'ফিলিস্তিন নিয়ে ষড়যন্ত্রের থাবা থেকে মক্কা-মদিনাও বাদ যাবে না'
ফিলিস্তিন নিয়ে শক্রদের যড়যন্ত্র অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী। তাদের ষড়যন্ত্রের থাবা থেকে পবিত্র মক্কা-মদিনাও বাদ যাবে না। ফলে মুসলমানদের মধ্যেকার বিভ্রান্তি দূর করে ঐক্যসৃষ্টি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
রেডিও তেহরানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশ কুদস কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (র) রজমান মাসের শেষ শুক্রবারকে আন্তর্জাতিক কুদস দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। আজকের প্রেক্ষাপটে কুদস দিবস পালনের যৌক্তিক ভিত্তিটা কী? আপনি যদি একটু ব্যাখ্যা করেন।
ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী: বাংলাদেশ আল কুদস কমিটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি বলব, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (র) রজমান মাসের শেষ শুক্রবারকে আন্তর্জাতিক কুদস দিবস হিসেবে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন সেটি তখনও প্রাসঙ্গিক ছিল আজও তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায় নি বরং বেড়েছে। ফিলিস্তিনে-ইসরাইলের দখলদারিত্ব আরও বেড়ে গেছে। ফলে আমি বলব আল কুদস দিবস পালন আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে যেভাবে ইসরাইল তাদের নীল নকশা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে আল কুদস মুক্তির আন্দোলনে আরও বেশি মুসলমানদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
আমাদের মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি আছে, বিভ্রান্তিও আছে। তবে ইমাম খোমেনী (র.)যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে রমজানের শেষ শুক্রবার আল কুদস দিবস পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন আমরা যদি সেদিকে তাকাই তাহলে সেটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হবে। আমরা বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও মাজহাবি বিতর্ক বা দলমতের উর্ধ্বে গিয়ে কুদসের সাথে সবাইকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিশ্ব কুদস দিবসেও আমরা একটা সেমিনারের আয়োজন করেছি।
রেডিও তেহরান: কুদস দিবস পালনের সঙ্গে মুসলিম ঐক্যের একটা সম্পর্ক রয়েছে। তা না হলে পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস ও আল-আকসা উদ্ধার করা কঠিন হবে। তারপরও এই ঐক্যটা ঠিক ততটা কার্যকর হয়ে উঠছে না। মুসলিম বিশ্বে ঐক্য জোরদার করার উপায় কী?
ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী: দেখুন, মুসলিম বিশ্বে ঐক্য জোরদার করার উপায় কী হবে সেটা নিরুপণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অনৈক্যের কারণগুলো খুঁজে বের করা। আমাদের মুসলমানদের মধ্যে নানারকম বিভ্রান্তি রয়েছে। আর সেই বিভ্রান্তির জন্য মুসলিম ঐক্যের বিরোধীতাকারীদের স্পষ্ট ষড়যন্ত্র কাজ করছে। তাছাড়া মুসলিম বিশ্বের কিছু শাসক আছেন যারা হীনস্বার্থের খাতিরে মুসলিম ঐক্যের পক্ষে কাজ না করে বরং বিভক্তিকে উসকে দিচ্ছে, প্রধান্য দিচ্ছে।
ফলে ইসলামি ঐক্যের জন্য ওইসব সরকার প্রধানসহ সবাইকে বোঝাতে হবে। আমরা মুসলমানরা অনৈক্যের মধ্যে থাকলে তাতে আমাদের কারোরই লাভ হবে না। মুসলমানদের বিভক্তির সুযোগ নিয়ে ইসলামের শক্ররা, মুসলমানদের শক্ররা লাভবান হবে। বিভক্তি সৃষ্টি করে প্রতিটি শক্তিশালী মুসলিম দেশকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবে অপশক্তিরা। আর তাদের ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত থাকবে না পবিত্র মক্কা ও মদিনা। মুসলিম উম্মাহর শক্রদের ষড়যন্ত্র অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী। অতএব মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের ভেতরকার বিভ্রান্তি দূর করতে হবে। ফলে নেতৃস্থানীয় মুসলিম দেশগুলোর শাসকদের এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে বর্তমান অবস্থায় বেশিরভাগ নেতৃস্থানীয় মুসলিম দেশের শাসকদের সে ধরনের ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। যদি তারা মুসলিম উম্মাহার ঐক্যের ব্যাপারে ভূমিকা পালন করতেন তাহলে আজ প্রেক্ষাপট বদলে যেত। ফলে আমি আবারও ঐক্যের প্রয়াসের ওপর গুরুত্বারোপ করছি। আর বিশ্ব কুদস দিবস মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য শক্তিশালী করার একটা বড় মাধ্যম বলে আমি মনে করি।
রেডিও তেহরান: এবারের কুদস দিবস যখন পালন করা হচ্ছে ঠিক তার কাছাকাছি সময়ে (২৫ ও ২৬ জুন) ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিরদিনের জন্য পরাধীন করার ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিতর্কিত ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ উন্মোচন করতে যাচ্ছেন। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে এ উপলক্ষে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে মুসলিম রাষ্ট্র বাহরাইনে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী: আমার অবস্থান থেকে আমি সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিরদিনের জন্য পরাধীন করার ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিতর্কিত ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’উন্মোচন করতে যাচ্ছেন সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য নয়। স্পষ্টভাবে বাহরাইনে এ বিষয়ে যা হতে যাচ্ছে সেটি এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত এবং এটি বন্ধ হওয়া উচিত। মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করে যদি এটি করা হয় তাহলে যারা এরসাথে সম্পৃক্ত তারাও যে মার্কিন ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রেখে রক্ষা পাবেন এমনটি মনে করার কারণ নেই। মুসলমানদের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে, বাহরাইন তাদের স্বকীয়তাকে হারিয়ে তারা এ কাজটি করছেন। বিষয়টি অত্যন্ত অমর্যাদাকর ও নিন্দনীয় গর্হিত কাজ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ট্রাপে তারা পড়েছেন। এটি তাদের অত্যন্ত অবিবেচনামূলক কাজ। ভবিষ্যতে তারা ট্রাম্পের হাত থেকেও রক্ষা পাবে না বলে আমি মনে করি।
রেডিও তেহরান: আল-কুদস সমস্ত মুসলমানের প্রাণের স্পন্দন অথচ সেই আল-কুদস দখলকারী ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে অনেক মুসলিম রাষ্ট্র প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। বিষয়টি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী: দেখুন, আমি এ বিষয়ে বলব কুরআন হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী না চললে তাতে আমাদের অমঙ্গল হবে। যেসব মুসলিম রাষ্ট্র ইসরাইলের সাথে প্রকাশ্যে বা গোপনে বন্ধুত্ব করছে বা সম্পর্ক রাখছে তারা যে অত্যন্ত ভুল কাজ করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয় তারা অত্যন্ত গর্হিত কাজ করছেন। তাদের এ কাজ মুসলিম ঐক্যবিরোধী কাজ।
রেডিও তেহরান: আল-কুদস উদ্ধারে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে কতটা শক্তিশালী বলে মনে হয়? এ ক্ষেত্রে ওআইসি এবং আরব লীগের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী: দেখুন, আল-কুদস উদ্ধারে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা যে শক্তিশালী হয় নি সেটা আমরা বার বার লক্ষ্য করছি। দুভার্গ্যজনকভাবে আরব লীগ ও ওয়াইসির যে শক্তিশালী ভূমিকা থাকা উচিত ছিল কুদস ইস্যুতে সেটি কেন নেই তা আমিও বুঝতে পারি না। তাদের অবশ্যই উচিত হবে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়া এবং মুসলিম ঐক্যকে কিভাবে শক্তিশালী করা যায় সে বিষয়ে প্রচেষ্টা চালানো। সেটা না করলে ভুল হবে। এ ব্যাপারে ইরানের ভূমিকা রয়েছে তবে তা আরও বেশি করা উচিত। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রুপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) যে ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন সেই ঐক্যকে আরও এগিয়ে নিতে ইরানের কাছ থেকে আমরা আরও বেশি ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করি। এছাড়া বাংলাদেশ পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশগুলোর ভূমিকা রাখতে হবে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৯