ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০ ১৬:০৮ Asia/Dhaka
  • খুজিস্তান প্রদেশের দর্শনীয় নানা নিদর্শন

ইরানের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা আহওয়াজ শহর সফর শেষ করেছিলাম।

আহওয়াজ শহরের কাঠ শিল্প যাদুঘর দেখে এই শহরের কাঠ শিল্প এমনকি ফার্নিচারের কারুকাজ সম্পর্কেও চমৎকার একটি ধারনা পাওয়া গেছে। আহওয়াজের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণের পাশাপাশি এখানকার বিচিত্র গোত্র ও বংশের সৌন্দর্য দেখেও আকৃষ্ট হয়েছি আমরা। একই শহরে বহু গোত্রের লোকজনের সহাবস্থান সত্যিই চমৎকার একটি ব্যাপার।

লোর জনগোষ্ঠির পাশাপাশি ফার্সরা যেমন বসবাস করছে তেমনি আরবদের উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয় ছিল। বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের এক অনন্য পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে আহওয়াজের অধিবাসীরা। বিশেষ করে ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া আট বছরের যুদ্ধের সময় এরা সকলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বন্ধুত্ব ও সংহতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আপন দেশের জল-স্থল-অন্তরীক্ষের সুরক্ষায় এগিয়ে এসেছিল-সেই সমৃদ্ধ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এই শহর। ঐতিহাসিক এই শহর ছেড়ে এবার আমরা যাবো খুজিস্তানেরই আরেকটি শহরের দিকে। শহরটির নাম শুশ। কথা আর না বাড়িয়ে বরং আজকের শুশ সফরের পালা শুরু করা যাক।

খুজিস্তান প্রদেশ দর্শনীয় নানা নিদর্শনে ভরপুর একটি প্রদেশ। এখানকার শহরগুলোতে রয়েছে বিচিত্র বিস্ময়। এগুলোর যে-কোনো একটি নিদর্শনের দিকে তাকালেই ইরানের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি দর্শকের গভীর ধারনা ও চিন্তাদৃষ্টির পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। প্রাচীন শুশ শহরের দিকে যাচ্ছি আমরা। আহওয়াজ থেকে এক শ পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই শুশ শহর বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আবাসিক এলাকা। খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার দুই শ বছর আগে এখানে এই আবাসন গড়ে উঠেছিল। বছরের পর বছর ধরে এই শহরটি ইলামিদের প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র ছিল। একইসাথে হাখামানেশিদের বিশাল সাম্রাজ্যের শীতকালীন রাজধানী হিসেবেও সমৃদ্ধ ছিল শুশ শহর। এ কারণেই শহরটির ঐতিহ্য এতো প্রাচীন। প্রাচীনত্বের ঐশ্বর্য দেখতে পাওয়া যাবে শহরে ঢোকার পথেই। পুরান শুশ এলাকায় গেলে সেখানকার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক বহু স্থাপনা সহজেই নজরে পড়বে।

শুশের দুটি প্রাচীন নিদর্শন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। একটি হলো চোগাজাম্বিল প্রার্থনালয় এবং অপরটি প্রাচীন শুশ অঙ্গন। রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং প্রাচীন সভ্যতার কয়েকটি সমৃদ্ধ নিদর্শন। এইসব নিদর্শন ইরানের অভ্যন্তরীণ দর্শনার্থীদের যেমন আকৃষ্ট করে তেমনি বিদেশি পর্যটকদের জন্যও এগুলো খুবই দর্শনীয় এবং আকর্ষণীয়। প্রাচীন এই শুশ এলাকাটি ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল নিদর্শন হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়েছে। এখানে রয়েছে শউর বা দ্বিতীয় আর্দেশিরের প্রাসাদ, রয়েছে আপাদানা প্রাসাদ, প্রাসাদের পূর্ব গেইট, হাদিশ গেইট, ফিফটিন্থ সিটি, শুশ জামে মসজিদ এবং ইসলামি শাসনামলের বহু স্থাপনা। আরও রয়েছে অক্রোপুল টিলা এবং ফরাসি কেল্লার মতো অনেক নিদর্শন। এগুলোর একেকটি নিয়ে আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। কিন্তু তত সময় আমাদের নেই।

শুরুতেই বলেছি যে শুশ আসলে বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। এখানে রয়েছে প্রথম নগরবাসীর নিদর্শন এবং এ অঞ্চলের প্রথম বৃহৎ বাণিজ্যিক নিদর্শন। রয়েছে প্রাচীন কয়েকটি টিলাও। প্রাচীন ওই টিলাগুলো থেকে পুরো শহর এবং তার আশেপাশের চমৎকার দৃশ্য সহজেই লক্ষ্য করা যায়। এই টিলাগুচ্ছের নাম সপ্তটিলা। এ নামেই টিলাগুলো সুপরিচিত। এই টিলাগুচ্ছের একটি বিস্ময় হলো ইলামিদের গোরস্তান। ক্রিসেন্ট বা বাঁকা চাদের আকৃতির খিলান রয়েছে এই সমাধিতে। ওই খিলানকে বিশ্বের সর্বপ্রথম খিলান বলে মনে করা হয়। মোঙ্গলদের হামলার সময় কিংবা ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় এইসব নিদর্শন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টিলাগুচ্ছের মধ্যে আরও একটি নামকরা টিলা হলো অক্রোপুল। লুভার প্যারিস মিউজিয়ামের ভেতর এই অক্রোপুল টিলার মূল্যবান বহু নিদর্শন সংরক্ষণ করা আছে। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে খ্যাতি পেয়েছে কুইন নমিরাস্তুনের ভাষ্কর্য, মাটির তৈরি কাপ এবং কোড অব হামুরাবি। শুশের মৃৎপাত্র বিশেষ করে বাটির রঙ ছোলার রঙের মতো বাদামি। এটি বৃদ্ধাঙ্গুলির মাথার ভেতরের অংশের মতো দেখতে একটি বড় পাথর। ওই পাথরে খোদাই করে লেখা হয়েছে বাণিজ্য সংক্রান্ত কিছু নিয়মনীতি। আড়াই মিটার উঁচু ওই পাথরে চৌত্রিশটি লাইনে আইনের ধারাগুলো কিউনিফর্ম বর্ণে লেখা হয়েছে। এই টিলার উপরেই রয়েছে শুশ নামে বিখ্যাত কেল্লা বা দূর্গটি নির্মিত হয়েছে। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি পুরাতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে মধ্যযুগীয় স্টাইলে এই কেল্লাটি নির্মিত হয়।

শুশ দূর্গ নিয়ে কথা হচ্ছিল বিরতির আগে।বিখ্যাত সেন্ট বাসিল গির্যার আদলে তৈরি করা হয়েছে এই দূর্গটি। দু:খজনক বিষয়টি হলো এখানকার মূল্যবান বহু স্থাপত্য নিদর্শন বিদেশি পুরাতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে পাচার হয়ে গেছে। বলে রাখা ভালো যে এই দূর্গটি দেখার পর অবশ্যই আপাদানা প্রাসাদটি দেখতে ভুল করবেন না। দারিয়ুশ সিনিয়রের আমলের এই প্রাসাদটিও তাখতে জামশিদ বা পার্সপোলিসের মতোই বিশ্বব্যাপী খ্যাতিমান। কিন্তু প্রাসাদের পাথরের পিলার আর ইটের প্রাচীরগুলো আলেক্সান্দ্রিয় আক্রমণে এখন আর খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট নেই। সবই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। অবশ্যই পিলারগুলোর মাথায় যেসব কারুকাজ এখনও দেখতে পাওয়া যায় তা থেকে অনুমান করা যায় এই প্রাসাদটি কতোটা ঐশ্বর্যময় ছিল। হাঁটু গেড়ে বসে থাকা পিঠাপিঠি দুটি গরুর ভাষ্কর্যি এখনও লক্ষ্য করা যায়।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।