বাংলাদেশের সড়কে আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন ইলিয়াস কাঞ্চন
এবারের মানুষের ঈদযাত্রা মোটামুটি নির্বিঘ্ন ছিল শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর যানজট ছাড়া। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রধান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন।
তিনি বলেছেন,আমাদের পরিবহন সেক্টরে বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সচেতনতা এসেছে।তবে তিনি একথাও বলেছেন যে সেটি সেটি যথেষ্ট নয়। আরও অনেক বেশি সচেতনতা দরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এ বিষয়টি দেখাশোনা করছেন। ফলে আমার মনেহয় এ সেক্টরে আমূল একটা পরিবর্তন আসবে।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ
রেডিও তেহরান: ইতিহাসে এমন স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা হয়নি -এ মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এদিকে, তার বক্তব্যের বিপরীতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক নয়, সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঈদ হবে এবার। কারণ হিসেবে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবন্দির কথা উল্লেখ করেছেন। আপনার পর্যবেক্ষণ....।
ইলিয়াস কাঞ্চন: দেখুন, ঈদের তিনদিন আগ পর্যন্ত সড়ক পথটি বেশ ভালো ছিল। কিন্তু ঈদের ঠিক ২ দিন আগে উত্তরবঙ্গের দিকে যমুনা ব্রিজের ওখান থেকে ৫৫ কিলোমিটারের মতো দীর্ঘ যানজট সৃস্টি হয়েছিল। আর সেই যানজটের কারণ কি সেটাও আমি খোঁজ নিয়েছি। একইসাথে বঙ্গবন্ধু সেতুর টোলপ্লাজার কিছু সমস্যা আছে আগেও ছিল। কেন এই সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে না তাও আমি ঠিক জানি না। টোলে সংকটটা হচ্ছে গাড়ির ডিজিটালি টোল আদায়ের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে সিস্টেম ফেল করে। তখন তারা গাড়ি চলতে দেয় না। আর গাড়ি বন্ধ রাখা হলে যানজটের সৃষ্টি হয়। এটি একটি কারণ।
এছাড়া এবার ঈদে ঘরমুখো মানুষের দীর্ঘ ৫৫ কিলোমিটারের যানজটের অন্য একটি কারণ হচ্ছে সেখানে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এই দুটো কারণে মূলত দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। এরবাইরে চ্ট্রগ্রামের দিকের রাস্তায় নতুন ব্রিজ চালু হয়েছে এবং সেখানে আধুনিক পদ্ধতির টোল ব্যবস্থাপনা রয়েছে। যেজন্য ওই দিকটায় তেমন কোনো যানজট সৃষ্টি হয় নি। ওই রুটের যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দে যথাসময়ে ঘরে ফিরতে পেরেছেন।
বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর এই দীর্ঘ যানজটের বিষয়টি মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী চিন্তাও করতে পারেন নি। এছাড়া বলা চলে ঈদ যাত্রার মানুষের দুর্ঘটনাও কম ছিল এবং মোটামুটি যথাসময়ে ঘরে পৌঁছতে পেরেছিল।
আর সেতুমন্ত্রীর বক্তব্য এবং রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য রাজনৈতিক। এটি আওয়ামী লীগ বিএনপির বিষয়। এ ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। কারণ আমি সামাজিক আন্দোলন করি বিশেষ করে নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করি। সড়কে দুর্ঘটনায় যাতে মানুষের মৃত্যু না হয় সেটি আমার আন্দোলনের মূল বিষয়। ফলে রিজভী সাহেবের বক্তব্য তার রাজনৈতিক জায়গা থেকে দিয়েছেন। আমি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না।
রেডিও তেহরান: জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন আপনার কি মনে হয় সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে স্টেক হোল্ডার যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে পরিবর্তন বা সচেতনতা বেড়েছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: দেখুন, আমাদের পরিবহন সেক্টরে বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সচেতনতা এসেছে। তবে সেটি যথেষ্ট নয়। আরও অনেক বেশি সচেতনতা দরকার। সবাই এখনও সেভাবে বিষয়টি উপলব্ধিতে আনেন নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এ বিষয়টি দেখাশোনা করছেন। ফলে আমার মনেহয় এ সেক্টরে আমূল একটা পরিবর্তন আসবে। প্রতিবছরই ঈদ যাত্রায় মানুষের ঘরে ফেরা এবং কর্মস্থলে ফিরে আসার ব্যাপারে সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটা মিটিং হয়। সেই মিটিংয়ে বেশ কিছু পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। সেই পরামর্শের আলোকে এবারের মানুষের ঈদযাত্রা মোটামুটি নির্বিঘ্ন ছিল শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর যানজট ছাড়া।
আর বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দীর্ঘ যানজটের ফলে এটাও দেখা গেছে যে যাত্রীরা বাস থেকে নেমে টায়ার পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে, তারা মিছিলও করেছে। আরেকটা বিষয় খুবই চোখে পড়ার মতো। সেটি হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তারা উল্টো দিক দিয়ে তাদের গাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর এর প্রতিবাদে একজন ডিসি সাহেবের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। আমি বলব যে যারা আইন তৈরি করেন এবং বাস্তবায়ন করাবেন তারাই যদি সরকারের মধ্যে থেকে বারবার আইন অমান্য করেন, অশ্রদ্ধা করেন সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বারবার নির্দেশনা দেয়ার ফলেও তারা আইন মানছেন না। তখন জনগণ আইন তাদের নিজেদের হাতে তুলে নেয়ার চেষ্টা করছেন। আর এটি কিন্তু ওইসব সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি বার্তা। যদি সরকারি কর্মকর্তারা আইন এভাবে অমান্য করতে থাকেন তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটবে বলে আমি মনে করি। তাছাড়া এ ধরনের ঘটনায় তাদের লাঞ্ছিত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। কারণ হচ্ছে তারা আইনের মানুষ হয়ে, সরকারি কর্মকর্তা হয়ে উল্টোপথে যাবেন আর জনগণ ভোগান্তিতে পড়ে থাকবে। ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় জ্যামের মধ্যে আটকে থাকবে এটাতো কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বরং সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের চাকর। তারা জনগণের সুযোগ সুবিধা দেখবেন। সেটা না করে তারা যদি নিজেদের সুযোগ সুবিধা ও সুখের বিষয়টি দেখেন তাহলে তার প্রতিবাদ যেমন হয়েছে এমনটি আরও হবে।
রেডিও তেহরান: জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অবশ্য একথাও বলেছেন, সড়কে শৃঙ্খলা নেই। আর সড়কে শৃঙ্খলা না থাকার কারণে প্রতি বছর ঈদে ঘরমুখো লোকজনকে দুর্ভোগে পড়তে হয়। এই শৃঙ্খলা কীভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
ইলিয়াস কাঞ্চন: দেখুন, এই শৃঙ্খলা তো ফিরিযে আনার দায়িত্ব সরকারের। যারা সরকারে থাকবেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে তাদের দায়িত্ব সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা । আর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে তারা কিভাবে আনবেন সেটি তারাই ভাববেন। আর আমরা এ ব্যাপারে কিছু পরামর্শ দিতে পারি। সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেব অসুস্থ হওয়ার আগে শাজাহান খান সাহেবের নেতৃত্বে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করে দিয়েছিলেন। আর সেই কমিটির মাধ্যমে ১১১ টি সুপারিশমালা তৈরি হয়েছে। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ১৭ টি পরামর্শ রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেসব সুপারিশ রয়েছে সেগুলো হচ্ছে- যারা গাড়ি চালাচ্ছেন বাংলাদেশে সেইসব চালক গাড়ি চালাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু সড়কে চলার নিয়ম কানুন তারা যথাযথভাবে মানছেন না। আর মানবেন কিভাবে তারা এসব বিষয়ে অজ্ঞ। আর এসব ব্যাপারে যাতে চালকদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া যায় সে ব্যবস্থা করা। তাছাড়া নতুন যারা চালক হবেন তাদেরকেও যাতে করে ইনস্টিটিউশানের মাধ্যমে গাড়ি চালানো ও নিয়ম কানুন শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
এছাড়া বাংলাদেশে ১৬ লক্ষ গাড়ি চালকের ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণ কিভাবে করা যাবে- সেসব বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একইসাথে যেসব পথচারি সড়কে চলাচল করেন তারাও সড়কের নিয়ম কানুন মেনে চলেন না। পথচারিদের যাতে সচেতন করা যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ আছে এই ১১১ টির মধ্যে। মোটা দাগে-চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, পথচারিদের সচেতন করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থা, সড়কের ক্রুটি এবং গাড়ির ক্রুটি বিচ্যুতি থাকলে তার সমাধান করা।
রেডিও তেহরান: অনেকেই অভিযোগ করেন, আমাদের দেশের পরিবহন সেক্টরে এক ধরনের নৈরাজ্য বিরাজ করে এবং এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা আশানুরূপ নয়। আপনার কী তাই মনে হয়? পুলিশ আরো কীভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
ইলিয়াস কাঞ্চন: দেখুন, আইনশৃঙ্খলা রাক্ষাবাহিনী বা পুলিশের ভূমিকা যে আশানুরূপ নয় বললেন সেই বিষয়টির সাথে কিন্তু চাঁদাবাজির ব্যাপারটি চলে আসে। পুলিশের ব্যাপারে কিন্তু ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটো ভূমিকাই আছে। পুলিশ অনেক ভালো কাজও কিন্তু করছে। যেমন ধরুন এরইমধ্যে আমরা দেখেছি পথচারি যারা সড়কের আইন না মেনে যেদিক সেদিক দিয়ে পারাপার হচ্ছেন তাদেরকে আটক করে সড়কের পাশে থাকা কেন্দ্রে নিয়ে মোটিভেশন করে তারপর ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। একইভাবে চালক যারা সিগন্যাল অমান্য করছে তাদেরকে গাড়িসহ আটকে সারাদিন প্রশিক্ষণ দিয়ে তারপর ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। আমি বলব এটি খুবই ইতিবাচক বিষয়।
অন্যদিক যে চাঁদাবাজির যে বিষয়টি আছে সেজন্য শুধু পুলিশকে দোষারোপ করব তা কিন্তু নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরে দুর্নীতির বিষয়টি অনেক বেড়ে গেছে। আর সেক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের মধ্যেও দুর্নীতি বাড়াটা স্বাভাবিক। ফলে সড়কে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির বদনাম অবশ্যই আছে।এটিকে আমি শুধু বদনাম বলব না, আসলে বাস্তব চিত্র এমনই। আর সড়কে এই চাঁদাবাজির বিষয়টি যদি শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না। চাঁদাবাজির সঙ্গে পুলিশ, শ্রমিক, মালিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনগুলোও জড়িত। এই সবকিছু মিলিয়ে সড়কের মধ্যে একটা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। তারপরও আমি বিশ্বাস করি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তরের মুখ্য সচিব নিজে এ দায়িত্বটি নিয়েছেন। উনি বলেছেন অর্থ কোনো বিষয় নয় তবে কাজটি হতে হবে আন্তরিকতাপূর্ণ। অর্থের যেন কোনো অপচয় না হয় সেদিকটি লক্ষ্য রাখতে হবে। এ বিষয়টি আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়ছে। আমাদের মালিক সমিতির যিনি প্রধান তিনি আমাকে বললেন-চালকদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেয়ায় অনেক ভালো কিছু হবে। কারণ চালকদের কারণে আমরা মালিকরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। একেকটা গাড়ির দাম কোটি টাকার চেয়ে বেশি। একটি গাড়ি যখন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তখন ক্ষতি তো আমাদেরই হয়। সেক্ষেত্রে চালকরা যদি দক্ষ হয় তাহলে আমরাও লাভবান হব।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৫