রমজান: খোদাপ্রেমের বসন্ত (পর্ব- ২)
গত পর্বে আমরা বলেছিলাম মহানবী (সা) বলেছেন, পবিত্র রমজানের সবচেয়ে ভালো আমল হল পাপ বর্জন করা।
আমরা পাপ করি দুই কারণে। প্রথমত: কিসে পাপ হয় তা জানা নেই অথবা জানা থাকা সত্ত্বেও মহান আল্লাহর প্রতি যথেষ্ট ভয়, প্রেম ও লজ্জা না থাকায়। তাই মহান আল্লাহ আমাদের সব কাজ জানেন ও দেখছেন বলে জানা সত্ত্বেও তাঁকে আমরা ভয়ও করি না বা লজ্জাও পাই না! অর্থাৎ আল্লাহকে আমরা পাপ করার সময় শিশুর চেয়েও কম গুরুত্ব দিচ্ছি। বলা হয় কোনো পাপকে ক্ষুদ্র মনে করা হলে তা আল্লাহর দরবারে বড় পাপ হিসেবেই ধরা হয়। আমরা কি কেউ অতি অল্প পরিমাণ মল-মুত্রও খেতে রাজি হব, কিংবা তীব্র ক্ষমতা-সম্পন্ন বিষ অল্প পরিমাণেও খেতে রাজি হব?
সামান্য আগুন যেমন বিশাল খড়ের পাহাড় বা বনকে জ্বালিয়ে দেয়, তেমনি সামান্য পাপও পুরো ঈমানকে বরবাদ করে দিতে পারে। কারণ, যে মুহূর্তে মানুষ পাপ করে সেই মুহূর্তের জন্য মানুষ এক ধরনের কুফরিতে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে এই কুফরি বাড়তেই থাকে মনের দিক থেকে বাধা না পাওয়ার কারণে। গোনাহ বর্জনের জন্য দরকার দৃঢ়তা বা আত্ম-বিশ্বাস, অনুশীলন ও অধ্যবসায়।
রমজান মাসে গোনাহ বর্জনের অনুশীলন করা সহজ। কারণ, এ মাসে অনেক বৈধ কাজেও সংযম পালনের চর্চা করা হয়।
পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুহাম্মাদ মুনির হুসাইন খান বলছেন :
সকল মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মাস মাহে রমযানঃ
মহানবী (সা:) বলেছেন: রমযান মাস হচ্ছে সকল মাসের নেতা (সেরা) এবং ক্বদরের রাত ( শব-ই ক্বদর) হচ্ছে সকল রাতের নেত্রী।

এবারে পবিত্র রমজানের নানা ফজিলত সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা)'র একটি বিখ্যাত ভাষণের কিছু অংশ শোনা যাক। মহানবী বলেছেন,
“হে মানুষ! নিঃসন্দেহে তোমাদের সামনে রয়েছে বরকত, রহমত বা অনুগ্রহ ও ক্ষমার মাস। এ মাসের দিনগুলো সেরা দিন, রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং ঘণ্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘণ্টা। এ মাসে তোমরা আমন্ত্রিত হয়েছ আল্লাহর মেহমান হতে তথা রোজা রাখতে ও প্রার্থনা করতে। তিনি তোমাদেরকে এ মাসের ভেতরে সম্মানিত করেছেন। এ মাসে তোমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস মহান আল্লাহর গুণগানের বা জিকরের সওয়াবের সমতুল্য; এ মাসে তোমাদের ঘুম প্রার্থনার সমতুল্য, এ মাসে তোমাদের সৎকাজ এবং দোয়াগুলো কবুল করা হবে। তাই মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিক ও (পাপ ও কলুষতামুক্ত) পবিত্র চিত্তে প্রার্থনা করো যে তিনি যেন তোমাদেরকে রোজা রাখার এবং কুরআন তিলাওয়াতের তৌফিক দান করেন।" মহানবী (সা.) আরও বলেছেন,
"নিঃসন্দেহে সে ব্যক্তি প্রকৃতই হতভাগ্য যে রমজান মাস পেয়েও মহান আল্লাহর ক্ষমা হতে বঞ্চিত হয়। এ মাসে ক্ষুধা-তৃষ্ণার মাধ্যমে শেষ বিচার-দিবসের ক্ষুধা- তৃষ্ণার কথা স্মরণ কর। অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদের সাহায্য কর ও সদকা দাও। বয়স্ক ও বৃদ্ধদের সম্মান কর এবং শিশু ও ছোটদের আদর কর। সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা কর (রক্তের সম্পর্কের) আত্মীয়-স্বজনের সাথে। তোমাদের জিহ্বাকে অনুপযোগী কথা বলা থেকে সংযত রাখ, চোখকে ঢেকে রাখ নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখা থেকে, কানকে নিবৃত রাখ ক্ষতিকর কথা শোনা থেকে। ইয়াতিমদেরকে দয়া কর যাতে তোমাদের সম্ভাব্য ইয়াতিম সন্তানরাও যেন দয়া পায়।
গোনাহর জন্যে অনুতপ্ত হও ও তওবা কর এবং নামাজের সময় মুনাজাত কর হাত উপরে তুলে, কারণ নামাজের সময় দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়, এ সময় মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান, এ সময় কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন, কেউ তাঁকে ডাকলে তিনি জবাব দেন, কেউ কাকুতি-মিনতি করলে তা তিনি গ্রহণ করেন।"
রমজানের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বিশ্বনবী (সা.) আরও বলেছেন, "হে মানুষ! তোমরা বিবেককে কামনা-বাসনার দাসে পরিণত করেছো, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে একে মুক্ত করো। তোমাদের পিঠ গোনাহর ভারে নুয়ে আছে, তাই সিজদাগুলোকে দীর্ঘ করে পিঠকে হালকা করো। মহান আল্লাহ নিজ সম্মানের শপথ করে বলেছেন, রমজান মাসে নামাজ আদায়কারী ও সিজদাকারীদেরকে জবাবদিহিতার জন্য ধরা হবে না এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। তোমাদের কেউ যদি কোনো মুমিনের জন্য ইফতারের আয়োজন করে তাহলে আল্লাহ তাকে একজন গোলামকে মুক্ত করার সওয়াব দান করবেন এবং তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করবেন।"
বিশ্বনবীর সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন: কিন্তু আমাদের মধ্যে সবাই অন্যদেরকে ইফতার দেয়ার সামর্থ্য রাখেন না। বিশ্বনবী (সা.) বললেন: তোমরা দোযখের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা কর, যদিও তা সম্ভব হয় একটি মাত্র খুরমার অর্ধেক অংশ কিংবা তাও না থাকলে সামান্য পানি অন্য রোজাদারকে ইফতার হিসেবে আপ্যায়নের মাধ্যমে।" #

পার্সটুডে/এমএএইচ/মো.আবুসাঈদ/০২