জুন ২৩, ২০১৯ ১৬:৩৬ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে খারাপ দিকই বেশি। অর্থনীতির বড় সংকটের জায়গা ব্যাংকিং খাত নিয়ে তেমন কোনো নির্দেশনা নেই। কৃষকদের ভর্তুকি সম্পর্কেও তেমন কোনো নির্দেশনা নেই। দেশে ধনীরা আরও ধনী এবং গরীরবা আরও গরীব হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে রেডিও তেহরানকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান।

তিনি আরও বলেন, এবারের প্রস্তাবিত বাজেট সবচেয়ে খারাপ বাজেট হয়েছে।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য বিশাল বাজেট প্রস্তাব করেছেন। আপনার মতে কেমন হলো এবারের বাজেট?  

এম হাফিজউদ্দিন খান: দেখুন, এবারের বাজেটে ভালো দিক খুবই কম। বাজেটে খারাপ দিকের সংখ্যাই বেশি। মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের মানুষের অনেক কষ্ট হবে। আর এবারের বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সেসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে যথেস্ট সন্দেহ রয়েছে। প্রতিবছরই বড় বাজেট করা হয়। পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে কাটছাট করতে হয়। গতবারের বাজেটের চেয়ে এবারের বাজেট আরও বড় আকারে করা হয়েছে। রেভিনিউয়ের লক্ষ্যমাত্রাসহ বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারবে বলে মনে হয় না। আমাদের অর্থনীতিবিদরা তেমনটাই মন্তব্য করেছে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক

এছাড়া দেশের অর্থনীতির একটা বড় সংকটের জায়গা এখন ব্যাংকিং খাত। এ খাত সম্পর্কে তেমন কিছুই বলা হয় নি। সবারই মন্তব্য এ জন্য দেশের অনেক বড় ক্ষতি হচ্ছে। অথচ এই খাতটির সংকট উত্তরণে কি উদ্যোগ নেয়া হবে সেরকম কোনো আশার কথাও বলা হয় নি এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে।

কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না

কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পাচ্ছে না। সে  ব্যাপারেও বিশেষ কোনো দিক নির্দেশনা ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নেই। কৃষক যাতে তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় সে বিষয়টির নির্দেশনা থাকা উচিত ছিল। ধানের বাম্পার ফলন হবে সে ব্যাপারে পূর্বাভাস তো ছিলই। তারপরও চালের আমদানি এবং কৃষক তাদের উৎপাদিত ধানের দাম না পাওয়াটা দুঃখজনক। কৃষকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে ব্যাপারে কোনো কথা নেই বাজেটে। তাদের ভর্তুকির ব্যাপারেও কোনো নির্দেশনা নেই বাজেটে।

আরেকটি বড় সংকট হচ্ছে- দেশে ধনীরা আরও বেশি ধনী হচ্ছে আর গরীবরা আরও গরীব হচ্ছে। এই যে ধনী-গরীবের বৈষম্যটা আরও বাড়ছে সে বিষয়েও কোনো দিক নির্দেশনা নেই।

রেডিও তেহরান:  বাজেট জনগণের জন্য তবে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। কেউ কেউ বলেন গরিব মারার বাজেট। আপনার মতে- এ বাজেট থেকে কতটা সুবিধা পাবে জনগণ?

এম হাফিজউদ্দিন খান: দেখুন, ২০১৯-২০ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আমি গরিবদের জন্য বা প্রান্তিক জনগণের জন্য তেমন কোনো সুবিধা দেখছি না। দেখুন, আমি এব্যাপারে একটু উদাহরণ দিতে চাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি যখন চাকুরি থেকে অবসরে যাই তখন বেতন অনেক কম ছিল। অন্যদিকে এখন যারা চাকুরি থেকে অবসরে যাবেন তারা অনেক টাকা পেনশন পাবেন। তাদের জন্য তেমন কোনো সমস্যা না হলেও আমাদের জন্য অনেক সমস্যা সৃস্টি হয়েছে। চাকুরি থেকে অবসরের পর অনেক পরিশ্রম করে এবং নানাভাবে কনসাল্টেন্সি করে বলা চলে অতিকষ্টে আমাদের জীবন নির্বাহ করতে হচ্ছে। তা থেকে কিছু টাকা সঞ্চয় করে বাড়ির ঋণ শোধ করেছি এবং সঞ্চয়পত্র কিনেছি। অথচ সেই সঞ্চয় পত্র থেকে ট্যাক্স বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। আবার ভিন্নভাবও আমরা দেখেছি। যেমন ধরুন গত নির্বাচনের সময় দেখেছি এমপি প্রার্থীরা যখন তাদের সম্পদের হিসাব ঘোষণা করেছে তাতে ব্যাপকসংখ্যক সঞ্চয়পত্র কেনার চিত্র আছে। অথচ সে ব্যাপারে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। সরকার ঘুরে ফিরে বলছে সঞ্চয়পত্রের সুদ কমাতে এবং ট্যাক্স বাড়াতে হবে। যদি সেটা করা হয় তাহলে আমাদের মতো মানুষরা কিভাবে চলবে? এসব বিষয় নিয়ে আমরা রীতিমত শঙ্কিত। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার ব্যাপারে বাজেটে দিক নির্দেশনা নেই। ফলে আশার আলো আমি দেখছি না।

রেডিও তেহরান: দেশের অন্যতম প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি বলেছে, এ বাজেট সুবিধাভোগীদের বাজেট। কতটা যৌক্তিক এই বক্তব্য? 

সিপিডির প্রতিক্রিয়া

এম হাফিজউদ্দিন খান: গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি যে বলেছে এ বাজেট সুবিধাভোগীদের। তাদের এ বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে যৌক্তিক বলে আমি মনে করি। তারা যেহেতু গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান। ফলে গবেষণার ভিত্তিতে তারা এ বক্তব্য দিয়েছে। আর তাই তাদের এবক্তব্যকে যৌক্তিক বলে মনে করছি। তাদের এ বক্তব্য সমর্থনযোগ্য। অবশ্যই বর্তমান বাজেট সুবিধাভোগীদের জন্য। দেশের সবকিছু এখন বিত্তবানদের হাতে। বাংলাদেশের প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, নীতিমালা প্রণয়ন থেকে শুরু করে সবকিছু বিত্তবান বড় বড় মানুষের কাছে। প্রান্তিক মানুষের হাতে কোনো কিছুই নেই। আমাদের জাতীয় সংসদের বেশিরভাগ এমপি ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী এ দেশের সবচেয়ে বড় ১০ জন ধনীর মধ্যে তিনি একজন। 

রেডিও তেহরান: এবারের বাজেটে বেশিরভাগ জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অনেকে বলছেন এটা নজিরবিহীন। আপনার কী মনে হয়? কেন এমনটা করা হয়েছে?

রাজস্ব ভবন

এম হাফিজউদ্দিন খান: দেখুন, আমাদের সরকারের একটা মানসিকতা হচ্ছে বড় বাজেট করতে হবে। আর বড় বাজেট বাস্তবায়নের জন্য ট্যাক্স বেশি করে ধরার বিষয়টি চলে আসে। আর সে লক্ষ্যেই বাজেটে নির্দেশনা আছে। তবে আমরা দেশের মানুষ তো ট্যাক্স দেই। আর যারা ট্যাক্স দেন না তাদের বেশির ভাগই বড় লোক। সমাজের বিত্তশালীদের কাছ থেকে কত টাকা ট্যাক্স আসে এরকম পরিসখ্যান নেয়া হলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। বিত্তশালীদের কাছে কত টাকা ট্যাক্স নেয়া হয় এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কত নেয়া হয় তার পরিসংখ্যন তুলে ধরলে কিন্তু বিষয়টি বোঝা যাবে। তখন ট্যাক্সের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হবে। অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী আছেন যারা ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছেন অথচ ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছেন তারা। এটি পুরনো সমস্যা। সেই সমস্যা বর্তমানেও বিদ্যমান বরং আরও বেড়ে যাচ্ছে।  

রেডিও তেহরান: এবারের বাজেট বিশাল তবে ঘাটতি বাজেট। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে সরকার?

এম হাফিজউদ্দিন খান: বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানামুখী সমস্যা হতে পারে। বাজেটের ঘাটিতি পূরণের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা থাকবে। ব্যাংক থেকে মোটা অংকের টাকা ঋণ নিতে হবে। বিরাট অংকের টাকা ঘাটতি। বিষয়টি সমাধান সহজ নয় কোনোভাবেই। আমার কাছে ঘাটতি বাজেট পূরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমার কাছে মনে হয়।

রেডিও তেহরান: জনাব হাফিজউদ্দিন খান, বরাবরের মতো এবারের বাজেটেও স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতের বরাদ্দ কম। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত

হাফিজউদ্দিন খান: জ্বি আপনি ঠিকই বলেছেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে না। এসব ক্ষেত্র মোটামুটিভাবে বলা চলে অবহেলিত। সামাজিক ক্ষেত্রে বিধবা-বয়স্কভাতা বা এ ধরনের কিছু বাড়ানো হয়েছে।  আমাদের স্বাস্থ্য বীমা নেই। এ খাতে আমাদের নিজেদেরকে খরচ করতে হয়। আমার নিজের কথাই বলি-প্রতিমাসে আমার স্ত্রীসহ পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যখাতে ২৫/৩০ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। স্বাস্থ্যখাতের সহযোগিতার বিষয়টি এত বেশি অপ্রতূল যে কোনোভাবেই সেটি প্রান্তিক মানুষের জন্য সুখকর নয়।

রেডিও তেহরান: জনাব হাফিজউদ্দিন খান, যেকথাগুলো এবারের বাজেট নিয়ে বলা হচ্ছে যে, গরীবের বাজেট নয়-সুবিধাভোগী বড় লোকদের বাজেট। তো সামগ্রিক বিবেচনায় আপনি কি একথার সাথে একমত?

হাফিজউদ্দিন খান: আমি একথার সাথে পুরোপুরি একমত। আমার মনে হয় গত কয়েকটি বাজেটের মধ্যে এবারের প্রস্তাবিত বাজেট সবচেয়ে খারাপ বাজেট হয়েছে। এই বাজেটে সামাজিক যেসব চ্যালেঞ্জ ছিল সেদিকে বিন্দুমাত্র নজর দেয়া হয় নি। সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষ কোনো সুখবর ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নেই।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৩