রংধনু আসর : কাক ও কোকিলের ইতিকথা
রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছো ভালো ও সুস্থ আছো। সপ্তাহ ঘুরে রংধনুর আসর সাজিয়ে তোমাদের মাঝে আবারো হাজির হয়েছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।
বন্ধুরা, আজকের আসরের শুরুতেই থাকছে একটি গল্প। 'কাক ও কোকিলের ইতিকথা' শিরোনামের গল্পটি লিখেছেন বাংলাদেশি লেখিকা ফাহিমা কানিজ লাভা। গল্পের পর থাকবে একটি আরবী গান। আর সবশেষে থাকবে বাংলাদেশের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।
'কাক ও কোকিলের ইতিকথা'
এক শহরের বড় এক আমগাছে থাকত এক কোকিল দম্পতি। তাদের নাম কুহু আর কুহি। দুজনই খুব মিষ্টি করে গান গাইত। কিন্তু তারা দুজনই ছিল বড্ড অহংকারী। সুন্দর কণ্ঠ ছিল বলে তারা বাকি পশু-পাখিদের সবসময় ঠাট্টা-তামাশা করত।
একদিন বিকেলে শহরের সবচেয়ে বুড়ো কুকুর 'ভুক ভুক' আমগাছের নিচে এসে কোকিল দম্পতিকে ডেকে বলল, “তোমাদের গানের গলার খ্যাতি পুরো শহরজুড়ে। তাই তোমাদের গান শুনতে এলাম। বুড়ো হয়েছি, কবে মরে যাব তার ঠিক নেই। মরার আগে সুন্দর গান শুনতে চাই।”
বেচারা ভুক ভুক সকাল থেকে সিটি করপোরেশনের ময়লার ভাগাড় ঘেঁটে দু-চারটা চিবানোর অযোগ্য হাড় ছাড়া আর কিছুই পায়নি সেদিন। বুড়ো বয়সে শরীরে জোর পায় না, তার ওপর এত অল্প খাবারে তার শরীর আরও দুর্বল হয়ে আছে। তাই বিষণ্ণ মন নিয়ে ভুক ভুক কোকিলের গান শুনতে চলে এসেছে, যদি মনটা একটু ভালো হয়!
কিন্তু অহংকারী কুহু বলল, “তোমার মতো ময়লা-ঘাঁটা কুকুরকে আমরা গান শোনাতে পারব না। আমরা পাশের ভবনের বিদেশি কুকুরটাকে মাঝে মধ্যে গান শোনাই ঠিকই, কারণ সে তোমার মতো রাস্তার কুকুর না।”
কুহিও বলল, “তোমাকে গান শোনালে আমাদের মান-সম্মান থাকবে না। দূর হয়ে যাও এখান থেকে।”
এমন অপমানে কাঁদতে কাঁদতে বুড়ো কুকুরটা গাছতলা থেকে চলে আসছিল। ওই পথ ধরে মুরগির ডিমের খোঁজে যাচ্ছিল এক গুইসাপ। পথে গুইবাবুর দেখা হলো ভুক ভুকের সাথে। গুইবাবু তাকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ভুক ভুক চাচা? আপনি কাঁদছেন কেন?”
ভুক ভুক তাকে সব জানাল। কুহু আর কুহি কী বলে তাকে অপমান করেছে, সেসব বলতে গিয়ে হু হু করে কেঁদে দিল সে।
সব শুনে ভয়ানক রেগে গিয়ে গুইবাবু বলল- “এত অহংকার এদের! এদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে। চলুন বরং কাকাপ্পি’র কাছে যাই। উনি শহরের সবচেয়ে বুদ্ধিমান কাক। উনি ঠিক একটা বুদ্ধি বাতলাতে পারবে।”
কাকাপ্পি মানে কাক আপু সব সময় সবাইকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয় আর অন্যায় দেখলে উচিত কাজটাও করতে জানে। দেরি না করে গুইবাবু আর ভুক ভুক গেল বটগাছে কাকাপ্পির বাসায়। তখন কাকাপ্পি পাশের ডাস্টবিন থেকে দুদিনের মরা একটা ইঁদুর এনে প্লেটে সাজিয়ে রেখেছে আর তেলাপোকার সস দিয়ে সেটাকে মাখিয়ে খাবে বলে ঠিক করেছে। এমন সময় গুইবাবুর হিস্ হিস্ আর ভুক ভুকের ঘেউ ঘেউ ডাক শুনতে পেল বটতলায়- “কাকাপ্পি, আছেন নাকি বাসায়?”
কাকাপ্পি মগডালের বাসা থেকে সবচেয়ে নিচের ডালে চলে এলো। বলল- “কেমন আছেন ভুক ভুক চাচা? গুইবাবু ভালো আছো তো? তোমাদের মুখ এমন শুকনো লাগছে কেন? কিছু হয়েছে?”
গুইবাবু রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল, “জানেন কাকাপ্পি, আমগাছের কুহু আর কুহি, ওরা ভুক ভুক চাচাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে। একটু গান শুনতে চেয়েছিল বলে ভুক ভুক চাচাকে ‘রাস্তার কুকুর’ বলে অপমান করেছে, ময়লা ঘাঁটে বলে খোঁচা দিয়েছে। ওদের একটা শিক্ষা না দিলেই নয়। আপনি একটা কিছু করুন।”
এসময় ভুক ভুকও কেঁদে কেঁদে পুরো ঘটনাটা কাকাপ্পিকে জানাল। সব শুনল কাকাপ্পি। কিন্তু কারো নামে অভিযোগ এলে যাচাই না করে তো কিছু করা ঠিক নয়, তাই ভুক ভুক আর গুইবাবুকে বলে কিছুটা সময় চেয়ে নিল। বুদ্ধি বের করার জন্যও কদিন সময় লাগবে বলে জানাল কাকাপ্পি।
পরদিন সকালে কাকাপ্পি গেল কোকিলদের বাসায়। কাকাপ্পি কুহিকে ডেকে বলল- “কুহি ভাবী, কেমন আছো? তোমার কণ্ঠের অনেক প্রশংসা শুনে ভাবলাম, তোমাদের কাছে একটু গান শিখে নেই। পাড়ার সবাইকে তাহলে গান শোনাতাম।”
একথা শুনে কুহি আর কুহু হো হো করে হেসে উঠল। কুহি বলল- “আর হাসিয়ো না কাকাপ্পি! তোমার যা হেড়ে গলা, সেই গলা নিয়ে তুমি গান গাইবে! সারাদিন ময়লা-আবর্জনা খেয়ে বেড়াও, ওই গলা খুললে দুর্গন্ধ ছাড়া আর কিছুই বের হবে না। তোমার মতো নোংরা কাকের গানের মাস্টার হয়ে মানুষের হাসির পাত্র হতে পারব না। দূর হও এখান থেকে।”
কোকিল দম্পতির অহংকার কতখানি, সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না কাকাপ্পির। পরদিনই কাকাপ্পি ভুক ভুকের সাহায্যে আশপাশের রাস্তায় বাস করা কুকুরদের জড়ো করল। এরপর সবাইকে বলল, “আজ সারাদিন আপনারা যেখানে যত মরা মুরগি, ইঁদুর, বাসি খাবার, পচা ডিম পাবেন, সেগুলো এনে কোকিলদের বাসার নিচে রেখে আসবেন। আর হ্যাঁ, রাতে করতে হবে এই কাজ, কোকিলরা যেন টেরটি না পায়।”
গুইবাবুও তার বাহিনী নিয়ে এ কাজে কুকুরদের সহযোগিতা করল। আমগাছের তলায় পচা-বাসি খাবার আর মরা প্রাণীর স্তুপ হয়ে গেল। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই কোকিল দম্পতির নাকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ আসতে শুরু করল। ওরা তাকিয়ে দেখে, গাছের নিচে ময়লার পাহাড়। কীভাবে এমনটা হলো তা কিছুতেই বুঝতে পারল না কুহু আর কুহি।
দুর্গন্ধের চোটে কোকিল দম্পতি গানের রেওয়াজ করতে পারল না। ঘরে থাকাও কষ্টকর হয়ে উঠল। কিন্তু এভাবে তো আর বেশিক্ষণ ঘরে থাকা যায় না, আবার কতক্ষণই বা ঘরের বাইরে ঘুরে বেড়াবে! কোকিল দম্পতি পড়ল মহাবিপদে। নাকে রুমাল চেপেও লাভ হচ্ছে না। এতো ময়লা সরাতে ওদের কয়েক মাস লেগে যাবে, ওদের গায়ে কি আর অত জোর আছে!
কুহু আর কুহি যখন মুখ ভার করে এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করছিল, তখন ওই রাস্তা দিয়ে ইচ্ছে করে হেঁটে যাচ্ছিলো পাঁচটা কুকুর। ওরা হেড়ে গলায় গান গাইছিল-
আমরা সবাই রাস্তার কুকুর
আমাদের গলায় নেইতো সুর।
খুঁজে পেলে পচা-বাসি খাবার
এক নিমেষেই করতে পারি সাবাড়।
এই গান শুনে কুহি বলে উঠল, “পেয়ে গেছি বুদ্ধি!”
কুহু বলল, “কী বুদ্ধি?”
কুহি বলল, “চলো কুকুরগুলোকে বলি, আমাদের বাসার নিচে পচা-বাসি খাবারগুলো খেয়ে সাবাড় করতে।”
কুহু বলল, “আরে তাই তো, কুকুরেরা তো নিমেষেই আমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারে।”
কুহু আর কুহি গেল কুকুরদের কাছে। কিন্তু শত অনুরোধেও কুকুরগুলো কোকিলদের বাসার নিচে যাবে না বলে চলে গেল। কোকিল দম্পতি কীভাবে বুড়ো ভুক ভুক চাচাকে অপমান করেছিল, সেকথা মনে করিয়ে দিতেও ভুলল না ওরা।
একটু পর সেখানে কাকেদের একটি ঝাঁক এলো। ওরাও হেড়ে গলায় গান গাইতে শুরু করল-
আমরা কালো কাক পাখি
পরিবেশটাকে সাফ রাখি
মরা প্রাণী খেয়ে পেট ভরে
গন্ধ সবই যায় সরে।
এ গান শুনে কোকিল-দম্পতি ছুটে এলো কাকেদের কাছে। বাসার নিচে জমে থাকা মরা প্রাণীগুলো খেয়ে সাফ করার জন্য কাকুতি-মিনতি করল। কিন্তু কাকেরা সাফ জানিয়ে দিল- “তোমরা আমাদের বন্ধু কাকাপ্পিকে অপমান করেছো। তোমাদের কোনো সাহায্যই আমরা করব না।”
এই বলে কাকেদের ঝাঁকটা চলে গেল। কোকিল দুটো তাদের দুর্ব্যবহার আর অহংকারের জন্য খুবই আফসোস করতে লাগলো। ওদের চোখে পানি চলে এলো। এভাবে কিছুক্ষণ যাওয়ার পর সেখানে এলো ভুক ভুক আর কাকাপ্পি। কোকিল দম্পতি ওদের দেখে বলল- “ভুক ভুক চাচা, কাকাপি, তোমরা আমাদের মাফ করে দাও। আমরা ভুল করেছি।”
কাকাপ্পি বলল- “আর কখনও অন্যদের অপমান করবে না। অহংকার করবে না। মনে রেখো, সবাই মিলেমিশে থাকলেই আমাদের জীবনে সুখ থাকবে, স্বস্তি থাকবে। নিজেকে বড় আর অন্যকে ছোট ভেব না। আমরা সবাই যার যার জায়গায় সমান।”
ভুক ভুক বলল- “তোমরা যখন নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছো, তাহলে তোমাদের ক্ষমা করাই উচিত। ঠিক আছে, আমরা তোমাদের সাহায্য করব।”
তারপর কুকুর আর কাকেরা আমগাছ তলায় এসে সব ময়লা পরিষ্কার করতে শুরু করলো। আর কোকিল দম্পতি সুরেলা গলায় পুরোটা সময় জুড়ে তাদের গান শোনাল। এমন মিষ্টি গলার গান শুনে সবাই খুব আনন্দ পেল।
পথে চলতে গিয়ে কখনো কোনো কোকিলের মিষ্টি গান শুনে যদি খুব ভালো লাগে, তাহলে জেনো কুহু আর কুহি-ই হয়তো গান গাইছে।
বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে রয়েছে একটি আরবী নাতে রাসূল। হৃদয়গ্রাহী এ নাতটি পরিবেশন করেছে ইয়েমেনের শিশু-কিশোররা।
বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে তোমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো বাংলাদেশের এক নতুন বন্ধুকে। ওর নাম লামিয়া তাসিন। সে রাজধানীর মিরপুরের শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা ভালো ও সুস্থ থেকে আবারো এ কামনা করে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের। কথা হবে আবারো আগামী আসরে।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।