বিশ্লেষণ। ইয়েমেনের নৌ অবরোধে সৌদি আরবের নতুন চ্যালেঞ্জ
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i161742-বিশ্লেষণ_ইয়েমেনের_নৌ_অবরোধে_সৌদি_আরবের_নতুন_চ্যালেঞ্জ
পার্সটুডে – ইয়েমেনের ঘোষিত নৌ অবরোধ এবং সৌদি তেলবাহী জাহাজের জন্য বাব আল-মান্দাব প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরব নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংকটের মুখে পড়েছে।
(last modified 2026-07-28T04:07:39+00:00 )
জুলাই ২৮, ২০২৬ ০৯:৫৩ Asia/Dhaka
  • বিশ্লেষণ। ইয়েমেনের নৌ অবরোধে সৌদি আরবের নতুন চ্যালেঞ্জ

পার্সটুডে – ইয়েমেনের ঘোষিত নৌ অবরোধ এবং সৌদি তেলবাহী জাহাজের জন্য বাব আল-মান্দাব প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরব নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংকটের মুখে পড়েছে।

পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২০ জুলাই ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। সৌদি আরবের সানা' আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলা এবং ইয়েমেনের ওপর দীর্ঘ ১২ বছরের অবরোধের জবাব হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর এটিই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ঘটনা। ইয়েমেন "অবরোধের জবাবে অবরোধ" নীতির ভিত্তিতে সৌদি জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যা রিয়াদের জন্য নজিরবিহীন সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

বাব আল-মান্দাব প্রণালী সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির তেল রপ্তানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এখন এসব জাহাজকে এশিয়ায় পৌঁছাতে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ প্রদক্ষিণ করতে হচ্ছে। লোহিত সাগরে ইয়েমেনি বাহিনীর সতর্কতা ও সামরিক অভিযানের কারণে সৌদি ট্যাংকারগুলোকে বাব আল-মান্দাব হয়ে সরাসরি যাতায়াতের পরিবর্তে সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর এবং পরে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে এশিয়ায় যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে।

এদিকে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে সৌদি তেলের প্রধান ক্রেতা ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে চীন। ফলে দীর্ঘ সমুদ্রপথ সৌদি আরবের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রাপথ দীর্ঘ হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে, লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে তাইওয়ানে একটি তেলবাহী জাহাজ পাঠাতে অতিরিক্ত ১০ লাখ ডলারেরও বেশি খরচ হচ্ছে।

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে সুয়েজ খালে বড় তেলবাহী জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান Energy Aspects-এর তথ্য অনুযায়ী, বড় ট্যাংকারগুলোকে অর্ধেক মাল বোঝাই অবস্থায় সুয়েজ খাল অতিক্রম করতে হচ্ছে এবং পরে ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পুনরায় পূর্ণ মালামাল তুলতে হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ইয়েমেনের এই নৌ অবরোধ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটের জন্য সরাসরি হুমকি। বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্য বাব আল-মান্দাব প্রণালী দিয়ে পরিচালিত হয়। ইয়েমেন সৌদি তেলবাহী জাহাজের চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে প্রতিদিন ৭০ লাখের বেশি ব্যারেল তেল ইয়ানবু বন্দরে পরিবহনকারী পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এর পাশাপাশি ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় সৌদি আরবের বিকল্প সামুদ্রিক পথও কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে।

ইয়েমেনের এই নৌ অবরোধ সৌদি অর্থনীতিতেও বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকল্প রুট ব্যবহারের ফলে প্রতি ব্যারেল তেল পরিবহনে প্রায় ৯ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, যা সৌদি বাজেটের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি তেলের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল করছে। একটি তেলবাহী জাহাজের জ্বালানি ব্যয় ১.২৬ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২.৮৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে সুয়েজ খালের টোল যোগ করলে প্রতিটি যাত্রায় প্রায় ২.৫ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাত্র প্রায় ২ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারেরও বেশি হতে পারে। এ পর্যন্ত ১৬টি সৌদি জাহাজ ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং অন্তত তিনটি তেলবাহী জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে, যা ইয়েমেনের নৌ অবরোধের কার্যকারিতা তুলে ধরে।

অন্যদিকে ইয়েমেন সৌদি আরবের ইয়ানবু ও জিজানে অবস্থিত আরামকো-এর তেল স্থাপনা এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় জিজান শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। জিজান তেল শোধনাগারে বড় অগ্নিকাণ্ডে এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইয়ানবুর তেল স্থাপনার দিকে ছোড়া কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে, তবুও এটি দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই সংঘাত এমন সময়ে চলছে, যখন ২০২২ সালের পর থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটি সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে একটি জটিল কৌশলগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইয়েমেনের নৌ অবরোধ মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণে বড় পরিবর্তন এনেছে এবং সৌদি আরবকে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে ফেলেছে। যে দেশ একসময় ইয়েমেনকে অবরুদ্ধ করেছিল, আজ সেই দেশই একই ধরনের অবরোধের প্রভাব অনুভব করছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও অস্থিরতা, তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল সামরিক পদক্ষেপে নয়, বরং ইয়েমেনের প্রতি সৌদি নীতির পুনর্মূল্যায়ন এবং দীর্ঘদিনের অবরোধের অবসানে একটি ন্যায্য রাজনৈতিক সমাধানের ওপর নির্ভর করবে।*

পার্সটুডে/এমএ‌আর/২৭