'গণপিটুনি বন্ধে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি কঠোর বার্তা দিতে হবে'
বাংলাদেশের সিনিয়র সাংবাদিক ও গাজী টিভির এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বললেন, গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার জন্য উসকানি আছে। তাছাড়া সমাজে একধরনের অসহিষ্ণুতা এবং সুশাসনেরও একটা সংকটের জায়গাও আছে। তবে হুজুগ ও উসকানি বেড়েছে। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা নিয়ে রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন।
গণপিটুনিতে মানুষ হত্যারোধে তিনি মানুষকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একইসাথে আইনভঙ্গ না করতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ
- আইনের প্রতি একধরনের অশ্রদ্ধার কারণে গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটছে
- সুশাসনের একটা বড় সংকটের জায়গা তৈরি হয়েছে
- আমার কাছে মনে হয় সমাজে তো নানা ধরনের অসহিষ্ণুতা আছে।
- হুজুগ অনেক বেড়ে গেছে। আছে উসকানি।
- পদ্মা সেতু নিয়ে যাতে করে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয় সেই চেষ্টা করা হচ্ছে উসকানির মাধ্যমে
- কেউ বুঝে উসকানি দিচ্ছে আবার কেউ না বুঝে অন্ধত্বের জায়গা থেকে উসকানি দিচ্ছে
- ছেলেধরার বিষয়টি সবই মিথ্যা ও গুজব। অবৈজ্ঞানিক ও কাল্পনিক চিন্তাভাবনা।
- গণপিটুনির সংকট দূর করতে রাষ্ট্রকে আরও কঠোর বার্তা দিতে হবে এবং মানুষকে সচেতন করতে হবে।
- সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে লেগে থাকতে হবে এবং মানুষকে বোঝাতে হবে যে ছেলেধরা বলে কোনোকিছু নেই
রেডিও তেহরান:‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ —-এমন একটি গুজবকে কেন্দ্র বাংলাদেশে এই মুহূর্তে এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে-বিষয়টি আপনি জানেন। এরইমধ্যে কয়েকজনকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন, এটা খুবই দুঃখজনক। আধুনিক যুগে একটি আধুনিক এসে ছেলেধরার মতো একটি গুজবে আমরা বিশ্বাস করি এবং পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলি! খুবই দুঃখজনক।
পদ্মা সেতুতে চীনা কোম্পানির যারা কাজ করছে তারা বলেছে যে 'উই নিড মোর হেডস'। অর্থাৎ তাদের আরও লোক লাগবে। আর সেই হেডসের একটা ভ্রান্ত অনুবাদ ছড়িয়ে পড়েছে যে তারা মাথা চায়। একটা শ্রেণি বা চক্র ভুল ব্যাখ্যা করেছে আর মানুষও ভুল বুঝেছে।
গণপিটুনি দিয়ে মানুষ মেরে ফেলার বিষয়টি সভ্য সমাজে কোনোভাবেই চিন্তা করা যায় না। তবে এটার সাথে আরেকটি বিষয় রয়েছে। সেটি হচ্ছে আইনের প্রতি একধরনের অশ্রদ্ধা। মানুষ মনে করছে এধরনের কাজ করে ফেলা যায় এতে কোনো কিছু হবে না। কিংবা কেউ যদি অপরাধী হয়েও থাকে তাকে পুলিশের কাছে দিয়ে কোনো লাভ নেই। আর এ দুটো বিষয়ই কিন্তু খুব ভয়ংকর। আর এই জায়গাটাতেই আমার কাছে মনে হচ্ছে সুশাসনের একটা বড় সংকটের জায়গা তৈরি হয়েছে। আমরা হয়তো অনেক ধরনের উন্নয়ন করছি, আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটছে কিন্তু আমাদের এখানে বাস্তবতাটা হচ্ছে মানুষকে আমরা আধুনিক মনস্ক করতে পারি নি। এটা সত্যিই খুবই দুঃখজনক। তাছাড়া এর পেছেন একধরনের উসকানিও আছে সামাজিক মাধ্যমে। বিশেষ করে ইউটিউব এবং ফেসবুক ব্যবহার করে একধরনের উসকানি দেয়া হচ্ছে। কখনও কখনও এর বাইরে থেকেও উসকানি দেয়া হচ্ছে।
রেডিও তেহরান: জনাব ইশতিয়াক রেজা, আপনি যেকথাটি বললেন যে আইনের প্রতি, বিচারের প্রতি মানুষের একধরনের অশ্রদ্ধার কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। নিরাপত্তাবাহিনীর প্রতি একধরনের অনীহা বলা চলে সুশাসনের জন্য একটা বড় সংকটের জায়গা এটি। তো এ প্রসঙ্গেই জানতে চাইব-এই যে বাংলাদেশে মাঝেমধ্যেই এমন গুজব ওঠে। আসলে এমন গুজবের উৎসমূলে কী আছে বলে মনে করেন?
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন, গুজবের উৎস হচ্ছে উসকানি। কেউ বুঝে আবার কেউ না বুঝে উসকানি দিচ্ছে। বুঝে যারা উসকানি দিচ্ছে তারা অত্যন্ত টার্গেট করে পদ্মা সেতু নিয়ে যাতে করে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয় সেই চেষ্টা করছে। অন্যদিকে কেউ না বুঝে বিশ্বাসের জায়গা থেকে বা অন্ধত্বের জায়গা থেকে এমনটি করছে।
রেডিও তেহরান: জনাব রেজা, এই যে গুজবে কান দেয়া এবং গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা.....বিষয়টির সঙ্গে কী বাংলাদেশের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বা পরিবেশগত কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন?
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন, মনস্তাত্ত্বিক বা পরিবেশগত সম্পর্ক এই গণপিটুনির সাথে আছে কি না সে বিষয়টি বলার আগে আমি যেকথাটি বলছিলাম আইনের প্রতি অশ্রদ্ধার কারণেও এমনটি হচ্ছে। একথাটি আমি একারণে বললাম যে, মানুষ যদি সত্যি সত্যি ধরেও নেয় যে ছেলেধরা আছে সেক্ষেত্রে মানুষ তাকে ধরে তো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করবে। সেটা না করে যখন পিটিয়ে মেরে ফেলছে। এটা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া এবং আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা।
আর আপনি মনস্তত্ত্বের যে কথাটি বলছিলেন সে সম্পর্কে বলব, মনস্তত্ত্বের মধ্যে এরকম একটি জায়গা আছে যে-আমরা ছোটোবেলাতেও দেখেছি-চোর, পকেটমার বা ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। যেন এটি কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু আসলে তো এটি একটি মারাত্মক অপরাধ। আর এ বিষয়টি আমরা ছোটোবেলা থেকে দেখে এসেছি। মানুষের মনস্তত্ত্বে এই জিনিষটি ঢুকে গেছে। মানুষ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে- আর কোথাও পকেটমারকে মারা হচ্ছে সে নিজেও জড়িত হয়ে যাচ্ছে পকেটমারকে মারার জন্য। অথচ তার এখানে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মানুষের মনের ভেতরকার এই বিশ্বাসটা খুবই মারাত্মক। এটা থেকে বের হতে গেলে বড় ধরনের সামাজিক সচেতনতা দরকার।
রেডিও তেহরান: গণপিটুনির মতো বর্বরতা কী সমাজের কোনো মারাত্মক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে? আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে একেক সময় এক একটি ঘটনার হিড়িক পড়ে যায়। কখনও ইভটিজিং, কখনও এসিড নিক্ষেপ। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ও নারী ধর্ষণ এবং সর্বশেষ ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার ঘটনা..এবিষযে আপনি কি বলবেন?
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন, এই গণপিটুনির মতো বর্বরতা আগেও ছিল। সুতরাং এটা নতুন কিছু নয় যে মূল্যবোধের পতন ঘটেছে। কারণ আমি একটু আগেও বলছিলাম যে আমাদের ছোটবেলায় পাকিস্তান আমলেও দেখেছি বাংলাদেশ হওয়ার পরও দেখেছি এবং এখনও দেখছি। ভারত এত আধুনিক হয়েছে সেখানেও গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটে। এমনকি ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণপিটুনি বিরোধী আইন হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে আমেরিকাতেও এ বিষয়টি আছে বলেই এরকম একটা আইন হয়েছে। ফলে গণপিটুনি নতুন করে কিছু নয় এ বিশ্ব সমাজে এটি ছিল, হিংসা ও হিংস্রতা ছিল, বাংলাদেশেও ছিল। সুতরাং হঠাৎ করে মূল্যবোধের পতনের কারণে এমনটি হচ্ছে তা কিন্তু নয়।
আমি বলব, আমাদের মানুষ আইনভঙ্গ করছে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে কঠোর বার্তা দিতে হবে এবং মানুষকে সচেতন করতে হবে।
আপনি ঠিকই বলেছেন- একেক সময় একেকটি বিষয়ের হিড়িক পড়ে য়ায়- যেমন একসময় ইভটিজিংয়ের বিষয়টি দেখা গেছে। যখন রেপ হওয়া শুরু হলো তখন কেবলই রেপ হচ্ছে চারদিকে। হঠাৎ করে যেন শিশুদের ওপর নির্যাতন বেড়ে গেল।
আমার কাছে মনে হয় সমাজে তো নানা ধরনের অসহিষ্ণুতা আছে। এরবাইরে সামাজিক মাধ্যমের কারণে অনেক বেশি ঘটনা জানা যাচ্ছে। দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ছে গোটা সমাজে। আগে মানুষের কাছে একটি ঘটনা পৌঁছতে অনেক সময় লেগে যেত। এখন মানুষ খুব দ্রুত যেকোনো ঘটনা জেনে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে। এমনও হচ্ছে কোনো একটি মানুষ কোনো একটি ঘটনা দেখে সে তার নিজের এলাকাতেও এটি কল্পনা করে নিচ্ছে। হুজুগে বাঙালি বলে কথাটা আছে সেই কথাটাই এখন দেখতে পাচ্ছি। হুজুগ অনেক বেড়ে গেছে।
রেডিও তেহরান: সবশেষে জনাব সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সবশেষে আপনার কাছে জানতে চাইব, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এই উন্মাদনা বন্ধে করণীয় কী? অবশ্য এরইমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: দেখুন, সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা অত্যন্ত ভালো এবং জরুরি উদ্যোগ। তবে এটি আরও আগে নেয়া উচিত ছিল। প্রথমেই যখন দু একটি ঘটনা ঘটেছিল তখনই খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত ছিল। আমার মনে হয় অপেক্ষাটা একটু বেশি হয়ে গেছে। সরকার ভেবেছিল যে তাড়াতাড়ি থেমে যাবে। তবে সরকারের বা আইনশৃঙ্খলবাহিনীর উদ্যোগ আরও আগে নেয়া উচিত ছিল। তবে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
রেডিও তেহরান: আপনার আর বিশেষ কোনো পরামর্শ আছে কি না?
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: এরবাইরে সচেতনতা জরুরি। বর্তমানে গণমাধ্যম সচেতন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরকার নানারকম সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে এবং মানুষ বুঝতে পারছে। তারপরও আমার মনে হয় নানারকম সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে লেগে থাকতে হবে এবং মানুষকে বোঝাতে হবে যে ছেলেধরা বলে কোনোকিছু নেই। বাংলাদেশে যুগযুগ ধরে যে মানুষকে পিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ছেলেধরা সন্দেহে আসলে কোথাও ছেলেধরা পাওয়া যায় নি। এসব সবই মিথ্যা ও গুজব। এগুলো অবৈজ্ঞানিক ও কাল্পনিক চিন্তাভাবনা।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৮