এপ্রিল ২০, ২০১৯ ১৪:১২ Asia/Dhaka
  • রংধনু আসর: দূর পাহাড়ের কান্না

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, দুনিয়ার সব মানুষই কমবেশি কোনো না কোনো বিপদ-আপদ ও পেরেশানিতে পড়ে। বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করাই মানুষের ধর্ম। একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেই যদি একটি প্রাণ বাঁচে; একজন মানুষ বাঁচার স্বপ্ন দেখে কিংবা একজন মানুষ বিপদমুক্ত হয় তাহলেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়। আর বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে আনন্দও আছে।

কেবল মানুষই নয়; পশু-পাখিসহ সমস্ত প্রাণিজগতের সদস্যরা বিপদ-আপদে পড়ে থাকে। আবার তাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধারও করে অন্যরা। এ সম্পর্কে একটি রূপকথা প্রচলিত আছে পেরুতে। ‘দ্য ফ্রগ অ্যান্ড দ্য কনডর’ অবলম্বনে রচিত গল্পটি অনুবাদ করেছে জাফর সাদেক চৌধুরী। আজকের আসরের শুরুতেই আমরা গল্পটি শোনাব। এরপর থাকবে উভচর প্রাণি ব্যাঙ সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য ও একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।

সে অনেকদিন আগের কথা। এক উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় ছিল একটি ছোট্ট ঝর্ণা। সে ঝর্ণার জলে বাস করত একটি প্রতিবন্ধী ব্যাঙ। ব্যাঙটির মনে ছিল খুব দুঃখ। কারণ তার সামনের বাম পা ছিল ডান পায়ের তুলনায় অনেক বেশি লম্বা। এই লম্বা পায়ের জন্য তাকে সারাজীবন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে লাফাতে হয়েছে, সাঁতার কাটতে হয়েছে। অথচ তার অন্য ভাই-বোনেরা দেখতে এত সুন্দর ছিল যে, পুরো জলাভূমিতেই তাদের সৌন্দর্য নিয়ে অনেক কল্পকথা রচিত হয়েছে। তার মনে প্রচণ্ড আক্ষেপ, সে যদি তার অন্য ভাই-বোনদের মতো দেখতে হতো!

খুঁড়িয়ে চলে বলে সবাই তাকে নিয়ে উপহাস করে। তার বাবা-মাও কখনো তাকে ভালো জামা কাপড় কিনে দিত না, ভালো খাবার দিত না। অন্যদের একটি করে ডিম খেতে দিলে তাকে অর্ধেক ডিম খেতে দিত। অন্য ভাই বোনদের মতো সে পর্বতের চূড়ায় ঘাস ফড়িংদের সঙ্গে খেলতে যেত পারত না, তাকে কেউ খেলায় নিত না। কিন্তু তার মনটা ছিল বেশ উদার। তার দুঃখকে চাপা দিয়ে অন্যের বিপদে সে সবার আগে হাজির হতো।

সেই দুঃখী ব্যাঙটির মতোই একটি দুঃখী ছোট্ট মেয়ে বাস করত সেই ঝর্ণার কাছেই। সে ছোট্ট মেয়েটির নাম ছিল কলিউর। কলিউর নামের অর্থ ‘সকালের তারা’। সে ছিল তারার মতোই সুন্দর এবং ফুটফুটে। কলিউরের বাড়ি ছিল পাহাড়ি উপত্যকার একটি ছোট গ্রামে। তাদের গ্রামটিও ছিল ছবির মতো সুন্দর। তরুলতায় ঘেরা নীল পাহাড়ি গ্রাম পাখিদের কলতানে সারাক্ষণ মুখর থাকত।

কলিউর ছিল এক মেষ পালকের মেয়ে, সে নিজেও মেষ চরাত। একদিন মেষ চরানোর সময় এক প্রকাণ্ড দুষ্ট শকুন তাকে ছোঁ মেরে নখে আটকে তুলে নিয়ে আসে। সেদিন থেকে কলিউরের বন্দি জীবন কাটে শকুনের প্রকাণ্ড বাসায়। শকুনটি ছিল যেমন কুৎসিত তেমনি ছিল অত্যাচারী। কলিউরকে দিয়ে বাসার সব কাজ করাত। তার বিছানা বুনন, কার্পেট বুনন, জামা সেলাই, কাপড় কাচা এবং রান্না-বান্নাসহ সব কাজ। কাজে একটু ভুল হলেই তার ধারালো নখ দিয়ে খুঁচিয়ে কলিউরকে রক্তাক্ত করত। কলিউর ভাবত এ জীবনে তার এ বন্দি দশা থেকে কখনো মুক্তি মিলবে না। তার দীর্ঘশ্বাস ভারি করে তুলত পুরো পাহাড়ের বাতাস।

প্রতিবন্ধী ব্যাঙটি মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখত প্রকাণ্ড শকুনটি বিশাল ডানা মেলে আকাশে উড়ছে আবার ছোঁ মেরে তার শিকার ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ব্যাঙটি জলের ওপর এসে শকুনের বাসার দিকেও নজর রাখত। ব্যাঙটি শুনতে পেত একটি ছোট্ট মেয়ের কান্না ভেসে আসছে শকুনের বাসা থেকে। এই কান্নায় ব্যাঙটি ভীষণ কষ্ট পেত।

একদিন বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য দয়ালু ব্যাঙটি ঘুরতে ঘুরতে চলে আসল শকুনের বাসার কাছে। দেখত পেল দুষ্ট শকুন বন্দি করে রেখেছে একটি ফুটফুটে মেয়েকে। বুঝতে পারল এ মেয়েটির কান্নাই সে সব সময় শুনতে পেত। ব্যাঙটি আড়ি পেতে শকুন আর মেয়েটির কথা শোনার চেষ্টা করল। শুনতে পেল-

- এই, আমার দুপুরের খাবার কই !

-- জ্বি মনিব, এটা প্রস্তুত আছে, আপনি যখন চাইবেন খেতে পারবেন।

- মনিব, আমাকে কিছুক্ষণের জন্য ঝর্ণার ধারে যাওয়ার অনুমতি দিন। আমি আমার কাপড় চোপড়গুলো একটু ধোব।

-- না দুষ্ট মেয়ে, মোটেই না, আমার সঙ্গে চালাকি করো না, তুমি ঠিক পালিয়ে যাওয়ার ফন্দি আঁটছ।

- না মনিব, আমি পালাব না, আমি কাপড় ধুয়েই চলে আসব। আপনি যতক্ষণ আমার কাপড় পেটানোর শব্দ শুনবেন, বুঝবেন আমি কাপড় কাচছি।

-- ঠিক আছে যাও, তোমার কাপড় কাচার শব্দ যদি শুনতে না পাই আমি তক্ষণি তোমাকে ছোঁ মেরে নিয়ে আসব।

তারপর কলিউর তার কাপড় চোপড় একটি গাঁটে বেঁধে ঝর্ণার ধারে গেলে। একটি পাথরের ওপর বসে কলিউর কাপড় আছড়ে ধুতে লাগল ঝর্ণার পানিতে। প্রতিটি আছাড়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কান্নার শব্দ মিশে যাচ্ছিল পাহাড়ের বাতাসে। এমন সময় একটি ছোট আওয়াজ কানে আসল কলিউরের। কলিউর দেখতে পেল একটি কিম্ভুতকিমাকার ব্যাঙ বসে আছে তার পাশেই একটি পাথরের ওপর। ব্যাঙটির একটি পা বিদখুটে রকমের লম্বা। এমন ব্যাঙ কলিউর কখনো আগে দেখেনি।

ব্যাঙটি অত্যন্ত সহানভূতির সঙ্গে কলিউরকে বলল, আমি তোমাকে এখান থেকে পালাতে সাহায্য করব।

কলিউর ঘুরে গিয়ে আবার কাপড় আছড়াতে আছড়াতে বলল, এ পৃথিবীতে আমাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই।

ব্যাঙটি আবার বলল- কিন্তু আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। আমি দেখতে কদাকার হলেও আমি একটি যাদু জানি। আমি ইচ্ছে করলেই যে কারও রূপ ধারণ করতে পারি। আমি তোমার রূপ ধারণ করে তোমার মতো কাপড় আছড়াতে থাকব সেই ফাঁকে তুমি পালিয়ে যাবে। আর এভাবে দুষ্ট শকুনটিকে আমরা বোকা বানাব।

কলিউর বলল, এভাবে কী কাজ হবে? তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ব্যাঙটির দিকে তাকিয়ে দেখল সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। আনন্দে সে ব্যাঙটিকে হাতে তুলে নিয়ে তার কপালে একটি চুমু খেল। মুহূর্তেই ব্যাঙটি অবিকল কলিউরের মতো হয়ে গেল এবং কলিউরের হাত থেকে কাপড় নিয়ে কলিউরের মতো আছড়াতে লাগল।  কলিউরকে বলল আর একটুও দেরি নয়, তুমি তোমার বাড়িতে ফিরে যাও, আমি তোমার কাজ করতে থাকি।

মুহূর্তেই কলিউর ব্যাঙের কথামতো কাজ করল এবং প্রাণপনে ছুটে তার পাহাড়ি গ্রামের দিকে দৌড়াতে থাকল। ব্যাঙটি কাপড় আছড়াতে থাকল। দুষ্ট শকুন বুঝতেই পারল না এখানে কী ঘটছে, সে শুয়ে শুয়ে শুধু কান খাড়া করে রাখল কাপড় আছড়ানোর আওয়াজ বন্ধ হয় নাকি। দীর্ঘক্ষণ পরও যখন আওয়াজ বন্ধ হচ্ছে না, শকুন ভাবল কী হচ্ছে একবার দেখে আসি। মেয়েটি সারাটি দিন এখানেই কাটিয়ে দেবে নাকি!

এটা ভাবতেই শকুন দ্রুত উড়ে গিয়ে ঝর্ণার ধারে গেল, দেখল কলিউর কাপড় আছড়ে যাচ্ছে। শুকুন রাগে গজগজ করতে করতে তারা লম্বা ধারালো ঠোঁট দিয়ে কলিউরের গায়ে আঘাত করতে গেলে। কিন্তু সে আঘাত বাড়ি খেল পাথরের বুকে। মুহূর্তেই ব্যাঙটি ঝর্ণার পানিতে মিলিয়ে গেল।

শকুনটি বেশ কিছুক্ষণ পানির উপর থেকে কলিউরকে খোঁজার চেষ্টা করল কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পেল না। রাগে গজ গজ করতে করতে শকুন ফিরে গেল তার বাসায়। এদিকে ব্যাঙটি তার অন্য ভাইবোনদের কাছে ফিরে আসল।

ব্যাঙটি হঠাৎ দেখল তার লম্বা পা একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সেও তার ভাইবোনদের মতো অনেক সুন্দর হয়ে গেল। এমন সময় তার অন্য ভাইবোনেরা 'কলিউর, কলিউর' বলে চিৎকার করতে লাগল। দয়ালু ব্যাঙটির কপালে যেখানে ছোট্ট মেয়ে কলিউর চুমু খেয়েছিল ঠিক সে জায়গায় একটি তারা সৃষ্টি হল যে তারাটি সকালের তারা কলিউরের মতো জ্বলজ্বল করে পুরো ঝর্ণার পানিকে উজ্জল করে দিল।

                                                                               ব্যাঙ সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য

বন্ধুরা, দয়ালু ব্যাঙ ও ছোট্ট মেয়েটির গল্প শুনলে। অনুষ্ঠানের এবারে আমরা ব্যাঙ সম্পর্কে জানা-অজানা ও মজার কিছু তথ্য শোনাব।

  • ব্যাঙ উভচর শ্রেণীর একটি মেরুদণ্ডী প্রাণী। পানিতে থাকাকালীন ব্যাঙাচি অবস্থায় ফুলকার সাহায্যে এবং পরিণত অবস্থায় ডাঙ্গায় ফুসফুসের মাধ্যমে এরা শ্বাসকার্য চালায়।
  • প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীতে ব্যাঙের বসবাস একমাত্র এন্টারটিকা মহাদেশ ছাড়া সারা বিশ্বে এদের পাওয়া যাপৃথিবীতে প্রায় ৫০০০ প্রজাতির বেশি ব্যাঙ বসবাস করে। বাংলাদেশে রয়েছে ৪৯ প্রজাতির ব্যাঙ
  • বেশিরভাগ ব্যাঙের দাঁত থাকে। কিন্তু উভয় পাশে নয়। শুধুমাত্র উপরের পাটিতে দাঁত থাকে। তবে, তারা এটি সবসময় ব্যবহার করে না শুধুমাত্র শিকারের সময় কাজে লাগায়।
  • ব্যাঙ সাধারণত তাদের জিহ্বা দিয়ে শিকার করে। কিন্তু কিছু প্রজাতি আঙুল দিয়েও তাদের শিকার ধরে।
  • ব্যাঙের ত্বক পাতলা ও রঙিন এরা পানি পান করে না। কারণ এই বিশেষ ত্বকের মাধ্যমে পানি শোষণ করতে পারে। এছাড়াও তাদের এই রঙিন ত্বক শিকারী প্রাণীদেরকে দূরে রাখে।
  • এক সপ্তাহ পর পর ব্যাঙের সম্পূর্ণ চামড়া পরিবর্তন হয়ে নতুন চামড়া ওঠে। তখন এই পুরাতন চামড়া তারা খেয়ে ফেলে!
  • আরেকটি অবাক করা বিষয় হচ্ছে- ব্যাঙ নিজের শরীরের উচ্চতার চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি লাফিয়ে চলতে পারে।
  • জল ও ডাঙা উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাঙের অবাধ বিচরণের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাঙের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে পাশাপাশি রয়েছে অর্থনৈতিক গুরুত্ব।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২০