ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যে গভীর সংযোগ ছিল এবং এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। আর এরফলে দুদেশের জনগণের মাঝে যে শুভেচ্ছার বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে সেটি এখনও অটুট আছে। এ বিষয়টি আরও দীর্ঘ দিন বা অনাগত দিনগুলোতে বজায় থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আজকের এই আধুনিক যুগেও সেই পুরনো ঐতিহ্য থেকে সম্পদ আহরণ করে দেশ দুটি বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে পারস্পরিক কল্যাণের জন্য কাজ করতে পারবে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৮