জুলাই ২৩, ২০১৯ ১৩:২৩ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, মনকে সুস্থ রাখার জন্য প্রয়োজন আনন্দময় জীবন। আর আনন্দময় জীবনের জন্য প্রয়োজন হাস্য রসিকতা। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সুখ বা আনন্দ শব্দটি প্রায় ২৫ বার এসেছে। যারা মানুষের জন্য আনন্দ ও সুখের ব্যবস্থা করেন, পবিত্র কুরআনে তাদের প্রশংসার পাশাপাশি পরকালে তারা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাবেন বলেও ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

রাসূলেখোদা (সা.) এ সম্পর্কে বলেছেন, "যে কেউ একজন মুমিনকে আনন্দ দিল, সে যেন আমাকে আনন্দ দিল, আর যে আমাকে খুশি করল, সে অবশ্যই আল্লাহকেও খুশি করল।"

বিশ্বনবীর পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম রেজা (আ.) বলেছেন, আনন্দ ও চিত্ত বিনোদন মানুষকে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে সহায়তা করে এবং এর মাধ্যমে দুনিয়ার বা পার্থিব বিষয়ে অনেক সাফল্য পাওয়া যায়।

আজকাল মনোবিজ্ঞানীরাও মানুষের সুস্থতার জন্য আনন্দ ও চিত্ত বিনোদনকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও আনন্দ ও চিত্ত বিনোদনকে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অনেক মনোবিজ্ঞানী বলছেন, চিত্তবিনোদন, হাসি-খুশি ও প্রফুল্লতা বিভিন্ন ধরনের রোগ প্রতিরোধ করে এবং শরীরে নানা ধরনের ক্যান্সারের দ্রুত ছড়িয়ে পড়াকেও ঠেকিয়ে রাখে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হাসি ও প্রফুল্লতা এমন এক অনৈচ্ছিক প্রতিক্রিয়া যার ফলে মুখের ১৫টি মাংসপেশি একই সময়ে সংকুচিত হয় এবং দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস ঘটে। এ ছাড়াও হাসি ও প্রফুল্লতার সময় শরীরের রক্ত-প্রবাহ দ্রুত সঞ্চালিত হওয়ায় রক্তে এড্রেনালিন বেড়ে যায়। ফলে মানুষ আরো সজীবতা ও আনন্দ অনুভব করে। মানুষের জীবনে যদি আনন্দ ও প্রফুল্লতা না থাকত তাহলে মানুষ মানসিক চাপের তীব্রতায় প্রাণ ত্যাগ করত।

একইভাবে পরিবার ও সমাজের উন্নতির জন্যেও দুঃখ ও হতাশা দূর করা এবং আনন্দ ও চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করা জরুরি। আনন্দিত বা দুঃখিত হওয়া কেবল একজন মানুষের নিজের সাথে সম্পর্কিত বিষয় নয়। কারণ, একজন মানুষের হাসি-খুশী মুখ এবং দুঃখ-ভারাক্রান্ত চেহারা অন্যদেরও প্রভাবিত করে।

বন্ধুরা, হাসি-খুশী থাকা এবং হাস্যরসের গুরুত্ব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা শুনলে। আজকের আসরে আমরা এ সম্পর্কেই একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। অনুষ্ঠানে থাকবে রাসূলের জীবন থেকে নেয়া দু'টি মজার ঘটনা ও কয়েকটি হাসির কৌতুক। আর অনুষ্ঠান শেষে থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।

পবিত্র ইসলাম ধর্ম মানুষের শারীরিক ও মানসিক চাহিদার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ ইসলাম মনে করে, একটি সফল জীবনের জন্য প্রশান্তি ও প্রফুল্লতা থাকা জরুরী। বিশ্বনবীর আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম রেজা (আ.) বলেছেন, তোমার প্রাত্যহিক তৎপরতার সময়কে চার ভাগে ভাগ করে নাও। এই চার ভাগের এক ভাগ সময়ে আল্লাহর এবাদত করবে। এক ভাগ ব্যয় করবে আয়-উপার্জনের জন্য, অন্য এক ভাগ সময়ে নিজের বিশ্বস্ত ভাইদের সাথে ও এমন লোকদের সাথে যোগাযোগ রাখবে যারা তোমাকে তোমার দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত করবে। এ ছাড়াও অন্য এক ভাগ সময় চিত্তবিনোদন ও আনন্দের জন্য বরাদ্দ রাখবে। আর আনন্দ ও চিত্ত বিনোদনের মাধ্যমে অর্জিত মানসিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অন্য সময়ের দায়িত্ব এবং কাজগুলো সম্পন্ন করবে।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই আনন্দ বা চিত্তবিনোদনের মাধ্যম সম্পর্কে জানতে চাচ্ছো। তোমাদের অবগতির জন্য বলছি- খেলাধুলা, কবিতা আবৃত্তি, বিয়ের উৎসব, উপহার দেয়া, উজ্জ্বল রংয়ের জামা কাপড় পরা, সুগন্ধি ব্যবহার, সুন্দর সাজে সজ্জিত হওয়া, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা এসব আনন্দের কিছু মাধ্যম। এছাড়া, শরীর-চর্চা ও খেলাধুলাও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম।

আনন্দের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো রসিকতা। রসিকতা যে খারাপ জিনিস তা কিন্তু নয়, কেননা টেনশন, হতাশা, বিষাদগ্রস্ততা দূর করার জন্যে হাসি-রসিকতা একটি ভালো উপাদান। মানসিক প্রফুল্লতার জন্যেও হাস্যরসের যথেষ্ট উপযোগিতা রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো রসিকতার সীমা মেনে চলা। সীমালঙ্ঘন হয়ে গেলে অনেকের মনেই আঘাত লাগতে পারে। তাই সীমারেখাটি আগে জানতে হবে এবং পরে তা মানতে হবে। কোনোভাবেই অপরকে উত্যক্ত করা বা খোঁচা দেয়ার জন্যে কৌতুক করা যাবে না।

 এ প্রসঙ্গে ইমাম সাদেক (আ.) এর একটি বর্ণনার উদ্ধৃতি দেয়া যায়। তিনি একবার ইউনূস শিবাণীকে জিজ্ঞোসা করেছিলেন, ‘লোকজনের সাথে কী পরিমাণ কৌতুক মজা করো? ওই লোক জবাবে বলেছিল, খুব কম। ইমাম সাদেক (আ.) তখন তিরস্কারের সুরে বলেছিলেন, কেন লোকজনের সাথে হাসি-মজা কর না? হাসি-কৌতুক সুন্দর আচার-ব্যবহার আর সচ্চরিত্রের অংশ।'

ইসলামের দৃষ্টিতে মুমিনদের একটি দায়িত্ব হলো দ্বীনী ভাইদেরকে আনন্দ দেয়া। হযরত আলী (আ.) বলেছেন- রাসূল (সা) যখনই তাঁর কোনো সহচরকে বিষন্ন বা মনমরা অবস্থায় দেখতেন, তখনই কৌতুক মজা করে তাকে প্রফুল্ল করে তুলতেন এবং বলতেন, নামাযের পর সবচেয়ে উত্তম আমল হলো মুমিনদের অন্তরকে প্রফুল্ল করা। অবশ্য এমনভাবে হতে হবে যেন তাতে গুনাহ'র লেশমাত্র না থাকে।

হাস্য রসিকতা বা কৌতুক পরস্পরকে ঘনিষ্ট করে তোলে। এ কারণে পরিপূর্ণ জীবন বিধান ইসলামে কৌতুককে বিশেষ করে মুমিনদের জন্যে জরুরি একটি বিষয় বলে মনে করা হয়।

ইমাম হাসান (আ.) কে ইমাম আলী (আ.) এক উপদেশ বাণীতে বলেছেন, হে সন্তান আমার! সে-ই ঈমানদার যে তার দিনরাতের সময়গুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করে নেয়। একটি অংশকে কাজে লাগায় আধ্যাত্মিকতার চর্চা এবং আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করার মধ্য দিয়ে। অপর একটি অংশকে কাজে লাগায় পার্থিব জগতের প্রয়োজনীয়তা ও জীবন জীবিকার চাহিদা মেটাতে। আর তৃতীয় অংশটিকে নির্দিষ্ট করে বৈধ এবং হালাল বিনোদন উপভোগ করার জন্যে।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, রাসূলে খোদা (সা.) এবং আমিরুল মুমেনিন আলী (আ.) এর খেজুর খাওয়া নিয়ে চমৎকার একটি কৌতুক আছে। একদা নবীজি (সা.) কয়েকজন সাহাবিসহ খেজুর খাচ্ছিলেন। প্রত্যেকে খেজুরের বিচি যার যার সামনে রাখছিলেন। নবীজি (সা.) তাঁর খেজুরের বিচি হজরত আলী (আ.)-এর সামনে অর্থাৎ তাঁর খেজুরের বিচির সঙ্গে রাখতে লাগলেন।

খেজুর খাওয়া শেষ হলে দেখা গেল, সবার সামনে প্রায় সমপরিমাণ খেজুরের বিচি; কিন্তু হজরত আলী (রা.)-এর সামনে দ্বিগুণ খেজুরের বিচি এবং নবীজি (সা.)-এর সামনে কোনো বিচিই নেই। এবার নবীজি (সা.) বললেন, আলী! তুমি তো দ্বিগুণ খেজুর খেয়েছ। হজরত আলী (রা.) বললেন, আমি হয়তো খেজুর বেশি খেয়েছি; কিন্তু খেজুরের বিচি খাইনি; আপনি তো খেজুরের বিচিসহই খেয়ে ফেলেছেন।  

অপর এক বর্ণনায় এসেছে, একবার আব্দুল মোত্তালেবের মেয়ে রাসূলে খোদার বৃদ্ধা ফুফু সফিইয়্যাহ্ নবীজীর কাছে এলেন। রাসূলকে তিনি বললেন- ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার জন্যে একটু দোয়া করো যেন বেহেশ্‌তবাসী হতে পারি।‘ নবীজী একথা শুনে হাসতে হাসতে মজা করে বললেন- ‘বৃদ্ধ মহিলারা বেহেশতে যাবে না।' সফিইয়্যাহ্ ভীষণ বিষন্ন হয়ে পড়লেন এবং ফিরে গেলেন। নবীজী তখন মুচকি হেসে বললেন- সফিইয়্যাকে বলো- বৃদ্ধ মহিলারা আগে তরুণী হবে, তারপর বেহেশতে যাবে।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই মাঝেমধ্যে গান শোনো। আনন্দ-বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো গান। প্রিয় নবীজি (সা.) প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা শরিফ থেকে হিজরত করে যখন মদিনায় গেলেন, তখন মদিনার ছোট্ট ছেলেমেয়েরা গান গেয়ে প্রিয় নবীজিকে স্বাগত জানায়। তারই দুটি চরণ হলো

‘তলাআল বাদরু আলাইনা মিন ছানিয়াতিল ওয়াদা,

ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা মা দাআ লিল্লাহি দা।’

কয়েকটি কৌতুক

১.

প্রথম কৌতুকটি শিক্ষক ও ছাত্রের কথোপকথন নিয়ে। শিক্ষক বললেন-

শিক্ষক: নিউটন একটি বাগানে আপেল গাছের নিচে বসেছিলেন। হঠাৎ একটি আপেল তার মাথার ওপর পড়ায় তিনি মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কার করেন। এ থেকে তুমি কী শিখলে?

ছাত্র: এর শিক্ষাটি খুব পরিষ্কার স্যার। নিউটন যদি আমাদের মত ক্লাসে বসে থাকতেন তাহলে তিনি কিছুই আবিষ্কার করতে পারতেন না।

২.

এক ব্যক্তি প্রথমবার হেলিকপ্টারে উঠতে গিয়ে দেখল উপরে পাখা ঘুরছে। এতবড় পাখা ঘুরতে দেখে সে পাইলটকে প্রশ্ন করলেন: আপনার কি গরম লাগছে?

পাইলট জবাব দিল,  নাতো, কেন এ প্রশ্ন করলেন?

যাত্রী বলল:  তাহলে আমাদের মাথার ওপর এই ফ্যানটা বন্ধ করে দিন! (হাসির শব্দ)

৩.

এক ছাত্র কিছুতেই ভূগোল পড়া শিখতে চাইত না। শিক্ষক তার কাছে জানতে চাইলেন-: তুমি কেন ভূগোল বইয়ের পড়া শিখছো না?

ছাত্র বলল: আমার বাবা বলেছেন, বিশ্ব-জগত প্রতি দিনই বদলে যাচ্ছে। তাই আমি চাচ্ছি বিশ্বটা স্থির না হওয়া পর্যন্ত ভূগোল বই পড়ব না!

৪.

বন্ধুরা, বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের কথা তো তোমরা সবাই জানো। তিনি ছিলেন খুব ভুলোমনা, কোনো কিছুই মনে রাখতে পারতেন না। তো একবার তিনি তার এক বন্ধুকে তার বাসায় খাবার দাওয়াত দিলেন। অথচ দাওয়াতের দিন এডিসন নিজেই বন্ধুকে দাওয়াত দেয়ার কথা ভুলে গেলেন। নির্ধারিত দিনে বন্ধু এসে হাজির। এসে দেখেন বাড়িতে কেউ নেই। বন্ধুটি তাই তার বিজ্ঞানী বন্ধুটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। কিন্তু সময় গড়িয়ে যায়, বন্ধু আসে না। অবশেষে খিদে লাগায় বন্ধুটি খিদে সইতে না পেরে টেবিলে রাখা খাবারের প্লেট নিজেই সাবাড় করে দিল।

কিছুক্ষণ পরে এডিসন আসলেন। এসে বন্ধুকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন “আরে দোস্ত, তুই এই অসময়ে আমার বাসায়! দাঁড়া দেখি তোর জন্য কোনো খাবার আছে কিনা।”  

এই বলে তিনি টেবিলে রাখা খাবারের প্লেটটির ঢাকনা তুলে দেখলেন যে, প্লেটটি খালি। এর পর আফসোস করে বন্ধুকে বলতে লাগলেন, “সরি দোস্ত, তোর জন্য দেখছি কিছুই নেই। যাওয়ার সময় যে আমি খাবারগুলো খেয়ে গেছিলাম তাও ভুলে গেছি।”

বন্ধুরা, মজার কিছু কৌতুক শুনলে। আশা করি ভালো লেগেছে। তো দেখতে দেখতে আমাদের সব আয়োজন এক এক করে শেষ হয়ে গেল। এতক্ষণ ধৈর্য ধরে অনুষ্ঠান শোনার জন্য তোমাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।