ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ ১৯:৫৭ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, বাবা-মা হচ্ছে দুনিয়ায় আমাদের সবচেয়ে আপনজন। তারাই আমাদের বড় করার জন্য, আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য- সবধরনের চেষ্টা চালিয়ে থাকেন। কিন্তু সমাজে অনেকেই আছে যাদের বাবা-মা বেঁচে নেই। এদেরকে এতিম বলা হয়।

বাবা-মা বেঁচে না থাকায় এতিমদের দুঃখ-কষ্টের শেষ থাকে না। কিন্তু ইসলাম ধর্মে এতিমদের অধিকার রক্ষায় উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সাথে উত্তম আচরণের জন্য ব্যাপক তাগিদ দেয়া হয়েছে। সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও শাসকদের প্রতি এতিমের অধিকার আদায় করার ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইসলামের আবির্ভাবের আগে এতিম-মিসকিনদের জান-মালের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। তাই এতিমের ধন-সম্পদ লুটেপুটে খাওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমের ধন-সম্পদ ভোগ করে, তারা নিজেদের পাকস্থলীকে অগ্নি দ্বারা পূর্ণ করে এবং অতিসত্বর তারা অগ্নিতেই প্রবেশ করবে।' (সূরা আন-নিসা, আয়াত-১০)

অন্যদিকে, এতিমদের ধন-সম্পদ রক্ষার সার্বিক বিষয়ে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন, ‘আর এতিমদের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখবে, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছে। যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনা দেখা যায়, তাহলে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পণ করতে পারবে। এতিমের সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করো না অথবা তারা বড় হয়ে যাবে মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না। যখন তাদের কাছে তাদের সম্পদ তাদের হাতে হস্তান্তর করবে তখন সাক্ষী রাখবে। অবশ্যই আল্লাহ হিসাব নেয়ার জন্য যথেষ্ট।' (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬)

আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও একজন এতিম ছিলেন। তাই তিনি এতিমের দুঃখ-কষ্ট অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এতিমদের মাথায় শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যে হাত বুলায়, তবে যেসব চুলের ওপর দিয়ে হাত বুলিয়েছে তার প্রত্যেকটি চুলের বিনিময়ে কয়েকটি করে নেকি লাভ করবে।'

তিনি আরও বলেছেন, ‘সর্বোত্তম ঘর হলো সেই ঘর, যেখানে এতিমদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হয়, আর নিকৃষ্টতম ঘর হলো সেই ঘর, যেখানে এতিম বসবাস করে কিন্তু তার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়।'

বন্ধুরা, আজকের আসরে আমরা এতিমের প্রতি বিশ্বনবীর দয়া সম্পর্কে দুটি সত্য ঘটনা শোনাব। এর পর থাকবে একটি গান। আর সবশেষে থাকবে বাংলাদেশের এক নতুন বন্ধু সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। প্রথমেই ঘটনা দুটো জানা যাক:

একবার একটি এতিম ছেলে এসে নবীজির দরবারে উপস্থিত হলো এবং একজন লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলল, লোকটি জোরপূর্বক তার খেজুর বাগান দখল করে নিয়েছে। অভিযোগ শুনে রাসূলেখোদা ওই লোকটিকে দরবারে উপস্থিত হতে বললেন।

যথাসময়ে লোকটি উপস্থিত হলো। এরপর নবীজী দু'জনের বক্তব্যই শুনলেন। কিন্তু বিচারের রায়ে গেল এতিমের বিরুদ্ধে। রায় শুনে এতিম ছেলেটি জোরে জোরে কাঁদতে লাগল। ছেলেটির কান্না শুনে রাসূল (সা.) ভীষণ কষ্ট পেলেন। তার দু'চোখ জুড়ে নেমে এলো অশ্রুর বান।

নবীজী যার পক্ষে রায় ঘোষণা করেছেন, তাকে বললেন, ‘রায় তো তোমার পক্ষেই হয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও কতই না ভালো হতো যদি তুমি এ বাগানটি এতিম বাচ্চাটিকে দান করে দিতে! মহান আল্লাহ এর বিনিময়ে তোমাকে জান্নাতে এর চাইতে আরো অনেক উন্নত ও সুসজ্জিত বাগান তোমাকে দান করতেন।' কিন্তু লোকটি কোনোভাবেই বাগানটি দান করতে রাজি হলো না।

সে সময় দরবারে উপস্থিত ছিলেন রাসূলেখোদার সাহাবী হযরত আবু দারদা (রা.)। তিনি বাগানের মালিক লোকটিকে একপাশে ডেকে নিয়ে চুপি চুপি বললেন, আচ্ছা ভাই, আমি তোমার এ বাগানটির পরিবর্তে আমার অমুক বাগানটি যদি তোমাকে দিয়ে দেই তাহলে কি তুমি তোমার এ বাগানটি আমাকে দেবে?

হযরত আবু দারদার এ প্রস্তাবে লোকটি রাজি হয়ে গেল। কারণ আবু দারদা যে বাগানটি দিতে চাইলে সেটি এ বাগানের তুলনায় অনেক বেশী উন্নত ছিল। লোকটি সাথে কথা শেষ করে আবু দারদা আবারও রাসূলের দরবারে হাজির হলেন এবং বললেন, হে রাসূলুল্লাহ! আমি একটি কথা জানতে এসেছি।

নবীজী তার কথা শুনে মুচকি হেসে বললেন, বলো তুমি কি বলতে চাও।

আবু দারদা বললেন, আপনি যে বাগানটি এতিম ছেলেটিকে দান করার জন্য লোকটিকে উৎসাহিত করছিলেন তা যদি আমি ঐ এতিমকে দান করে দেই তাহলে কি আমি তার পরিবর্তে জান্নাতে বাগান লাভ করতে পারবো

রাসূলেখোদা বললেন, অবশ্যই। আবু দারদা বললেন, হে রাসূলুল্লাহ! আমি ঐ বাগানটি আমার একটি বাগানের বিনিময়ে কিনে নিয়েছি এবং আপনি সাক্ষী থাকুন আমি বাগানটি এই এতিম ছেলেকে দান করে দিচ্ছি।

এ কথা শোনার পর এতিম ছেলেটির চেহারা পুনরায় আনন্দে নেচে উঠল। আর নবীজীও আনন্দে মুচকি হাসতে লাগলেন। এভাবেই রাসূল (সা.) অসহায়, দুঃখী, এতিম ও গরীবদের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। তাদের ব্যথায় ব্যথিত হতেন আবার তাদের আনন্দে আনন্দিত হতেন। এবারে এ সম্পর্কেই আরেকটি ঘটনা শোনা যাক:

ইয়েমেনের একটি এতিম শিশু

একদিন মহানবী (সা.) একটি গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি একটি শিশুকে দেখলেন, রাস্তার পাশে বসে কাঁদছে। শিশুটির পরনের জামা ছিল ছেঁড়া এবং তার চেহারা ছিল অত্যন্ত মলিন, দুঃখ-ব্যথায় ভারাক্রান্ত।

নবীজি শিশুটিকে এ অবস্থায় দেখার পর খুবই অস্বস্তি বোধ করছিলেন। তিনি শিশুটির পাশে গেলেন। নবীজি ছেলেটির শরীর ও মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহভরে জিজ্ঞেস করলেন- কী হয়েছে, কাঁদছ কেন বাবা?

বিশ্বনবীর আদর পেয়ে ও স্নেহমাখা কথা শুনে শিশুটি কান্না থামাল। এরপর চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল: কিছুদিন আগে যুদ্ধে আমার বাবা শহীদ হয়েছেন। একটি মাত্র বোন ছিল আমার। সেও দুনিয়া থেকে চলে গেছে। আমার মাও অন্য শহরে বাস করছে। আমার পাশে আপন বলতে আর কেউ নেই। আমার বসবাসের জন্য কোনো ঘর নেই যেখানে থাকতে পারি; আমার এমন কোনো ভালো পোশাকও নেই যা পরতে পারি। এমনকি ক্ষুধা নিবারণের জন্য আমার কোনো খাবারের ব্যবস্থাও নেই। আমি খুব অসহায় ও একা হয়ে পড়েছি। আর এ কারণে শহরের কোনো শিশু আমার সাথে খেলা করতেও আসে না। যেহেতু আমি একজন এতিম, তাই ওরা আমাকে এড়িয়ে চলে।

মহানবী শিশুটির এই হৃদয়বিদারক কাহিনী শুনে খুবই মর্মাহত হলেন। তাঁর সুন্দর চেহারা মলিন হয়ে গেল। নবীজির চোখে পানি চলে এল। তিনি ছেলেটির মাথা ও শরীরে তাঁর পবিত্র হাত বুলিয়ে দিলেন আর বললেন, 'তুমি আর কষ্ট পেয়ো না, চিন্তা করো না, সবকিছু ভুলে যাও। তোমার পিতা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এজন্য দুঃখ করো না, আজ থেকে আমি তোমার পিতা, আমার স্ত্রী তোমার মা এমনকি আমার কন্যা ফাতিমা তোমার বোন হয়ে গেল।

এতিম শিশুটি মহানবীর মুখ থেকে এসব কথা শুনে খুশিতে মেতে উঠল। তার হৃদয়ে দুঃখ আর ব্যথা-বেদনার যে কষ্ট ছিল তা মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দ আর খুশিতে পরিবর্তিত হয়ে গেল। সে মহানবীর সুন্দর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকল। শিশুটি বুঝতে পারছিল না যে, এই মহান নবীর অশেষ করুণার জবাবে কিভাবে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা যায়।

এসময় মহানবী (সা.) শিশুটির হাত ধরলেন এবং তাকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে গেলেন। তিনি হযরত ফাতিমা সালামুল্লাহে আলাইহাকে বললেন, হে আমার কন্যা, এ শিশুটি আজ থেকে তোমার ভাই।

নবীনন্দিনী হযরত ফাতিমা অসহায় ও বিপদগ্রস্ত শিশুটিকে দেখে খুবই খুশি হলেন এবং তাকে নিজ হাতে গোসল করিয়ে সুন্দর জামা কাপড় পরিয়ে দিলেন। সেদিন থেকে এতিম শিশুটি নবীজির ঘরে পরম মমতায় বড় হতে লাগল।

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।