রংধনু আসর: চতুর শিয়াল
রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, ধূর্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী শিয়ালের সঙ্গে তোমাদের নিশ্চয় পরিচয় আছে। শিয়াল পাতিশিয়াল বা শৃগাল নামেও পরিচিত। চতুরতা বা বুদ্ধিমত্তার জন্য এদের ‘শিয়াল পণ্ডিত’ও বলা হয়। আবার কেউ কেউ ‘শেয়াল মামা’ বলেও ডাকে। সন্ধ্যারাতে শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক শোনেনি, এমন লোক বোধ হয় গ্রামবাংলায় একজনও পাওয়া যাবে না। ছড়া ও গল্পের বদৌলতে এরা আমাদের কাছে অত্যন্ত চতুর প্রাণী হিসেবেই বিবেচিত।
বন্ধুরা, রংধনুর আজকের আসরে আমরা শিয়ালের চতুরতা নিয়ে একটি গল্প শোনাব। গল্পের পর থাকবে শিয়াল সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য। আর সবশেষে থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে শোনা যাক আমাদের আজকের গল্প 'চতুর শিয়াল'। গল্পটি লিখেছেন তাপস রায়।
বাঘ, শিয়াল, বানর, নেউল আর ইঁদুর পাঁচ বন্ধুতে বেজায় ভাব। তারা সারাদিন একসঙ্গে বনে ঘুরে বেড়ায় আর শিকার ধরার চেষ্টা করে। যদিও সব দিন সমান শিকার মেলে না; তারপরও ছোট হোক বড় হোক শিকার করে সবাই মিলে ভাগ করে খায়। শিকারের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। এজন্য ভাগ সব সময় সমান হয়। বাঘের দায়িত্ব শক্তি দিয়ে শিকারকে পরাজিত করা। শিয়াল হলো পরামর্শদাতা। বানরের দায়িত্ব গাছের মগডালে উঠে আশেপাশে শিকার থাকলে দেখে বন্ধুদের জানানো।
আর ইঁদুর? তার দাঁতে বেজায় ধার। শিকার করতে অনেক সময় কাজে লাগে। নেউলও শিকার ধরতে সাধ্যমতো সাহায্য করে। সুতরাং পাঁচ বন্ধু মিলে শিকার করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না।
কিন্তু একদিন সমস্যা হলো এক হরিণ শিকার করতে গিয়ে। এ যে সে হরিণ নয়! তার গায়ে এবং পায়ে ভয়ানক জোর। মাথায় ইয়া বড় শিং! দৌড়ে তাকে ধরতে গিয়ে বাঘ পর্যন্ত ফেল্টুস হলো। হরিণের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে বেচারা বাঘ ঘেমে অস্থির, দম আসে আর যায় এমন অবস্থা!
বানর এমনিতেই নিরামিষভোজী। মাংস সে খায় না বললেই চলে। সুতরাং বাঘের পরাজয় দেখে সে আগেই হাল ছেড়ে দিয়ে গাছের ডালে উঠে বসে রইল। শিয়াল হরিণের শিং দেখে আগেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সে সেদিনের মতো হরিণের পিছু না নিয়ে বন্ধুদের ডেকে আলোচনায় বসল।
শিয়াল বলল, এভাবে হরিণকে পরাস্ত করা যাবে না। হরিণ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তাকে আক্রমণ করতে হবে। প্রথমেই ইঁদুর হরিণের পায়ের রগ কেটে দিবে। তাহলে হরিণ আর দৌড়াতেও পারবে না, শিং বাকিয়ে তেড়েও আসবে না। তারপর বাঘ গিয়ে হরিণের ঘাড় মটকে দিলেই কেল্লাফতে।
পরিকল্পনাটা সবার পছন্দ হলো। কিন্তু হরিণ কখন ঘুমাবে, কোথায় ঘুমাবে এটা জানাবে কে? শিয়াল এ দায়িত্ব বানরকে দিল। বানর গাছের উপর থেকে হরিণের উপর লক্ষ রাখবে।
সব শুনে বাঘ বলল, তবে তাই হোক। ইঁদুর বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই হোক। নেউল বলল, ঠিক ঠিক তাই হোক।
পরদিন পরিকল্পনা অনুযায়ী ইঁদুর যখন ঘুমন্ত হরিণের পায়ের রগ কেটে দিল তখন কাছাকাছি ঝোঁপের আড়াল থেকে বাঘ হুঙ্কার দিয়ে বেড়িয়ে এসে আহত হরিণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বেচারা হরিণ! মৃত্যুর আগে লড়াই করার সময়টুকু পেল না।
এবার বন্ধুদের আনন্দ দেখে কে! শিয়াল নাচতে নাচতে বলল, এই শিকারের জন্য আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি। এবার তোমরা সবাই ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে এসো। আমি ততক্ষণ এটাকে পাহাড়া দিচ্ছি। তোমরা ফিরে এলে একসঙ্গে মজা করে আজ হরিণের মাংস খাব।
সবাই হাত-মুখ ধোয়ার জন্য চলে যেতেই শিয়াল কখনও ঘাড় উঁচু করে, কখনও কান খাড়া করে পাহাড়া দিতে লাগল। ভাবটা এমন সে দায়িত্ব পালনে কোনো ত্রুটি করছে না। একটু পর বাঘ হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে আসতেই দেখল, হরিণ মুখ ভার করে বসে আছে। বাঘ বলল, বন্ধু কী ব্যাপার, আজ এই আনন্দের দিনে তোমার মুখ ভার কেন?
শিয়াল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, সেকথা শুনে আর কী করবে বন্ধু?
বাঘ বলল, তারপরও তুমি বলো।
শিয়াল বলল, বাদ দাও সেকথা। তুমি হরিণের মাংস খাও। আমি যাই।
বাঘ আশ্চর্য হয়ে বলল, কেন?
শিয়াল এবার কেঁদেই ফেলল। বলল, 'সেদিনের পিচ্চি ইঁদুর বলে কিনা এই হরিণ শিকারে তোমার কোনো অবদানই নেই। একথা শোনার পর মনটা এতো খারাপ হয়ে গেল যে এই হরিণের মাংস আমার ছুঁয়ে দেখতেও আর ইচ্ছে করছে না। পাজি ইঁদুর তোমার কী বদনামটাই না করল!'
একথা শুনে বাঘ তো রেগে টং। হুঙ্কার দিয়ে বলল, 'বটে! তুমি দাঁড়াও, আমি এখুনি আরো দশটা হরিণ মেরে আনছি। তারপর আমরা ঐ হরিণের মাংস খাবো।'
একথা বলে বাঘ চলে যেতেই ইঁদুর এসে উপস্থিত। ইঁদুরকে দেখে শিয়াল ব্যস্ত হয়ে তার কাছে এগিয়ে এসে বলল, 'ভাই ইঁদুর তুমি বাঘকে কী বলেছ? বাঘ ভীষণ রেগে আছে। আমি তাকে অনেক বোঝালাম কিন্তু তার রাগ কিছুতেই কমছে না। তার সামনে পরলে আজ আর তোমার রক্ষা নাই।'
সব শুনে ইঁদুর এমন ভয় পেল যে লেজ গুটিয়ে এক দৌড়ে গর্তে ঢুকে পড়ল। ইঁদুর গর্তে লুকানোর পর বানর এলো। বানরকে দেখে শিয়াল বলল, 'বন্ধু খবর খুব খারাপ! বাঘ এইমাত্র তোমাকে খুঁজতে বের হলো। বলল, আজ নাকি তার হরিণ খেতে ভালো লাগছে না। আজ সে বানরের মাংস খাবে। বন্ধু হয়ে কেউ বন্ধুকে খায়? ছি ছি ছি। আমি তাকে কত বুঝালাম কিন্তু কিছুতেই সে আমার কথা শুনল না। সময় থাকতে বন্ধু তাড়াতাড়ি পালাও।'
একথা শুনে বানর এমন ভয় পেল যে এক লাফে গাছের ডাল ধরে ঝুলতে ঝুলতে চম্পট দিল। বানর চলে যেতেই ধূর্ত শিয়াল গায়ে হরিণের রক্ত, ধুলোবালি মেখে মাটিতে আঁচড় কাটতে লাগল। তারপর চোখ লাল করে বিকট ভেংচি দিয়ে বসে রইল।
নেউল হাত-মুখ ধুয়ে এসে দেখে একী বিষম কাণ্ড! নেউল যতই শিয়ালকে বলে, কী হয়েছে? শিয়াল ততই ভেংচি কেটে, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে নেউলের দিকে তেড়ে আসে। শেষে নেউল অনেক মিনতি করে বলল, ভাই কী হয়েছে বলোই না?
এবার শিয়াল নাক ফুলিয়ে, চোখ পাকিয়ে বলল, বাঘ পালাল, বানর পালাল এখন নেউল বলে কি না, কী হয়েছে? এবার তোমার পালা। সময় থাকতে পালাও। নইলে ওদের মতো মেরে তোমাকেও...
শিয়ালের এমন রাগী চেহারা দেখে নেউল আগেই ভয় পেয়েছিল। এখন সব শুনে বলল, হরিণের মাংস আমার দরকার নেই ভাই, আমি চললাম।
এভাবে একে একে সবাই চলে যেতেই শিয়াল আরাম করে হরিণের মাংস খেতে বসল। সে একবার মাংসে কামড় দেয় আর হো হো করে হেসে ওঠে। চতুর শিয়ালের আনন্দ আর ধরে না!
শিয়াল সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য
শিয়াল হচ্ছে কুকুর ও নেকড়ের জাতভাই এবং এর সবাই ক্যানিডি পরিবারের সদস্য। পৃথিবীতে তিন প্রজাতির শিয়াল আছে। কালো-পিঠ ও পাশ-ডোরা প্রজাতির শিয়াল আফ্রিকার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোতে বাস করে। আর সোনালি বা এশীয় প্রজাতির বিস্তৃতি- পূর্ব ইউরোপ, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত। আমাদের দেশের শিয়াল পণ্ডিত এই এশীয় প্রজাতিভুক্ত।
শিয়াল দেখতে নেকড়ের মতো হলেও আকারে কুকুরের চেয়ে কিছুটা ছোট; অনেকটা দেশি নেড়ি কুকুরের সমান। এদের মুখ লম্বাটে। লেজ ফোলা এবং সব সময় নিচের দিকে নামানো থাকে। গায়ের রং গাঢ় বাদামি, দেহের ওপরের অংশ কালচে আর নিচের অংশ হালকা বাদামি, যা অনেকটা সাদাটে দেখায়। মুখমণ্ডলের নিচ থেকে গলা পর্যন্ত অংশটি সাদাটে। গলায় একটা সাদা মালার মতো আছে। লেজ বাদে প্রাপ্তবয়স্ক একটি শিয়াল ৬০-৭৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়; লেজের দৈর্ঘ্য হয় ২০-২৮ সেন্টিমিটার। দাঁড়ানো অবস্থায় ঘাড় বরাবর উচ্চতা হয় ৩৫-৪০ সেন্টিমিটার। ওজনে এরা ৭-১১ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
শিয়াল খোলামেলা অঞ্চলের বাসিন্দা। দিনে সাধারণত ঝোপঝাড় বা গর্তে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যার পর শিকারে বের হয়। সন্ধ্যারাত ও ভোররাতে উচ্চস্বরে হুক্কা হুয়া বা কেক-কেক-কা-হু স্বরে ডাকে। এরা একাকী, জোড়ায় বা দলে থাকে। অনেক সময় বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে দল বেঁধে দিনের বেলায়ও বেরোয়।
শিয়াল মূলত মাংশাসী হলেও এরা সর্বভুক প্রাণী। ইঁদুর, পাখি, হাঁস-মুরগি, গুইসাপ, সাপ, কাঁকড়া, মাছ ইত্যাদি খেয়ে থাকে। শকুন, চিল বা অন্যান্য শিকারি প্রাণীর শিকারের উচ্ছিষ্টাংশ, মরা-পচা প্রাণী, ডাস্টবিনের ময়লা খাবার, এমনকি কবর খুঁড়ে মরা লাশও খেয়ে থাকে। এ ছাড়া ভুট্টা, আখ, তরমুজ, আম-কাঁঠাল, খেজুরের রস—এসবও খায়। শিয়াল বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে কুকুর-ছাগল-ভেড়ার বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায়। এরা কুকুরকে বেশ ভয় পায়।
চালাক-চতুর হলেও শিয়াল কিছুটা ভীতু স্বভাবের। এদের ঘ্রাণশক্তি প্রবল। লেজের নিচের দিকের গ্রন্থির দুর্গন্ধ দিয়ে শত্রুদের তাড়ায়। এরা দ্রুতগতির প্রাণী; কুকুরের চেয়েও দ্রুত দৌড়ায়।
কুকুরের মতো শিয়ালও জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আর তাই পাগলা কুকুরের মতো পাগলা শিয়ালের কামড়েও মানুষ বা অন্যান্য পশুর জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিয়াল মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বাস করে। বছরে দু'বার বাচ্চা দেয়। স্ত্রী শিয়াল ৫৭-৭০ দিন গর্ভধারণের পর চার থেকে ছয়টি বাচ্চা দেয়। প্রায় ১২ দিনে বাচ্চার চোখ ফোটে। চোখ ফোটার পর বাচ্চারা গর্তের বাইরে এসে যখন খেলা করে, দেখতে বেশ লাগে। এরা সাধারণত ১০-১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে।
বন্ধুরা, শিয়ালের মতো ধূর্ত না হয়ে চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে নিজেকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নিজকে গড়ে তুলতে হলে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়তে হবে তারপর নাশতা করে পড়াশোনা শুরু করতে হবে। এতে মনটা যেমন ভালো হবে তেমনি মহান আল্লাহও খুশি হবেন।#