মার্চ ০৬, ২০২০ ১৬:০৬ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চাও কিংবা সফলতা পেতে চাও।  কিন্তু এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলো সফলতার পথে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তার মধ্যে সবচাইতে ক্ষতিকর যে বাধা তার নাম ‘ব্যর্থতার ভয়'। এই ভয় যদি কাউকে পেয়ে বসে, তাহলে তার পক্ষে আর সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সাধারণত ব্যর্থ লোকেরাই ব্যর্থতাকে ভয় পায়। তারা বুঝতেই চায় না যে, ভয়কে কাটিয়ে কাজ শুরু না করলে সাফল্য আসে না।

বন্ধুরা, তোমরা স্বীকার করবে যে, প্রতিটি মানুষের জীবনে যেমন হাসি-কান্না উভয়ই রয়েছে তেমনই রয়েছে হার-জিত। একটি ছাড়া অপরটির স্বাদ গ্রহণ করা অসম্ভব। আমরা কাঁদি বলেই বুঝতে পারি হাসির মূল্য। তেমনই আমরা কোনো কাজে বিফল হয়ে সফলতার মর্ম উপলব্ধি করতে পারি না। তাই জীবনে হার এবং জিত আছে- এই বাস্তব সত্যিটিকে মেনে নেয়ার চেষ্টা করলে মন থেকে ভয় চলে যাবে।

আর ভয়কে জয় করার সহজ উপায় হলো ভয় মোকাবেলা করা। যে ব্যক্তি যে কাজ করতে ভয় পায়, সাহস নিয়ে সেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লে ভয় পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে। এমনও হতে পারে যে, ভয় কেটে যাওয়ার পর ওই কাজটিই হয়ে ওঠবে আনন্দের উৎস।

বন্ধুরা, এসব কথা বলার উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো! হ্যাঁ, আজকের আসরে আমরা ভয়কে জয় করার উপায় নিয়ে একটি গল্প শোনাব। আর গল্পের পর থাকবে ভয়কে জয় করার কিছু টিপস। আর সবশেষে থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

প্রাচীনকালের ঘটনা। এক ব্যবসায়ী ছিল বেশ অভিজ্ঞ। সে সিদ্ধান্ত নিল পণ্যের বিশাল একটা চালান নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ওপারে যাবে। সেখানে জিনিসপত্রের দাম ভালো পাওয়া যাবে এবং তাতে লাভ হবে প্রচুর।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবসায়ী তার মালামাল সমুদ্র তীরের একটি বন্দরে নিয়ে হাজির করল। তারপর সব মাল-সামানা তুলে দিল জাহাজে। ব্যবসায়ীর এক শাগরেদ ছিল বেশ বিশ্বস্ত। তার ওপর ব্যবসায়ী মোটামুটি তার সব কাজের ব্যাপারেই নির্ভর করত। শাগরেদও তার পাশেপাশেই থাকত সবসময়। ব্যবসায়ীর কাজকর্ম দেখাশোনা করত। তো ব্যবসায়ীর মালগুলো জাহাজে বোঝাই করার পর ওস্তাদ-শাগরেদ দু’জনই খুশিমনে জাহাজে চড়ল। শাগরেদ ভীষণ খুশি। কারণ ব্যবসায়ী ভদ্রলোক মাল-সামানা নিয়ে বহুবার জাহাজে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু শাগরেদ এই প্রথমবারের মতো কিশতিতে উঠল। এটাই তার প্রথম সমুদ্রযাত্রা।

মনে মুনে ভীষণ খুশি শাগরেদ। ভেতরে একেবারে ফুরফুরে ভাব। জাহাজ তখনও ছাড়ে নি। ব্যাপক কৌতূহলি মনে সে একবার জাহাজের উপরে যায়- এটা ওটা দেখে ইত্যাদি। জাহাজের উপরে উঠে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিদায় দিতে আসা লোকজনের উদ্দেশে হাত নাড়ায়, খোদাহাফেজি করে। একজন মহান ব্যবসায়ীর সাথে সফরে যাচ্ছে, সুতরাং মনে মনে গর্বিত সে। অনেক স্বপ্ন অনেক প্রত্যাশাও মনে মনে লালন করতে শুরু করেছে শাগরেদ।

ভাবনা আর কল্পনার ঢেউয়ের ওপর জাহাজ যাত্রা শুরু করল। বন্দর উপকূল থেকে কিছুটা দূরে যেতেই শাগরেদ এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল উপকূল। যেদিকেই তাকানো যায় পানি আর পানি।

পানি ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ছে না আর। সেই পানিও তো শান্ত নয়। মাঝেমাঝেই বিশাল ঢেউ হয়ে ছলাৎ করে জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়ে আবার কখনো ঢেউ পুরো জাহাজকেই উপরে তুলে দিয়ে হঠাৎ ছেড়ে দেয়। উত্থান পতনের এই ভয়ংকর দোলে নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখতে জাহাজের ভেতরের শক্ত কোনো জিনিস জোর করে ধরে বসে থাকতে চেষ্টা করছিল। শাগরেদের তো বুকের ভেতর ধক ধক করতে শুরু করেছে। ভীষণ ভয়ে আতঙ্কিত সে। মনে মনে বলে: 'কী ভুলটাই না করেছি। আমার কি খানাপিনার সমস্যা ছিল? কেন আমি জাহাজে পাড়ি জমাতে গেলাম?'

ব্যবসায়ী কিন্তু তার শাগরেদের ওপর নজর রাখছিল। সে দেখছিল সবকিছু। বুঝতে পারল শাগরেদ ভয় পেয়ে গেছে। আস্তে উঠে গিয়ে শাগরেদের মাথায় হাত দিয়ে বলল: 'সমুদ্রযাত্রা কিন্তু ভীষণ মজার। যে সমুদ্রে পাড়ি জমায়নি কখনো সে প্রথম প্রথম একটু ভয় পায় এমনকি অনেক সময় জবুথবুও হয়ে পড়ে। কেউ কেউ তো অসুস্থও হয়ে পড়ে। কিন্তু সফর করতে করতে সেই সমস্যা কেটে যায় এবং সমুদ্রের বিচিত্র সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সফরটাকে উপভোগ করে।'

কিন্তু কে শোনে কার কথা। শাগরেদ ভয়ে আতঙ্কে জাহাজের একটা পিলার এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে যে যেন একেবারে আঠার মতো লেগে গেছে। তার চেহারার রঙ পাল্টে গেছে, ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার দুই চোখ ছিল সমুদ্রের দিকে, কানে ব্যবসায়ীর কোনো কথাই ঢুকল না তার।

ব্যবসায়ী শাগরেদের অবস্থা দেখে ভাবল এখন কিছু বলে কাজ হবে না। সে তার মতোই থাক আপাতত। আরও ভাবল শাগরেদের ভয় পাওয়াকে গায়ে না মাখালে শাগরেদ হয়ত নিজে নিজেই তার সমস্যা কেটে উঠবে। কিন্তু সেরকম হলো না। এক ঘণ্টাও হয়নি এখনো জাহাজ ছেড়েছে। এরইমধ্যে শাগরেদের চিৎকার চেঁচামেচি জাহাজের সকল যাত্রীর দৃষ্টিতে পড়েছে। শাগরেদ চিৎকার করে চেঁচাতে শুরু করল: "বাঁচাও! আমাকে রক্ষা কর! জাহাজে চড়ে আমি ভুল করেছি। আমাকে বন্দরে ফিরিয়ে নাও!"

ব্যবসায়ী শাগরেদের সামনে গিয়ে বলল: "চিৎকার চেঁচামেচি বন্ধ করো। পাগল হলে নাকি! একটু ধৈর্য ধর। সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে জাহাজের উত্থান পতনে নিজেকে অভ্যস্ত করে নাও!"

কিন্তু ব্যবসায়ীর কথা এবারও কানে ঢুকল না শাগরেদের। সে আগের মতোই চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগল। বারবার বলতে লাগল: "আমাকে বন্দরে নামিয়ে দাও! আমি নেমে যাব।"

জাহাজের অন্যান্য যাত্রী শাগরেদের চারপাশে জড়ো হলো এবং ঠাট্টা মশকরা করতে লাগল। ব্যবসায়ী দেখল তার শাগরেদ তো মান-ইজ্জত সব ডুবাবে তাই একটা বুদ্ধি আঁটল। জাহাজ থেকে কেউ পানিতে পড়ে গেলে তাকে উদ্ধার করার জন্য যেসব উদ্ধারকর্মী থাকে তাদের একজনকে বলল: প্রস্তুত থাকো! আমার শাগরেদকে উদ্ধার করতে হবে।

এই বলে ব্যবসায়ী রেগেমেগে শাগরেদের কাছে গিয়ে বলল: "তোর মতো ভীতু শাগরেদের আমার কোনো দরকার নেই। তোকে এখন পানিতে ফেলে দেব, নিজে নিজে সাঁতার কেটে বন্দরে গিয়ে উঠবি।"

এই বলে এক ধাক্কায় শাগরেদকে ফেলেই দিল পানিতে। বেচারা শাগরেদ তো কল্পনাই করেনি এ ধরনের বিপর্যয়কর অবস্থার মুখোমুখি হবে, সত্যি সত্যি পানিতে ফেলে দেয়া হবে তাকে। এখন মনে মনে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিল। মৃত্যু ছাড়া তার সামনে তো আর বাঁচার কোনো পথ দেখছে না সে। কান্নাকাটি করতে লাগল আর 'বাঁচাও, বাঁচাও' বলে চিৎকার করতে লাগল।

একটু পরেই উদ্ধারকর্মী পানিতে ঝাঁপ দিল এবং শাগরেদকে ধরে তুলে নিয়ে জাহাজের ডেক বা পাটাতনে রাখল। অথৈ সমুদ্রের পানিতে নিশ্চিত মৃত্যুর আশঙ্কা থেকে জাহাজের এই পাটাতন অনেক বেশি নিরাপদ মনে হলো শাগরেদের কাছে। তাই পাটাতনের এক কোণে গিয়ে চুপ করে বসে থাকল। জাহাজের অপরাপর যাত্রীরা ব্যবসায়ীর বুদ্ধি দেখে ভীষণ খুশি হলো। ব্যবসায়ীর চারপাশে সবাই সমবেত হলো।

একজন জিজ্ঞেস করল: এটা কী ধরনের চিকিৎসা যা আমাদের মাথায় কাজই করেনি! ব্যবসায়ী বলল: আমার শাগরেদকে যখন পানিতে ফেলে দিয়েছি তখন নিশ্চিত ছিলাম যে ও বুঝতে পারবে সমুদ্রের পানিতে ডুবে মরার চেয়ে জাহাজের যাত্রী হওয়া অনেক বেশি নিরাপদ এবং ভালো। পানিতে না পড়লে সে জাহাজের মূল্যটা উপলব্ধি করতে পারত না। এরপর থেকে যখনই কেউ বিপদে না পড়ার কারণে নিয়ামতের মূল্য বুঝতে না পারত তার সম্পর্কে বলা হতো: সুস্থতার কদর সে-ই বোঝে, অসুস্থ হয় যে।

বন্ধুরা, গল্পটি শুনলে। আশাকরি তোমাদের ভালো লেগেছে। তবে কেবল গল্প শুনলেই হবে না। গল্পের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ভয়কে জয় করতে হবে। বিপদ-আপদে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। আর তাহলেই জীবনে সাফল্য আসবে।

ভয়কে জয় করার কিছু টিপস

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, মানুষ জন্ম থেকেই সাহসী হয় না। পরিস্থিতি বা স্থান এবং সেইসঙ্গে চেষ্টা মানুষকে সাহসী করে তোলে। ভয়কে মানুষ অনেক আগে থেকেই অল্প অল্প করে জয় করে আসছে। মানুষ চেষ্টা করলে পারে না- এমন কিছু নেই। ভয়কে জয় করতে চাই কিছু সময়, চেষ্টা এবং ধৈর্য।

ভয় মানুষের জীবনের অত্যন্ত সাধারণ একটি ঘটনা। প্রাথমিকভাবে ভয়কে দু'ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এর একটি হচ্ছে বাস্তব ভয়। অন্যটি মূলত মনের ভয়। বাস্তব ভয় হলে এটাকে স্বাভাবিক ধরে নিতে হবে। অর্থাৎ এই ধরনের ভয় পাওয়ার যৌক্তিক কারণ থাকে। যেমন- ঝড় আসার খবরে কিংবা ভূমিকম্প হলে আমরা ভয় পাই। এ ধরনের ভয়কে বাস্তব বা স্বাভাবিক ভয় হিসেবে চিহ্নিত করি আমরা। আর এই ভয়ের ভালো দিকও আছে। আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা যায়। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব।

অনেকে অহেতুক নানা বিষয়ে ভয় পান। যেমন- কেউ কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অফিসের প্রধানের সামনে যেতে ভয় পায়; কারও হয়তো ভূতের ভয় আছে। অনেকে আছে যে, লিফটে বা বিমানে চড়তে ভয় পায়। কেউ আবার উঁচু বা নীচের দিকে তাকালে ভয় পায়। অনেকে আবার জনগণের সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। যদিও এসবে ভয় বা আতঙ্কের কোনো কারণই নেই, তারপরও ভয় হয়। এসব ক্ষেত্রে ভয় নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলতে হবে, এতে ধীরে ধীরে ভয় কেটে যাবে।  

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যেসব পরিস্থিতির কারণে মানুষ ভয় পায়, সেগুলো থেকে দূরে সরে না গিয়ে বরং এই পরিস্থিতিতে কথা বলার বা নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা উচিত। তাছাড়া আয়নার সামনে নিজে নিজে কথা বললেও ভয় কেটে যায়। তবে মানুষের সামনে বক্তৃতা, গান, আবৃত্তির মতো অনুশীলনের মধ্য দিয়ে খুব সহজেই ভয়কে জয় করা সম্ভব।

ভয় পাওয়াকে পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। তবে চিন্তাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কেউ হয়তো অনেক ছোট বিষয় নিয়ে চিন্তা করে তাকে বড় বানিয়ে অযথা ভয় পাচ্ছে। এক্ষেত্রে নিজে নিজেকে বোঝাতে হবে। সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে, যা ভয়কে দূর করতে অনেকাংশে সাহায্য করবে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।