রংধনু আসর: বোকা বাঘ ও চালাক হরিণ
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আজকের আসরের শুরুতেই থাকছে বাঘ, হরিণ ও গাধাকে নিয়ে দুটি গল্প। প্রথমেই থাকবে 'বোকা বাঘ ও চালাক হরিণ' শীর্ষক একটি গল্প। এটি লিখেছেন আব্দুস সালাম। এরপর থাকবে হরিণ ও গাধার তর্কাতর্কি নিয়ে বাংলাদেশে প্রচলিত একটি গল্প। এটি লিখেছেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। গল্প দুটির পর থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।
এক দেশে বড় একটি বন ছিল। সেই বনে হিংস্র বাঘসহ অনেক পশু-পাখি বাস করত। বনটির একটি অংশ ছিল ঘন সবুজ ঘাস ও লতা-পাতায় পরিপূর্ণ। কোনো কোনো ঘাস ছিল বেশ লম্বা আকৃতির। এর আশপাশে সবসময় হরিণ ও বাঘের আনাগোনা থাকত। নরম-কচি ঘাস খাওয়ার জন্য হরিণগুলো সেখানে প্রায়ই যেত। আর বনের বাঘগুলো তার পাশে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকত। তারা সুযোগ পেলেই হরিণদের ঘাড় মটকে দিত। বাঘের আকস্মিক আক্রমণের প্রস্তুতির বিষয়টি হরিণগুলো মোটেও টের পেত না।
হরিণরা একে একে বাঘের পেটে যেতে লাগল। ফলে দিন দিন তাদের সংখ্যা কমতে থাকে। কীভাবে বাঘের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া যায় সে বিষয়ে আলোচনা করার জন্য হরিণগুলো একদিন একত্র হয়। তারা সকলে একটা বৃদ্ধ হরিণকে দায়িত্ব দিল একটি সুন্দর উপায় বের করার জন্য।
বৃদ্ধ হরিণটি খুব বুদ্ধিমান ও সাহসী ছিল। সে তার কাজে সহযোগিতা করার জন্য অন্য একটি অল্প বয়সী হরিণের সাহায্য নিল। তারা দুজনে একটা উপায় বের করার জন্য নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করল। তারা বাঘদের ভয় দেখানোর জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত নিল। বাঘ যেন ভয় পেয়ে বন ছেড়ে চলে যায়।
কৌশলটি হলো- তারা গায়ে রং মেখে ঘাস খেতে যাবে। কীভাবে বাঘ শিকার করবে সে নিয়ে তারা আলোচনা করতে থাকবে। যাতে আশপাশে বাঘ থাকলে শুনতে পায়। প্রয়োজনে আক্রমণ করার ভান করে বাঘের দিকে এগিয়ে যাবে। এতে নিশ্চয় বাঘ ভয় পাবে। পরবর্তীতে কী করা যাবে তা আলোচনা করে তারা ঠিক করবে।
পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক হরিণ দুটি গায়ে লাল, নীল ও সবুজ রং মেখে ঘাস খেতে সবুজ মাঠে গেল। খুব সতর্কভাবে হরিণ দুটি মাঠে ঘোরাফেরা করছে। কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ হরিণটি দূর থেকে দেখতে পেল একটি বাঘ চুপি চুপি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কিছুক্ষণ পর বাঘটিকে আর দেখা গেল না।
বৃদ্ধ হরিণটি বুঝতে পারল যে, তাদের আশপাশেই বাঘটি লুকিয়ে আছে। অল্প বয়সী হরিণটি একটু ভয় পেয়ে গেল। বৃদ্ধ হরিণটি তাকে অভয় দিল। এদিকে বাঘটিও হরিণ দুটির কাছাকাছি এসে খুব অবাক তাদের দেখতে লাগল। এ রকম অদ্ভুদ প্রাণী এই বনে তারা আগে কখনো দেখেনি। কোনোভাবেই সে তাদের চিনতে পারল না। ফলে বাঘটি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। ঘাসের ওপর বসে বসে নানান কথা ভাবতে লাগল।
হরিণ দুটিও তাদের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে জোরে জোরে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলা শুরু করল। যাতে আশপাশে বাঘটি থাকলে শুনতে পায়। বৃদ্ধ হরিণ অন্য হরিণকে বলছে : কিছুক্ষণ আগে এদিকে একটি বাঘ আসতে দেখলাম। কোথায় যে গেল! নিশ্চয় লুকিয়ে আছে। ভাবলাম, বাঘটাকে মজা করে খাব। কিন্তু কোনোভাবেই তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। না, বাঘ খাওয়ার সাধ যে আমার আর পূর্ণ হলো না! কতদিন বাঘ খাইনি! আহা হা হা! বাঘের মাংসের কী যে স্বাদ! বাঘ দেখলে জিবে জল চলে আসে।
অল্পবয়সী হরিণটিও কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে বলল : ঠিকই বলেছ। কত পশুপাখি খেলাম। বাঘের মাংসের মতো স্বাদ আর কোনো পশুপাখির মাংসে পাইনি। বাঘের মাংসের স্বাদ যে মোটেও ভুলবার নয়। এই বনে অনেক বাঘ আছে। এদের সবগুলোকে যেভাবেই হোক খেতেই হবে।
হরিণ দুটির কথা শুনে বাঘটি মনে মনে একটু ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু সে নড়াচড়া করার সাহস পেল না। চুপ মেরে বসে থাকল। বাঘের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে বৃদ্ধ হরিণ হঠাৎ করে বলে উঠল : বাঘের গন্ধ নাকে ভেসে আসছে। মনে হয় বাঘটি আশপাশেই লুকিয়ে রয়েছে। চল তো একটু খুঁজে আসি।
হরিণ দুটির কথা শুনে বাঘটি এবার সত্যি সত্যিই বেশি ভয় পেয়ে গেল। সে ভাবল, এখানে আর মোটেও থাকা ঠিক হবে না। হরিণ দুটিকে কাছে আসতে দেখে বাঘটি আস্তে আস্তে পিছু হটতে লাগল। আর হরিণরা বুঝতে পারল বাঘটি ভয় পেয়েছে। তাই তারাও দ্রুত বাঘের দিকে এগিয়ে গেল। শেষপর্যন্ত বাঘটি প্রাণের ভয়ে একটা দৌড় দিল।
হরিণ দুটিও কিছুটা পথ বাঘকে ধাওয়া করল। একপর্যায়ে বাঘটি গভীর বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। এরপর সে তাদের আস্তানায় গিয়ে অন্যান্য বাঘের সাথে অদ্ভুত প্রাণীদের বিষয়ে আলোচনা করল। সব ঘটনা শুনে সব বাঘ ভয় পেয়ে গেল। আর তারা অদ্ভুত প্রাণীটির বিষয়ে সতর্ক হয়ে গেল।
এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর হরিণরা দেখল যে, তারা এখনো বিপদ মুক্ত নয়। বাঘেরা সবুজ ঘাসবনের আশপাশে না এলেও বনের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেকোনো সময় আক্রমণ করতে পারে। তাদের প্রাণ যাওয়ার আশঙ্কা রয়েই গেল। তাই সেই বুদ্ধিমান হরিণ সিদ্ধান্ত নিল যে, এই বন এবং বনের আশপাশের এলাকা যেভাবেই হোক বাঘমুক্ত করতে হবে। তাই তারা আবার আগের মতো গায়ে লাল, নীল ও সবুজ রং মেখে জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করল।
কয়েকটি বাঘ দূর থেকে তাদের দেখে চিনতে পারল। এরাই সেই অদ্ভুদ প্রাণী যাদের কথা কয়েক দিন আগেই শুনেছে। ভয়ে তারা যে যেখানে পারল লুকিয়ে পড়ল। বাঘের লুকানো দেখে হরিণ দুটি খুশি হলো আর বৃদ্ধ হরিণটি বলতে থাকল, এতদূর এসেও কোনো বাঘকে দেখতে পেলাম না। আমার যে আর তর সইছে না। বাঘ যে আমার খেতেই হবে। ঠিক আছে এখন ফিরে যাই। আজ রাতেই আবার আসব। বাঘের আস্তানায় হামলা করব। তারপর দেখব বাঘগুলো কোথায় পালায়। এসব কথা বলতে বলতে হরিণ দুটি নিজের এলাকায় ফিরে এলো।
হরিণের চলে যাওয়ার পর বাঘগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু করল। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, আজই এই বন ছেড়ে পালাতে হবে। নইলে তাদের আর রক্ষা নেই। সকলকে ওদের পেটের মধ্যে ঢুকতে হবে। তাই আর দেরি না করে সন্ধ্যার আগেই বাঘগুলো এই বন ছেড়ে অন্য বনে চলে গেল। আর কোনো দিন ফিরে আসেনি।
এদিকে হরিণ দুটি ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে দেখল যে, শুধু বনের ভেতরে কেন বনের আশপাশেও কোনো বাঘের অস্তিত্ব নেই। এটা জেনে সকল হরিণ ভীষণ খুশি হলো। তারা বুদ্ধিমান হরিণ দুটিকে পুরস্কৃত করল। হরিণদের মতো অন্যান্য পশুপাখিও খুশি হলো। তাদের আর কোনো চিন্তা থাকল না। নির্ভয়ে তারা বনের মধ্যে চলাফেরা করতে থাকল। এভাবে মাংসাশী প্রাণী বাঘের অত্যাচার থেকে মুক্ত হয়ে সকলে বনের মধ্যে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করতে থাকল।

হরিণ ও গাধার তর্ক
এক গাধার সঙ্গে হরিণের বন্ধুত্ব হয়েছে। দুজন একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। মাঠের সবুজ ঘাস মজা করে খায়। বনের ধারে বসে গল্প করে। রাতের বেলা পাশাপাশি শুয়ে ঘুমায়। ভারি আনন্দে সময় কাটে তাদের।
একদিন সকালবেলা মাঠের ধারে এসে গাধা হরিণকে বলল, ‘দেখ, মাঠের ঘাসগুলো কী হলুদ!’
হরিণ মাঠের দিকে তাকাল। তাকিয়ে অবাক হলো। কোথায় হলুদ? ঘাস তো সবুজ! কচি ঘাস। কচি ঘাস সবুজই হয়। ঘাস হলুদ হয় মরে শুকিয়ে গেলে।
গাধা বলল, ‘না, মাঠের সব ঘাস হলুদ। ভালো করে দেখ।’
হরিণ বলল, ‘আমি ভালো করেই দেখছি। আমার চোখে কোনো সমস্যা নেই। মাঠের সব ঘাস সবুজ।’
গাধা বলল, ‘না, হলুদ। আমার চোখেও সমস্যা নেই। আমি পরিষ্কার দেখছি, ঘাসগুলো হলুদ।’
হরিণ বলল, ‘না, সবুজ।’
এই তর্ক চলল অনেকক্ষণ। একসময় হরিণ বলল, ‘চল তাহলে বনের রাজা সিংহের কাছে যাই। তাঁকে গিয়ে বলি। তিনি এসে মাঠের ঘাস দেখে বলুন, ঘাস হলুদ না সবুজ।'
গাধা রাজি। ‘হ্যাঁ, চল।’
গাধা আর হরিণ সিংহের কাছে এল। সিংহ তার দরবারে বসে আছে। সঙ্গে আছে মন্ত্রীরা। সিংহের মন্ত্রীরা হচ্ছে বাঘ, চিতা, শিয়াল, অজগর, মোষ এ-রকম কিছু জীব। হরিণ আর গাধাকে দেখে সিংহ বলল, ‘কী সমস্যা?’
হরিণ বলল, ‘হুজুর, আমরা একটা বিচার নিয়ে এসেছি।’
সিংহ বলল,‘কী হয়েছে? কিসের বিচার?’
গাধা বলল, ‘আমি বলেছি মাঠের ঘাসগুলো হলুদ আর হরিণ বলছে সবুজ। কার কথা ঠিক আপনি বিচার করুন, হুজুর।’
সিংহ বাঘ ও শিয়ালের দিকে তাকাল। ‘এই, তোরা দুজন যা। গিয়ে দেখে আয় মাঠের ঘাস হলুদ না সবুজ।’
বাঘ আর শিয়াল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এক্ষুণি যাচ্ছি, হুজুর।’
মাঠের ঘাস দেখে এসে বাঘ আর শিয়াল দুজনই বলল, ‘হুজুর, ঘাস সবুজ। একটাও হলুদ বা শুকনা ঘাস নেই।’
হরিণ আনন্দে লাফিয়ে উঠল। গাধার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এবার বল, কার কথা সত্য?’
হরিণের কথা শুনে গাধা চুপ করে রইল। হরিণ হাসিমুখে সিংহের দিকে তাকাল।
সিংহের দরবারে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব অজগরের। অপরাধীকে প্যাঁচ দিয়ে ধরে সে হাজতখানায় নিয়ে যায়। কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে, অজগর তাকে প্যাঁচ দিয়ে ধরে, শ্বাস বন্ধ করে মেরে ফেলে।
সিংহ অজগরের দিকে তাকিয়ে বলল, 'হরিণটাকে তিন মাসের কারাদণ্ড দাও।’
এই আদেশ শুনে হরিণ তো অবাক হলোই, দরবারের অন্যরাও অবাক। হরিণকে কেন কারাদণ্ড দেওয়া হবে? সে তো সত্য কথা বলেছে! মাঠের ঘাস তো সবুজই!
হরিণ কাতর স্বরে বলল, ‘হুজুর, আমাকে কেন শাস্তি দিচ্ছেন? আমি তো সত্য কথাই বলেছি! মাঠের ঘাস যে সবুজ আপনার দুই মন্ত্রীও তা দেখে এসেছেন।’
সিংহ গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমি জানি তুই সত্য কথা বলেছিস। মাঠের ঘাস সবুজ।'
হরিণ বলল, 'তাহলে হুজুর আমি কেন শাস্তি ভোগ করব?’
সিংহ বলল,‘শাস্তি ভোগ করবি এই জন্য যে তুই একটা গাধার সঙ্গে তর্ক করেছিস।'
বন্ধুরা, গল্পটি শুনলে। এ গল্প থেকে আমরা শিখতে পারলাম, মুর্খদের সঙ্গে তর্ক করা যাবে না। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা ফুরকানের ৬৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন,
“তারাই পরম দয়াময়ের বান্দা যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা জবাব দেয়- সালাম।”
আল্লাহপাক আরও বলেছেন, "আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোল, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাক।" (আরাফ:১৯৯)#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।