কুহরাং ইরানের অপরূপ প্রকৃতির শহর
বন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। 'ইরান ভ্রমণ' শীর্ষক সাপ্তাহিক আসরে স্বাগত জানাচ্ছি। বলেছিলাম যে, বিশাল একটি দেশ ইরান।
এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা ইরানের নামকরা প্রদেশ চহর মাহলে বাখতিয়রির কয়েকটি শহর ঘুরে ঘুরে দেখেছি। চহর মাহলে বাখতিয়রি ইরানের একটি রূপকথার শহর। এখানে রয়েছে লোক সাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। লোকসাহিত্য বিষয়টা একটু ভিন্নরকম মনে হচ্ছে? হ্যাঁ বলছি। মৌখিক ধারার সাহিত্য যা অতীত ঐতিহ্য ও বর্তমান অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে রচিত হয় সেটাই লোকসাহিত্য। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে একটি সংহত সমাজ মানস থেকে এর উদ্ভব। সাধারণত অক্ষরজ্ঞানহীন পল্লিবাসীরা স্মৃতি ও শ্রুতির ওপর নির্ভর করে এর লালন করে।
গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে চহর মাহলে বাখতিয়রি প্রদেশটির একটি অংশে হাফত লাঙ নামক বাখতিয়রি উপজাতিদের একটি গোত্র বসবাস করত। ইরানে বহু উপজাতীয় গোত্র রয়েছে। বাখতিয়রি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গোত্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। বর্ণগত দিক থেকে বাখতিয়রি উপজাতিটি অনেকটাই লোরদের মতো। তাদের ভাষাভঙ্গিও ফার্সি ভাষার সবচেয়ে প্রাচীন এবং পরিচিত ভাষাভঙ্গির মতো সমৃদ্ধ। যাই হোক আজকের আসরে আমরা এই প্রদেশের আরও দুটি শহরে ঘুরে বেড়ানোর চেষ্টা করবো। একটি হলো কুহরাং শহর অপরটি চেলগার্দ শহর। চমৎকার এই শহরগুলোতে বেড়াতে আপনাদের ভালো লাগবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

উপজাতীয়দের জীবন যাপন পদ্ধতি বিশেষ করে বাখতিয়রি উপজাতীয়দের কথা বলছি, তাদের বাড়িঘর দুয়ার এবং বসবাসের আদর্শ, তাদের বিশেষ নিয়ম কানুন ও আচার প্রথা সবই দেশি বিদেশি ভ্রমণকারীদের কিংবা পরিদর্শনকারীদের ভালো লাগার প্রধান কারণ। জাগরোস পর্বতের উচ্চতায় কী করে এই উপজাতীয়রা অবাক করা রাস্তা দিয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করে তা দেখলে আপনি অবাক হবেন। জাগরোস পর্বতের প্রাণসঞ্চারি এই উপজাতীয়দের সংস্কৃতি আর এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভোলার মতো নয়। তাদের দেখার জন্য এবং তাদের জনজীবনের সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য উত্তম হলো কুহরাং এবং চেলগার্দ শহরের দিকে পাড়ি দেওয়া। কেননা এই দুই শহরেই বাখতিয়রি উপজাতিদের সবচেয়ে বড় সংখ্যক জনবসতি গড়ে উঠেছে। বৃহৎ জনসংখ্যাবহুল বাখতিয়রি উপজাতিয় এই গোত্রটির নাম হলো হাফত লাঙ।
এখানকার প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম সৌন্দর্যকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলেছে বাখতিয়রি উপজাতীয়দের সযত্ন শ্রম ও আন্তরিকতা। সৌন্দর্যপ্রিয় প্রকৃতিপ্রেমি এই উপজাতীয় এলাকা দেখার জন্য তাই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে প্রায় সারাবছর। জাগরোসের পার্বত্য উচ্চতায় জমাট বরফ আর প্রবহমান পানির ফোয়ারা এবং সেইসঙ্গে প্রচুর ঝরনাধারার নিরন্তর পতনের সৌন্দর্যের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে সবুজ শ্যামল এক অসাধারণ প্রকৃতি। এই প্রকৃতিকে কেবল বেহেশতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গেই তুলনা করতে পারে রসিক কবিরা।
বলছিলাম অপরূপ প্রকৃতির শহর কুহরাং এবং চেলগার্দ নিয়ে। এ এলাকার বিখ্যাত একটি প্রাকৃতিক ফোয়ারার নাম হলো কুহরাং ফোয়ারা। জার্দকুহ পার্বত্য উপত্যকা এই ফোয়ারার উৎস। এই ফোয়ারার পানি আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মিশে গেছে কুহরাং হ্রদে। তারপর সেখান থেকে কুহরাঙের প্রথম টানেল হয়ে জয়ান্দে রুদ নদীতে গিয়ে মিশেছে। একদিকে ফোয়ারার আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং এ এলাকায় উপজাতীয়দের উপস্থিতি সমগ্র কুহরাঙের পরিবেশের সৌন্দর্যকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাখতিয়রি উপজাতীয়রা শীতের সময় খুজিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রান্তর আর গ্রীষ্মকালে চহর মাহলে বাখতিয়রি এলাকার পশ্চিম অংশে বসবাস করে।
বাখতিয়রি উপজাতীয়রা প্রতি বছরই ইরানি সৌরবর্ষের দ্বিতীয় মাস উর্দিবেহেশতের শেষের দিকে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পথে জাগরোস পর্বতমালার পাদদেশে গিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে এবং চার মাসের মতো এখানেই তারা বসবাস করে। দুর্গম পথের কষ্টকে উপেক্ষা করে নদী আর জার্দকুহের পার্বত্য উপত্যকার মতো বিচিত্র প্রতিবন্ধকতাকে পায়ে দলে এই যাত্রায় তারা পা রাখে। তারা সেখানকার সবুজ চারণভূমিতে দুম্বাসহ আরও বহুরকমের গৃহপালিত পশু চরিয়ে জীবন জীবিকার সন্ধানে জড়িয়ে পড়ে। তাদের এই জীবনযাপন পদ্ধতি, জীবিকার আয়োজনে দেওয়া শ্রম ও কর্ম, বসবাসের আয়োজন, নিজেদের মন-মানস ও বিশ্বাস, তাদের আচার-প্রথা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ইত্যাদি দেখার মতো, উপভোগ করার মতো বিষয়। বাখতিয়রি উপজাতীয় নারী-পুরুষেরা বিচিত্র রঙের পোশাক আশাক পরে। তাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হলে কিংবা তাদের নিজস্ব কিছু সামাজিক প্রথার সঙ্গে পরিচয় ঘটলে খারাপ লাগার কথা নয়।
বলছিলাম বাখতিয়রি উপজাতীয় নারী-পুরুষেরা বিচিত্র রঙের পোশাক আশাক পরে ঘুরে বেড়ায়। পাহাড়ের পাদদেশের আপাত সমান্তরালে তারা কালো রঙের তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করে। দর্শনার্থী কিংবা পর্যটকেরা কৌতূহলবশত এইসব তাঁবু দেখতে গেলে বাখতিয়রি নারী-পুরুষেরা যেভাবে অতিথি আপ্যায়ন করে সেটা খুবই উপভোগ্য একটা ব্যাপার। তারা নিজেদের তৈরি বিশেষ রকমের রুটি দিয়ে এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্য সামগ্রি দিয়ে যেভাবে আদর আপ্যায়ন করে সেটা যে কোনো পর্যটকের স্মৃতিপটে গেঁথে যায় আনমনেই। কুহরাং শহর প্রত্যেক ঋতুতেই আলাদা আলাদা প্রাকৃতিক রূপ পরিগ্রহ করে। প্রতি বছর বসন্তে এখানকার অধোমুখি টিউলিপ ফুলের বাগান বা ক্ষেত দেখতে বহু মানুষ ভিড় জমায়।
টিউলিপ ফুলের এই প্রান্তরটি চেলগার্দ শহর থেকে বারো কিলোমিটার দূরে বানুয়াস্তাকি গ্রামের কাছে অবস্থিত। চেলগার্দ নিয়ে আমরা আজকের আসরে আর কথা বলার মতো সময় পাবো না। রেখে দিলাম পরবর্তী আসরের জন্য। বিচিত্র রঙীন ফুলের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষণ রেখেই আসরের সমাপ্তি টানছি আজ।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।