রংধনু আসর: পাহলোয়ান ও চিত্রকর
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছো যে, আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন যারা নিজেদের বীরত্বের কথা মানুষের কাছে বলাবলি করে খুব মজা পায়। কিন্তু বাস্তবে তারা তেমন সাহসী নয়।
এসব মানুষকে নিয়ে হিজরী সপ্তম শতাব্দীর বিখ্যাত ইরানি কবি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা জালালুদ্দিন মাওলানা রুমী তার মসনবী গ্রন্থে একটি মজার গল্প লিখেছেন। রংধনুর আজকের আসরের প্রথমেই আমরা ওই গল্পটি শোনাব। গল্পের পর থাকবে একটি গান এবং সবশেষে থাকবে বুদ্ধি বাড়ানোর উপায় নিয়ে কিছু পরামর্শ। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন সহকর্মী আশরাফুর রহমান। তো প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।
প্রাচীনকালে অজ্ঞ, মুর্খ ও বোকা লোকেরা সমাজে বাহাদুরী দেখানো ও নিজের বীরত্ব প্রকাশের জন্য নিজেদের শরীরের চামড়ার ওপর নানা ধরণের চিত্র আঁকত। যারা এসব চিত্র এঁকে দিতো ফারসী ভাষায় তাদেরকে 'দাল্লাক' বলা হয়। দাল্লাকরা মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশে পশু পাখি, ফুল, সূর্য বা অন্য কিছু অংকন করে দিত। তাদেরকে শরীরের যেখানে চিত্র আকতে বলা হতো প্রথমে সেখানে তারা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিতো। তারপর সেখানে কালি দিয়ে চিত্র আঁকত। এরপর সুঁই দিয়ে কালি দিয়ে আঁকা ছবির ওপর ফুটো বা ছিদ্র করা হতো।
ছিদ্র করা শেষ হলে বিশেষ ধরণের লতাপাতার রস দিয়ে সেখানে মালিশ করা হতো। এরপর যখন চামড়া বেদনা জলে যেত তখন সুঁই দিয়ে ছিদ্র করা জখমের ওপর এমন এক পাকা কালি লাগানো হতো যা শরীরের ওই জায়গায় চিরদিনের জন্য লেগে থাকে। মুর্খ লোকেরা এভাবে চিত্র একে সমাজে গর্বে করে বেড়াতো। তো একবার এক কুস্তিগীর এলো এক চিত্রকরের কাছে তার শরীরের সিংহের ছবি আঁকতে। কুস্তিগীর যুবকটি ছিল অত্যন্ত ভীরু প্রকৃতির। সিংহের ছবি আঁকা নিয়ে তাদের মধ্যে যেসব কথাবার্তা হয় তা ছিল এরকম-
কুস্তিগীর : এই যে দাল্লাক ভাই, আমার শরীরে একটা চিত্র এঁকে দাও তো !
দাল্লাক : চিত্র আঁকতে চাও? বেশ ভালো কথা। তা তুমি কিসের চিত্র আঁকতে চাও?
কুস্তিগীর : আমি একজন কুস্তিগীর পাহলোয়ান। সিংহের মতো শক্তি আমার গায়ে। তাই সিংহের ছবিই এঁকে দাও।
দাল্লাক : সাব্বাস পাহলোয়ান বেটা, সাব্বাস ! তোমার শরীরে সিংহের ছবিই মানাবে ভালো। তা শরীরের কোন জায়গায় সিংহের ছবি আঁকাতে চাও তুমি?
কুস্তিগীর : আমার ডান হাতের পেশীতে আঁকতে চাই।
দাল্লাক : ঠিকাছে, তুমি বাহু খুলে এখানে বসে পড়। আমি এক্ষুণি সিংহের ছবি আঁকা শুরু করছি।
কুস্তিগীর পাহলোয়ান যুবকটি বাহু খুলে বসার পর চিত্রকর তার কাজ শুরু করল। প্রথমে পাহলোয়ানের বাহু গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নরম করল। এরপর কালি দিয়ে সিংহের ছবি এঁকে আসল কাজে হাত দিল। দাল্লাক যেইমাত্র তার সুঁই পাহলোয়ানের বাহুতে প্রথম ফুটোটি করল তখন সে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল:
কুস্তিগীর : ওরে বাবারে, মরে গেলাম রে ! আমার হাত একেবারে অবশ হয়ে গেলরে। ওই বেটা দাল্লাক কি করছিস তুই?
দাল্লাক : রাগ কর ক্যান? তোমার কথা মতোই তো কাজ করছি। তুমি কি আমাকে সিংহ আঁকতে বলো নাই?
কুস্তিগীর : তাতো বলেছি কিন্তু ব্যথা লাগছে তো! ঠিকাছে বল্, কোথা থেকে চিত্র আঁকা শুরু করেছিস?
দাল্লাক : সিংহের লেজ থেকে শুরু করেছি। লেহের ঠিক শেষ মাথাতে সুঁই বসিয়েছি।
কুস্তিগীর : বেশ হয়েছে। এখন লেজ বাদ দিয়ে মাথা বা শরীরের অন্য কোথাও থেকে শুরু কর্। আমার সিংহ লেজ ছাড়াই হবে। লোকজন কিছু বললে বলব, এটা লেজকাটা সিংহ!
দাল্লাক : ঠিকাছে, আমার কী বাপু! তোমার ইচ্ছে না থাকলে লেজ ছাড়াই আঁকব।
এবার দাল্লাক সিংহের লেজ ছেড়ে মাথা থেকে শুরু করল। সে যখনি সিংহের কেশর ও ঘাড় বরাবর সুঁই ঢুকাল অমনি পাহলোয়ানের গলা ফাটা চিৎকারের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
কুস্তিগীর : বাবাগো, মাগো, ব্যথায় একবোরে মরে গেলাম রে ! ওই বেটা দাল্লাক করছিস কি শুনি?
দাল্লাক : আরে বাপু এমন করছো কেন ? সিংহের ছবিই তো আঁকছি। একটু ধৈর্য্য ধরো, কতক্ষণের ব্যাপার!
কুস্তিগীর : আমাকে ধৈর্য্য ধরার কথা না বলে এবার বল্ সিংহের কোন অংশ আঁকছিস?
দাল্লাক : ঘাড়ের ঠিক ওপরে কেশর আঁকছি।
কুস্তিগীর : আরে বাপু সিংহের গর্দান আর কেশর কখন থেকে এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল? আমার সিংহের কেশর আঁকার দরকার নেই। ওসব বাদ দে। শরীরটা এঁকে দিলেই যথেষ্ট।
দাল্লাক : ঠিক আছো, তুমি যখন সহ্য কেশরও না হয় বাদ দিলাম।
এরপর দাল্লাল ভাবতে লাগল কী করা যায়। লেজ থেকেও হলো না, মাথার দিক থেকেও হলো না। তাই সে পা থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিল। এরপর সিংহের পায়ের নকশার ওপর সুই খাড়া করে বসিয়ে দিতেই পাহলোয়ান 'মাগো মাগো' বলে ফরিয়াদ শুরু করল। ব্যথায় তার সারা শরীর যেন কাঁপছে। তীব্র ব্যথায় ককিয়ে ওঠে জিজ্ঞেস করল :
কুস্তিগীর : আবার কোন জায়গায় সুই ঢুকিয়েছিস?
দাল্লাক : এটা সিংহের পায়ের থাবা।
কুস্তিগীর : আরে বাবা তুই তো আজব চিত্রকর? এতোসব খুঁটিনাটি বিষয়ে ওস্তাদি দেখাচ্ছিস কেন? সিংহের পায়ের থাবা আর নখ তো কারো চোখেই পড়ে না। আমি কি তোকে আমার শরীরে চীনের চিত্রশালা বানাতে বলেছি? শুধু সিংহের একটা সুরত হলেই চলে। শোন্, আমার সিংহের থাবা-টাবা দরকার নেই। এমন কিছু কর্ যাতে ব্যথা কম হয় আর আমি তাড়াতাড়ি বিদায় হতে পারি।
এরপর চিত্রকর কালি দিয়ে আকা সিংহের ছবিটি ভালো করে খেয়াল করল। তার নজর গেল সিংহের পেটের ওপর। নজর পড়া মাত্রই সে সুঁইয়ের মাথা খাড়া করে পাহলোয়ানের চামড়ায় বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কানফাটা চিৎকার দিয়ে সে বলে উঠল:
কুস্তিগীর : আরে বাপু আমাকে মেরে ফেলবি নাকি ? করছিস কি ? এটা আবার কোন জায়গা?
দাল্লাক : এটাই তো সিংহের আসল জায়গা মানে পেট। এটা ছাড়া সিংহ হবেই না।
কুস্তিগীর : হবে না বললেই হলো। এমন কিছু কর যাতে সিংহও হয় আবার পেটও যেন না থাকে।
এবার চিত্রকর। হতভম্ব হয়ে গেল। মুখে আঙ্গুল দিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর সুইটি ঢিল মেরে ফেলে দিয়ে বলল:
দাল্লাক : জনাব পাহলোয়ান! আমি এ যাবত কমপক্ষে এক হাজার লোকের গায়ে চিত্র এঁকেছি আর একশো লোকের শরীরের শুধু সিংহই এঁকেছি। কিন্তু লেজ, ঘাড় থাবা, কেশর আর পেট ছাড়া কোনো সিংহ হতে দেখিনি। তুমি আমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দাও। আর শোনো, সুইয়ের মাথার আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা যখন তোমার নেই তখন তোমার বাহু খালি থাকাই ভালো। এখান থেকে এক্ষুণি তুমি বিদায় হও। আর কক্ষণো পাহলোয়ানগিরির গল্প করতে এসো না, বুঝলে!
বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই পড়া মুখস্ত করার জন্য বারবার চেষ্টা করেও অনেক সময় ব্যর্থ হও। পড়া মনে রাখার জন্য অনুশীলনের পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্যও চাইতে হবে যাতে তিনি আমাদের স্মৃতিশক্তি বাড়িয়ে দেন এবং কল্যাণকর জ্ঞান দান করেন। স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য আমরা সূরা ত্বোয়া-হার ১১৪ নম্বর আয়াতের অংশবিশেষ অর্থাৎ 'রাব্বি জিদনি ইলমা' পড়ে থাকেন। এর অর্থ হচ্ছে 'হে প্রভূ! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও।'
বন্ধুরা, 'রাব্বি জিদনি ইলমা' আয়াতটি দিয়ে চমৎকার একটি গান লিখেছেন ঢাকার সারেগামা একাডেমির পরিচালক মাহফুজ বিল্লাহ শাহী। গানটি গেয়েছে শিশুশিল্পী আরোশী, সারা, সেমন্তি, তামান্না, নওশীন, মিম, চাঁদনি, সাফা, তাইফা, তাসনিম, মৌলি, আনহা ও তোহা। গানটিসহ পুরো অনুষ্ঠান শুনতে উপরের ছবিতে ক্লিক করো।
বুদ্ধিমত্তা ও স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর উপায়
- গবেষণায় দেখা যায়, জীবনে মানুষ তার মস্তিষ্কের সামর্থ্যের খুব সামান্যই ব্যবহার করে থাকে। সেই হিসেবে মস্তিষ্কের বড় একটি অংশই অব্যবহৃত থেকে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, মাংসপেশির মতোই মস্তিষ্কেরও যত বেশি চর্চা ও ব্যবহার করা হবে, ততই এটি কর্মক্ষম হয়ে উঠবে। তীক্ষ্ণ বা ক্ষুরধারও হবে।
- প্রতিদিন কমপক্ষে ছয় ঘণ্টার ঘুম মস্তিষ্ককে কর্মদক্ষ করে তোলে।
- মস্তিষ্ককে সতেজ ও কর্মদক্ষ করে তোলার জন্য খাদ্যতালিকায় মাছ রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে এবং চর্বিজাতীয় খাবার বর্জন করতে হবে।
- শরীরচর্চা করলে দেহের পেশির সাথে সাথে মস্তিষ্কের আকারও বৃদ্ধি পায়। ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কের সিন্যাপসের সংখ্যা বাড়ে। এর ফলে মগজে নতুন নতুন কোষ তৈরি হয়। তাই প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
- বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের প্রখরতা বাড়ায়। তাই যখনই সময় পাবে তখনই বই পড়বে।
- সবুজ প্রকৃতি চোখের জন্য ভালো। প্রকৃতির যতো কাছাকাছি যাবে ততো বিশুদ্ধ অক্সিজেন নিতে পারবে। এর ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বেড়ে যাবে।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।