রংধনু আসর : বানরের সাজা
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা স্বীকার করবে যে, পরিবেশকে সুন্দর রাখা প্রতিটি মানুষের অপরিহার্য দায়িত্ব। পরিবেশকে সুন্দর না রাখলে সুন্দর মানসিকতার সৃষ্টি হয় না। আমাদের চারপাশ যত সুন্দর হবে আমাদের মন মানসিকতাও তত সুন্দর এবং উন্নত হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, 'পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ'। এই হাদিসের আলোকে সুস্থ মন মানসিকতা তৈরির জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই।
তোমাদের মধ্যে অনেকেই আছো যারা পানির বোতল খেয়ে যত্রতত্র ছুঁড়ে ফেলো। কেউ কেউ আবার জুসের প্যাকেট বা কলার খোসা নির্ধারিত স্থানে না রেখে আশপাশে কিংবা রাস্তায় ফেলে দাও। চলার পথে এসব ফেলে রাখলে পরিবেশ যেমন নষ্ট হয় তেমনি দুর্ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার ফলে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এছাড়া এলাকার সৌন্দর্যহানিও ঘটে।
তাই পরিবেশ সুন্দর রাখতে আমাদের সবাইকে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। ময়লা রাখতে হবে বাড়ি, স্কুল, রাস্তাঘাট কিংবা হাট-বাজারের নির্ধারিত জায়গায়।
বন্ধুরা, নির্ধারিত স্থানে ময়লা না রাখার পরিণতি সম্পর্কে আজকের আসরে রয়েছে একটি গল্প। 'বানরের সাজা' শিরোনামের গল্পটি লিখেছেন ফাহিমা কানিজ লাভা। গল্পের পর থাকবে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।
সুন্দরবনে বাস করত এক বানর। সে ছিল খুব দুষ্টু। সারাদিন এ গাছ থেকে সে গাছে লাফিয়ে বেড়াত। আর দুষ্টু সব বুদ্ধি এঁটে বাকি জন্তু-জানোয়ারদের জ্বালাতন করত।
একদিন সে এক কাঁদি কলা নিয়ে বনের রাস্তার ধারে একটা গাছে গিয়ে বসল। সুন্দরবনের একটা সাধারণ নিয়ম ছিল যে কেউ রাস্তায় ময়লা ফেলে অন্যদের হাঁটাচলায় অসুবিধা করতে পারবে না। ময়লা ফেলার জন্য সজারু আর শেয়ালের খুঁড়ে দেওয়া বেশ কয়েকটি গর্ত ব্যবহার করা হতো।
কিন্তু দুষ্টু বানর ওই নিয়ম মানলে তো! কলার খোসায় পা পিছলে কেউ পড়ে গেলে তা দেখে মজা নেবে দুষ্টু বানর, এই তার মতলব। বেশ খানিকটা সময় পরে এক বাঘ আনমনে গান গাইতে গাইতে হেঁটে আসছিল ওই পথ ধরে। সারাদিনের ঘোরাঘুরি আর ভোজন শেষে বাঘ তার গুহায় ফিরছিল। যেই না সে গাছের তলায় এলো, অমনি কলার খোসায় পা পিছলে বেচারা চিৎপটাং! মাটিতে পড়ে গিয়েই বাঘটা চিৎকার করে বলতে লাগল: 'ওরে বাবা গো, মা গো! আমার পা’টা ভেঙে গেল গো! ব্যথায় একেবার মরে যাচ্ছি গো! ওরে দুষ্টু বানর, রাস্তায় কলার খোসা ফেলে তুমি আমার এই হাল করলি! নেমে আয় গাছ থেকে, তোকে মজা দেখাচ্ছি!’
শক্তিশালী বাঘকে এভাবে চিৎকার করতে দেখে ‘হু-হু-হা-হা’ ‘হু-হু-হা-হা’ করে হাসতে শুরু করল দুষ্টু বানর। সে বলল, ‘ল্যাংড়া বাঘের দেমাগ দেখ! হাঁটতে পারছে না, তা-ও কিনা আমাকে শাসাচ্ছে। আগে তো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখা, তারপর না হয় আমাকে ধরিস। হু-হু-হা-হা! হু-হু-হা-হা!’
বানর যখন হাসছিল তখন ভাঙা পা নিয়ে রাস্তায় পড়ে অনেকক্ষণ ব্যথায় কাতরাচ্ছিল বাঘ। একসময় ওই রাস্তা দিয়ে একটা ভাল্লুককে আসতে দেখে বাঘ আশার আলো দেখতে পেল। বাঘ চেঁচাতে লাগল, ‘ও ভাল্লুক ভাই। একটু শুনুন। আমি খুব বিপদে পড়েছি, আমাকে সাহায্য করুন।’
এমন করুণ ডাক শুনে ভাল্লুক ছুটে এলো বাঘের কাছে। ভাল্লুক বলল, ‘কী হয়েছে বাঘ ভাই, আপনি এভাবে উলটে পড়ে আছেন কেন?’
বাঘ তার দুঃখের কথা ভাল্লুককে জানাল। বানর কীভাবে তার এ হাল করেছে, সেই কাহিনী শুনে ভাল্লুকের মনে খুব মায়া হলো। বাঘ বলল, ‘ভাই ভাল্লুক, আপনি যদি আমাকে কষ্ট করে হাসপাতালে পৌঁছে দিতেন, তাহলে খুব কৃতজ্ঞ থাকতাম।’
ভাল্লুক বলল, ‘অবশ্যই। কেউ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করাটাই আরেকজনের দায়িত্ব। আপনি একটু সবুর করুন, আমি আশপাশ থেকে একটা গাড়ি যোগাড় করছি।’
এই বলে ভাল্লুক গাড়ি খুঁজতে চলে গেল। হাসপাতাল ছিল বনের শেষ প্রান্তে, হেঁটে যেতে অনেকটা সময় লাগবে। তার ওপর এতবড় বাঘকে ভাল্লুক কাঁধে করে বেশিদূর নিয়েও যেতে পারবে না। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে একটু দূরে এক ঘোড়াকে পাওয়া গেল, গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাচ্ছিল সে। ভাল্লুকের কাছ থেকে সব শুনে ঘোড়া তার গাড়িতে বাঘকে নিতে রাজি হল। তারপর দুজনে মিলে বহু কষ্টে বাঘকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিল।
হাসপাতালে বসেছিল ডাক্তার হরিণ। রোগীকে দেখে ডাক্তার চশমা কপালে তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘কী সমস্যা রোগীর? পেট খারাপ, না মাথা? নাকি গলায় হাড় ফুটেছে?’
বাঘ কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ডাক্তারমশাই, আমার পা ভেঙে গেছে। দুষ্টু বানর রাস্তায় কলার খোসা ফেলে রেখেছিল, তাতে পিছলে আমার এই দশা। আমার পা ভালো করে দিন ডাক্তারমশাই।’
সব শুনে পা টিপে-টুপে ডাক্তার বললেন, ‘আপনার পায়ের অপারেশন করতে হবে, নইলে জোড়া লাগবে না। তার আগে ব্যথা কমানোর ইঞ্জেকশনও দিতে হবে। তারপর দুই সপ্তাহ হাসপাতালে থাকবেন, একটুও নড়াচড়া করা যাবে না। কিছুদিন ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে হবে।’
ডাক্তার হরিণ ইয়া বড় একটা ইঞ্জেকশন ঢুকিয়ে দিলেন বাঘের শরীরে। তারপর বাঘের পায়ের অপারেশন হলো। পায়ে প্লাস্টার বেঁধে হাসপাতালের বিছানার সাথে সেটাকে ঝুলিয়ে রাখা হলো। দুই সপ্তাহ পর সুস্থ হয়ে বাঘ ক্রাচে ভর দিয়ে আবারও তার গুহায় ফিরে এলো। কয়েকদিন সে গুহাতেই বিশ্রাম নিল।
হাসপাতাল থেকে ফিরেই বাঘ দুষ্টু বানরটার খোঁজ করছিল। যে করেই হোক, বানরটাকে উচিত সাজা দিতে হবে, এই তার পণ। কিন্তু আগে বানরকে তো বাগে পেতে হবে। দুষ্টুটাকে ধরা তো চাট্টিখানি ব্যাপার না!
গুহায় বসে বাঘ এক ফন্দি আঁটল। সুস্থ হতেই সে বনের রাস্তায় পাকা কলার ঢিবি বানিয়ে রাখল। বানর প্রায়ই ওই রাস্তায় আসা-যাওয়া করত, নিশ্চয়ই পথে পড়ে থাকা কলা খাওয়ার লোভ সামলাতে পারবে না সে। আর তারপর রাস্তার পাশের বড় বটগাছের আড়াল থেকে জাল ফেলে বানরকে ধরা হবে। এরপর দুষ্টুটাকে পাকড়াও করে উচিত শিক্ষা দেওয়া যাবে। বাঘের কথামতো বড় আর শক্ত একটা জাল বুনে দিল মাকড়সা।
দুদিন যেতে না যেতেই বানরের দেখা পাওয়া গেল। পথে এত কলা দেখে বানর খুশিতে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এলো। কলা খেতে শুরু করার সাথে সাথেই কোথা থেকে একটা জাল এসে তাকে জড়িয়ে নিল। বানর যতই সেটা থেকে বের হওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল, ততই জালে আরও প্যাঁচ লেগে আটকে গেল।
এবার বাঘ গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো লাঠি হাতে। আর বানরের গায়ে শপাং শপাং করে কয়েক ঘাঁ বসিয়ে দিল। ব্যথায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠতে লাগল বানর, ‘ওরে বাবা রে, মারে! আমায় মেরে ফেললো রে! আমাকে কেন মারছো বাঘ ভায়া, লাগছে যে!’
বাঘ বলল, ‘এটা তোর বদমাইশির শাস্তি। তুই বনের নিয়ম ভেঙে রাস্তায় কলার খোসা ফেলে সবাইকে জব্দ করতে চেয়েছিলি, এবার দেখ্ ব্যথা পেলে কেমন লাগে? অন্যকে ব্যথা দিয়ে মজা নেওয়ার সাজা তোকে পেতেই হবে।’
এই বলে বাঘ আরও কয়েক ঘাঁ বসিয়ে দিল বানরের পিঠে। ব্যথায় বানর কাঁদতে লাগল। সে অনুনয় করে বাঘকে বলল, ‘এবারের মতো আমায় মাফ করে দাও বাঘ ভায়া। আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। আমি আর কক্ষনো এমন দুষ্টুমি করব না, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলব না। ভুল হয়ে গেছে।’
বানরের কান্না দেখে বাঘের মনে দয়া হলো। এবারের মতো সে বানরকে ছেড়ে দিল। আর প্রতিজ্ঞা করালো আর কখনো যেন বানর যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট না করে, বনের নিয়ম-কানুন মানে। আর অন্যকে কষ্ট না দিয়ে মিলেমিশে থাকে।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।