নভেম্বর ১২, ২০১৯ ১৮:৩৬ Asia/Dhaka
  • রংধনু আসর :  শিয়ালের প্রতারণা

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আজকের আসরের শুরুতেই রয়েছে শিয়ালের প্রতারণা সম্পর্কে একটি গল্প। এরপর শিয়াল সম্পর্কে জানা-অজানা কিছু তথ্য। আর সবশেষে থাকবে বাংলাদেশের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।  

এক শকুন আর এক শিয়ালের মাঝে বন্ধুত্ব হয়েছিল। একদিন শিয়াল বন্ধু শকুনকে বলল: ‘দোস্ত! তুমি তো সবসময় আকাশেই উড়ে বেড়াও। শুভ্র মেঘ ছাড়া তো আর তেমন কিছুই দেখার সুযোগ তোমার হয় না। এক কাজ করো! তুমি একদিন আমার পিঠে চড়ে বস, তোমাকে আমি পুরো বন জঙ্গল দেখাবো। এখন তো বসন্তকাল। বনের গাছ গাছালি সবুজে শ্যামলে মাখামাখি। আর ফুলে ফুলে চারদিক একেবারে সুশোভিত। তোমার ভালো লাগবে, চলো’।

শকুন চিন্তা-ভাবনা করে দেখল-একেবারে মন্দ হয় না, শিয়ালের প্রস্তাবটা শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করল এবং শিয়ালের পিঠে চড়ে বসল। মনে তার বনাঞ্চল দেখে বেড়াবার সাধ।

শিয়াল তো এমনিতেই ভীষণ চতুর। শকুন তার পিঠে চড়ে বসার সাথে সাথে সে তার চালাকি শুরু করে দিলো। কাঁটাময় ঝোপ জঙ্গল, গাছ গাছালি যেদিকে বেশি সেদিক দিয়ে সে ভীষণ গতিতে দৌড়াতে লাগল। ডালপালা আর কাঁটার আঘাতে শকুন বেচারার পাখার পালকগুলো একের পর এক ঝরে পড়তে লাগলো। শিয়াল যেদিক দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল পুরো রাস্তাজুড়ে শকুনের সাদা-কালো আর খয়েরি ঝরা পালক ভর্তি। শকুনের পালক ঝরতে দেখেও শিয়াল তার দৌড় থামালো না। সে দৌড়াতেই লাগল।

এদিকে শকুনের পাখার সকল পালক ঝরে পড়ার পর এবার বুকের পালক ঝরতে লাগল। একটা সময় দেখা গেল শকুনের সারা গায়ে একটি পালকও অবশিষ্ট নেই। শিয়াল এবার শকুনের দিয়ে তাকিয়ে তার পালকহীন শরীর দেখে মনে মনে হাসল। শিয়াল শকুনের সাথে ঠাট্টা মশকরা করতে লাগল। পালকহীন শকুন না পারে উড়তে আর না পারে শিকার করতে।

 সে কারণে বন্ধু শিয়ালের ওপর শকুন অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। শিয়াল যা শিকার করতো তা খেয়ে দেয়ে উচ্ছিষ্টটুকু শকুনকে খেতে দিত। কখনো কখনো শিয়াল শকুনের কথা ভুলেই যেত। ফলে শকুন দিনের পর দিন না খেয়ে খেয়ে খিদের জ্বালায় চড়ুইয়ের বাসায় হানা দিয়ে বাচ্চাকাচ্চা খেতে বাধ্য হতো। এভাবে দীর্ঘদিন কেটে গেল।

ধীরে ধীরে শকুনের পাখায়, বুকে নতুন পালক গজাল। একেবারে আগের মতোই সকল পালক সে ফিরে পেল। ফিরে পেল আকাশ উড়বার এবং শিকার করার আগেকার অবস্থা। এখন সে বরং আগের চেয়েও শক্তিশালী। আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবার পর একদিন শকুন তার বন্ধু শিয়ালকে বলল: দোস্ত! আমার তো যাবার সময় হলো। আচ্ছা তুমি কখনো কি ভেবেছ শূন্য আকাশের বিশাল উচ্চতা থেকে নীচের এই জমিন দেখতে কেমন লাগে?

শিয়াল বলল: না তো!

শকুন বলল: অনেক সুন্দর, অনেক! এই জঙ্গলের ভেতর থেকে অনেক অনেক বেশি সুন্দর লাগে। তুমি যদি দেখতে চাও আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারি। যাবে কিনা একবার ভেবে দেখো’।

শিয়াল মনে মেন ভাবল সুযোগটা হাতছাড়া করা ঠিক না। সে রাজি হয়ে গেল আর শকুন তার পায়ের নখে শিয়ালকে আটকিয়ে দিল উড়াল। উপরে উড়ে যেতে যেতে শকুন শিয়ালকে জিজ্ঞেস করতে লাগল: দোস্ত যমিনটাকে এখন কেমন দেখতে পাচ্ছো?

শিয়াল বলল: অনেক বড় দোস্ত।

শকুন আবারো উপরের দিকে যেতে লাগল। কিছুটা উপরে উঠে আবার জিজ্ঞেস করল: এখান থেকে কেমন দেখতে পাচ্ছো?

শিয়াল বলল: পুরো পৃথিবীটাকে একটা শহরের মতো মনে হচ্ছে।

শকুন আরো উপরে গিয়ে তৃতীয়বারের মতো জিজ্ঞেস করল: এখন কেমন দোস্ত!?

শিয়াল বলল: এখন তো পৃথিবীটাকে একটা তরমুজের মতো লাগছে।

শকুন বলল: ‘ঠিক আছে হে বীর। এবার তাহলে নীচে চলে যাও’

এই বলে শকুন তার পায়ের নখ থেকে শিয়ালকে ছেড়ে দিল। এতো উপর থেকে ভীষণ গতিতে পড়তে পড়তে বাতাসের তোড়ে শিয়ালের গায়ের পশমগুলোও ঝরে গেল। কিন্তু শিয়াল একটা কাজ করল। পড়তে পড়তে আল্লাহর কাছে সে ক্ষমা চেয়ে দোয়া করল: ‘হে খোদা! আমাকে তুমি একটা নরম শরীর কিংবা চামড়ার তৈরি আলখাল্লার ওপর ফেলো’।

আল্লাহর দরবারে তার দোয়া কবুল হয়ে গেল। এক কৃষক নাস্তা খেতে বসেছিল। তার আলখাল্লাটি পাশেই খুলে রেখেছিল। সামনে ছিল নানারকম নাশতা। কৃষকের নজর উপরে পড়তেই দেখল কী যেন একটা ঠিক তার ওপর পড়তে যাচ্ছে। সে সরে গেল আর অমনি শিয়াল এসে পড়লো আলখাল্লার ওপর। বেঁচে গেল শিয়াল। সেইসাথে চমৎকার নাশতাও পেল তৈরি। পেট ভরে খেয়ে আলখাল্লা পরে সে রওনা দিল বনের ভেতর।

পথেই দেখা হলো সিংহের সাথে। সিংহ জিজ্ঞেস করল: আলখাল্লা পেলি কাথায়?

শিয়াল বলল: কেন, জানো না আমি সেলাই করি?

সিংহ আশ্চর্য হয়ে বলল: তাহলে আমার জন্যেও একটা সেলাই কর তোরটার মতোই।

শিয়াল বলল: পাঁচটা হৃষ্টপুষ্ট হরিণ লাগবে। এক সপ্তা সময় লাগবে।

সিংহ পাঁচটা হরিণ এনে দিল। শিয়াল তার পরিবার পরিজনকে নিয়ে সেগুলো মজা করে খেলো। সপ্তাশেষে সিংহের সাথে দেখা হলে শিয়াল বলল: আস্তিন আর বেল্টের জন্যে ছোট্ট দুটি ভেড়ার বাচ্চাও লাগবে। সিংহ তাও দিল আর শিয়াল পরিবার আগের মতোই মজা করে সেগুলো খেলো কিন্তু সিংহকে আলখাল্লা বানিয়ে দিতে পারল না।

সিংহ বলল: শোন শিয়াল, আমার ধৈর্যের সীমা কিন্তু ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

সিংহের মেজাজ গরম দেখে শিয়াল বলল: ওস্তাদ! আলখাল্লা রেডি আছে ঘরে, চলুন।  

ঘর মানে গর্তের কাছে গিয়ে শিয়াল পালাতে চাইল কিন্তু লেজ ধরে ফেলল সিংহ। বেচারা শিয়ালের লেজ ছিঁড়ে গেল। সিংহ বলল: তোকে আমি ঠিকই চিনে নেব লেজবিহীন শয়তান...।

শিয়াল পরদিন তার গর্ত থেকে বেরিয়ে দেখল তার বন্ধুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে তাদেরকে আঙুর বাগানে নিয়ে গেল। গাছের উপরে উঠে শিয়ালেরা যখন আঙুর খাচ্ছিল লেজকাটা শিয়াল তখন তার বন্ধুদের একজনের লেজ আরেকজনের লেজের সাথে বেঁধে দিল। এরপর বাগানের মালিককে খবর দিল। বাগানের মালিক তাড়াহুড়া করে লাঠি হাতে আসতেই শিয়ালেরা ভয়ে হুড়োহুড়ি করে পালাতে গিয়ে সবাই তাদের লেজ হারাল। এই ঘটনার খানিক পরেই সিংহ এসে হাজির।

সিংহ বলল: শেষ পর্যন্ত তুই আমার হাত থেকে আর রেহাই পেলি না লেজকাটা শয়তান।

 শিয়াল মুচকি হেসে জোরে চিৎকার দিল। অমনি তার লেজহারানো শিয়াল বন্ধুরা এসে হাজির হলো। সব শিয়ালেরই লেজ কাটা- অবস্থা দেখে সিংহ ভাবল: শিয়াল ভয়ংকর প্রতারণা করেছে। তার সরলতার সুযোগে শিয়াল কদিন তার পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থার জন্যে নিশ্চিন্তমনে কাটিয়েছে। সিংহ শেষ পর্যন্ত শিয়ালকে লক্ষ্য করে বলল:

 ‘হে বজ্জাত! তোর মতো প্রতারক আর কেউ নেই’।

এরপর থেকে সিংহ সতর্ক হয়ে গেল যেন শিয়ালের মতো কারো কাছে আর প্রতারিত হতে না হয়।

শিয়াল

শিয়াল সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য

খ) বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে রয়েছে শিয়াল সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য। শিয়াল ক্যানিডি গোত্রের ক্যানিস গণের তিনটি সর্বভূক প্রজাতির প্রাণীর সাধারণ নাম। দক্ষিণ এশিয়া, ইউরেশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় এদের দেখতে পাওয়া যায়। এদেরকে ফেউ এবং গিধড়ও বলা হয়ে থাকে।

শিয়াল বাংলাদেশে শেয়াল, পাতিশিয়াল বা শৃগাল নামেও পরিচিত। চতুরতা বা বুদ্ধিমত্তার জন্য এদের ‘শিয়াল পণ্ডিত’ও বলা হয়। আবার কেউ কেউ ‘শেয়াল মামা’ বলেও ডাকে। সন্ধ্যারাতে শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক শোনেনি, এমন লোক বোধহয় গ্রামবাংলায় একজনও পাওয়া যাবে না।

পৃথিবীতে তিন প্রজাতির শিয়াল আছে। কালো-পিঠ ও পাশ-ডোরা  প্রজাতি দুটোর বাস আফ্রিকার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোতে। আর সোনালি বা এশীয় প্রজাতিটির  বিস্তৃতি পূর্ব ইউরোপ, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত। আমাদের দেশের 'শিয়াল পণ্ডিত' এই এশীয় প্রজাতিভুক্ত।  

শিয়াল দেখতে নেকড়ের মতো হলেও আকারে কুকুরের চেয়ে কিছুটা ছোট; অনেকটা দেশি নেড়ি কুকুরের সমান। এদের মুখ লম্বাটে। লেজ ফোলা এবং সব সময় নিচের দিকে নামানো থাকে। গায়ের রং গাঢ় বাদামি, দেহের ওপরের অংশ কালচে আর নিচের অংশ হালকা বাদামি, যা অনেকটা সাদাটে দেখায়। মুখমণ্ডলের নিচ থেকে গলা পর্যন্ত অংশটি সাদাটে। গলায় একটা সাদা মালার মতো আছে। লেজ বাদে প্রাপ্তবয়স্ক একটি শিয়াল ৬০-৭৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়; লেজের দৈর্ঘ্য হয় ২০-২৮ সেন্টিমিটার। দাঁড়ানো অবস্থায় ঘাড় বরাবর উচ্চতা হয় ৩৫-৪০ সেন্টিমিটার। ওজনে এরা ৭-১১ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।

শিয়াল মূলত মাংশাসী হলেও এরা সর্বভুক প্রাণী। ইঁদুর, পাখি, হাঁস-মুরগি, গুইসাপ, সাপ, কাঁকড়া, মাছ ইত্যাদি খেয়ে থাকে। শকুন, চিল বা অন্যান্য শিকারি প্রাণীর শিকারের উচ্ছিষ্টাংশ, মরা-পচা প্রাণী, ডাস্টবিনের ময়লা খাবার, এমনকি কবর খুঁড়ে মরা লাশও খেয়ে থাকে। এ ছাড়া ভুট্টা, আখ, তরমুজ, আম-কাঁঠাল, খেজুরের রস—এসবও খায়। শিয়াল বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে কুকুর-ছাগল-ভেড়ার বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায়। এরা কুকুরকে বেশ ভয় পায়।

চালাক-চতুর হলেও শিয়াল কিছুটা ভীতু স্বভাবের। এদের ঘ্রাণশক্তি প্রবল। লেজের নিচের দিকের গ্রন্থির দুর্গন্ধ দিয়ে শত্রুদের তাড়ায়। এরা দ্রুতগতির প্রাণী; কুকুরের চেয়েও দ্রুত দৌড়ায়।

শিয়াল মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বাস করে। বছরে দুবার বাচ্চা দেয়। স্ত্রী শিয়াল ৫৭-৭০ দিন গর্ভধারণের পর চার থেকে ছয়টি বাচ্চা দেয়। প্রায় ১২ দিনে বাচ্চার চোখ ফোটে। চোখ ফোটার পর বাচ্চারা গর্তের বাইরে এসে যখন খেলা করে, দেখতে বেশ লাগে। এরা সাধারণত ১০-১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মধ্যে মানুষের গৃহপালিত পশু হিসেবে কুকুরের পাশাপাশি শিয়ালও ছিল বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। ওই সময় পোষা প্রাণীদের খাবার আর মালিকদের খাবার একই ছিল। আইবেরিয়ান উপদ্বীপের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্যান রোটেকা ও মিনফেরির বিভিন্ন অংশের সমাধিক্ষেত্রে পাওয়া চারটি শিয়াল ও বেশ কিছু কুকুরের জীবাশ্ম থেকে এ দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।#

 

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।