রংধনু আসর : কলস নিয়ে দুটি গল্প
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আজকের আসরের শুরুতেই আমরা আফগানিস্তানে প্রচলিত একটি গল্প শোনাব। এরপর থাকবে একটি কবিতা। কবিতার পর একটি শিক্ষণীয় গল্প। আর সবশেষে থাকবে একটি গান। তো প্রথমেই আফগানিস্তানের রূপকথাটি শোনা যাক।
অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক ছিল কৃষক। খুবই সৎ আর আল্লাহভীরু লোক ছিল সে। কিন্তু কিছুতেই সে তার সংসারের অবস্থার উন্নতি করতে পারছিল না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতো। প্রতিটা পয়সা হিসাব করে খরচ করতো। কিন্তু তবুও দেখা যেত, একটা পয়সাও সে জমাতে পারছে না। সারাজীবন পরিশ্রম করেও তার মনে হলো আগে যেমন ছিল তার অবস্থা, এখনো তেমন আছে। কোনই উন্নতি হয়নি।
একদিন ফজরের নামাজ পড়ার সময় কৃষকটি সিজদায় পড়ে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করতে লাগলো, 'দয়াময় করুণাময়, তুমিই পার আমার অবস্থা বদলাতে। তুমি আমাদের ধন-দৌলত দাও। তুমি ছাড়া এই দুনিয়ার কারো কাছে চাইলেও আমি কিছু পাব না। আমার রান্না ঘরের চুলার ওপর তুমি আমাকে ধন-দৌলত দাও।'
এই মুনাজাত করে সামান্য কিছু নাস্তা খেয়ে প্রতিদিনের মতো সেদিনও সে কাজ করতে মাঠে চলে গেল। এক মনে কাজ করছে সে। হঠাৎ একটা কাঁটা গাছে তার কাপড় জড়িয়ে কাপড়টা ছিঁড়ে গেল। রাগে-দুঃখে তার কান্না আসতে লাগলে। এমনিই সে গরিব মানুষ। তার ওপর জামাটি ছিঁড়ে যাওয়ায় কষ্ট হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। সে কোদাল চালিয়ে কাঁটা গাছটি শেকড় সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে লাগলে। হঠাৎ কোনো কিছুর সাথে তার কোদাল লেগে ঝন ঝন শব্দ ভেসে উঠলে। চাষি দেখলে একটা তামার কলস। তার ঢাকনা খুলে সে অবাক হয়ে গেল। রূপার টাকায় কলস পুরো ভরা। খুশিতে তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করল।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর তার মনে পড়ল সে টাকা চেয়েছিল রান্না ঘরের চুলার ওপর। কিন্তু তা পাওয়া গেল মাঠের জমির নিচে। সে বলল, আমি এই টাকা নেব না। আল্লাহ যদি আমাকে টাকা দিতেই চান, তবে চুলার ওপরই দিতে হবে।
এরপর সে বাড়ি চলে গেল। কলসভর্তি টাকা সেখানেই পড়ে রইলে। বাড়িতে গিয়ে সে তার স্ত্রীকে সব কথা খুলে বললে। সে তো এসব কথা শুনে রেগে আগুন। বলে কি? এমন বোকাও আছে আল্লাহর দুনিয়ায়! কিন্তু সেই একই কথা।
কৃষক রাতে যখন ঘুমিয়ে পড়ল, তখন তার স্ত্রী তার এক প্রতিবেশীকে সব কথা জানিয়ে বলল, ‘আমার স্বামী তো দুনিয়ার সবচেয়ে বোকা মানুষ। এক কাজ কর, তুমি গিয়ে টাকাগুলো নিয়ে এসো। তোমার অর্ধেক, আমার অর্ধেক।’
প্রতিবেশী তো মহাখুশি। সে তক্ষুণি কোদাল আর শাবল নিয়ে সেখানে চলে গেল। কলসটি খুঁজে পেতে কোন সমস্যা হলো না। তবে কলসে সত্যি সত্যি রূপার টাকা আছে কি না, জানতে সে ঢাকনাটা খুলল। কিন্তু চমকে উঠল, ভয়ে তার রক্ত জমে যেতে লাগল। কলসটা যে কালো কালো বিষাক্ত সাপে ভরা! ফোস ফোস করছে। আরেকটু হলে তাকে কামড় দিয়েই ফেলত। সে বুদ্ধি করে কলসটার মুখ বন্ধ করল। তারপর ভাবতে লাগল, মহিলাটি তো তাকে মেরে ফেলছিল। সে তো আমার শত্রু। নইলে এভাবে লোভ দেখিয়ে কাউকে সাপে ভর্তি কলসের দিকে পাঠায়! আরেকটু হলেই তো আমি মারা পড়তাম। এর প্রতিশোধ আমি নেবই।
এসব কিছু ভেবে সে সাপে ভর্তি কলসটাকে নিয়ে চুপি চুপি সেই কৃষকের বাড়ি গেল। তারপর আরো চুপি চুপি কারো টের পাওয়ার আগেই সে সাপভর্তি কলসটি চুলার ওপর ঢেলে দিল। ভাবল, মহিলাটা তো সকালে চুলার কাছে আসবেই রান্না করতে। তখন কোন না কোন সাপ তাকে কামড়াবেই।
সকালে সেই কৃষক যথারীতি ফজরের নামাজ পড়বে বলে ওজু করার জন্য রান্না ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে সে দেখলো চুলার ওপর কি যেন চকচক করছে। কাছে গিয়ে দেখলো, একি! এ যে সব রূপার টাকা! সে তক্ষুণি সিজদায় পড়ে গেল। বলল, 'সবই আল্লাহ তোমার দয়া! তোমার কাছে হাজার শোকর। তোমার কাছে চুলার ওপর টাকা চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে তাই দিয়েছো!'
একটি শিক্ষণীয় গল্প
এক গ্রামে ছিল এক লোক। প্রতিদিন সে দূরের এক কুয়ো থেকে বাড়িতে পানি নিয়ে আসত। কাঠের ভারের দু’মাথায় দুটো বড় কলস ঝোলানো। ভারটা বয়ে আনত কাঁধে। দুটো কলসের একটি খুবই পুরোনো। ছোট ছোট কিছু ফুটোও তৈরি হয়েছে।
লোকটার বাড়ি ফেরার সময় অর্ধেক পানি পথেই পড়ে যেত। নতুন কলসে কোনো ফুটো ছিল না। সব পানি পৌঁছত বাড়িতে। এ নিয়ে সব সময় গর্ব করত নতুন কলস। আর পুরোনো কলসটার মন লজ্জায় কুঁকড়ে থাকত। যদিও জানত এতে তার কোনো দোষ নেই। দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে এ ফুটোগুলো তৈরি হয়েছে। তবু সে একদিন খুবই লজ্জিত হল। তাই লোকটা যখন পানি আনার জন্য তৈরি হল তখন সে কথা বলে উঠল- ‘আমাকে ক্ষমা করবেন। অনেক বছর আমি ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। মাত্র অর্ধেক পানি বাড়িতে আনতে পারেন। ফুটো দিয়ে বাকি অর্ধেক পানি পথেই পড়ে যায়।’
লোকটা হেসে বলল, ‘আজ যখন বাড়ি ফিরব তখন ভালো করে পথটা খেয়াল করো।’
বাড়ি ফেরার সময় লোকটার কথামতো কাজ করল পুরোনো কলস। দেখতে পেল তার দিকের পথে অনেক ফুল আর লতাপাতার গাছ জন্মেছে। এসময় লোকটা বলল: ‘দেখো, পথের তোমার দিকটার প্রকৃতি কত সুন্দর! তোমার ফুটোর কথা আমি জানতাম। আর সেটাই কাজে লাগিয়েছি। পথে ফুলের গাছ লাগিয়েছি। আরও লাগিয়েছি শাকসবজির গাছ। তোমার ফুটো দিয়ে পড়া পানিতেই এগুলো বেড়ে উঠেছে। আমি অনেক ফুল তুলেছি। ঘর সাজিয়েছি সেই ফুলে। লেটুস, বাঁধাকপি, গাজর আরও কত শাকসবজি খেয়েছি আমরা। তুমি অমন না হলে আমি কি ফুল আর এসব সবজির চাষ করতে পারতাম?’
বন্ধুরা, এ গল্প থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারলাম যে, সবকিছু একসময় পুরোনো হয়ে যায় কিন্তু নতুন এক অন্য দক্ষতা অর্জন করি। এই নতুন দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আমরা ভালো ফলও পেয়ে যাই।

ভারী স্কুল ব্যাগ বহনে সমস্যা
বন্ধুরা, তোমাদেরকে নিশ্চয়ই কাঁধে ভারী ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যেতে হয়। এতে করে পিঠে ব্যথা হয় কিংবা সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারার মতো সমস্যা সৃষ্টি হয়।
শুধু তাই নয়, এরচেয়ে মারাত্মক ঘটনার উদাহরণও আমাদের মাঝে আছে। ভারতের দিল্লির এক স্কুলের ছাত্র বরুণ জৈন ২০১২ সালের ২৫ জানুয়ারি বইভর্তি ব্যাগের ভার সইতে না পেরে স্কুলের সিঁড়ি থেকে পড়ে যায় এবং পুরো ভারতবর্ষকে কাঁদিয়ে মারাও যায়।
মর্মান্তিক এ ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছিল- জীবনই যদি না বাঁচল, তবে তা আবার কেমন ধারার পড়ালেখা? এরপর দিল্লিতে শুরু হয় স্বাক্ষর সংগ্রহ। তার পরিপ্রেক্ষিতে কোন ক্লাসের শিশুরা সর্বোচ্চ কত ওজনের ব্যাগ বইতে পারবে, সে ব্যাপারে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় নীতিমালায় নির্দেশনাও দেয়া হয়। দিল্লি হাইকোর্ট প্রাক্-স্কুলপর্যায়ে ব্যাগের ওজন শিশুর ওজনের ১০ শতাংশের কম করার নির্দেশ জারি করেন।
কিন্তু এ নির্দেশের বাস্তবায়ন পুরোপুরি দেখা যায় না। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশের শিশুরা এখনও বেশি ওজনের স্কুলব্যাগ বহন করে থাকে। কিন্তু শিশুরা এমনটি চায় না। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে এ সম্পর্কেই রয়েছে একটি গান। গানটির কথা ও সুর মাসুদ রানা। আর গেয়েছে ঢাকার সারেগামা একাডেমির শিশুশিল্পী তাইফা। গানটিসহ পুরো অনুষ্ঠানটি শোনার জন্য অডিও ফাইলে ক্লিক করতে হবে।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২২
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন