রংধনু আসর: সিংহরাজার মন্ত্রী শেয়াল
রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছ তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছ ভালো ও সুস্থ আছ। আজকের আসরে তোমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।
বন্ধুরা, আজকের শুরুতেই থাকবে একটি গল্প। গল্পের পর একটি গান। আর সবশেষে থাকবে ভারতের এক ছোট্টবন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলেই প্রথমেই শোনা যাক মোহাম্মদ অংকনের লেখা গল্প 'সিংহরাজার মন্ত্রী শেয়াল'।
এক বনে এক সিংহ ও এক শেয়াল বাস করত। সিংহ ছিল সে বনের রাজা আর শেয়াল ছিল তার মন্ত্রী। দুজন মিলে বনরাজ্য শাসন করত। এতে বনের অন্যান্য পশু-পাখিরা তেমন কোনো সুবিধা করে উঠতে পারত না। যে যেখানে যাই করুক না কেন, সিংহরাজা ও শেয়ালমন্ত্রী গিয়ে হয়ত বাধা দিত, নয়ত ঝামেলা পাকাত। আর এসবই হতো মন্ত্রী শেয়ালের কুবুদ্ধিতে।
তবুও বনের সবাই সিংহকে রাজা মেনেই সম্মান করত। সিংহের শক্তি বেশি। সাহস বেশি। সে সাহসী হওয়ায় সবার উপকারও হয় বটে। বনরাজ্যে কেউ হামলা দিতে পারে না। সবাই সিংহের কারণে নিরাপদে থাকতে পারে।
সিংহরাজা আসলে আগে এতটা নির্দয় কিংবা দুষ্টুপ্রকৃতির ছিল না। সে বনের অন্যদের সাথে মিশত, সবাইকে খুব ভালোবাসত, বিপদে আপদে এগিয়ে আসত, অসুখ-বিসুখে সেবা দিত। আর তাইতো সবাই বাঘকে রেখে সিংহকে রাজা বানায়।
সিংহরাজা হয়ে ভীষণ খুশি হয়। কিছুদিন বনরাজ্য চালানোর পর সে দেখল, একা বনের দেখভাল করা খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। সবার সেবা দিতে পারছে না ঠিকমত। একা হয়ে সবার বিপদ দেখতে পারছে না। সে বনে তার মত আর কেউ নেই যে সে তাকে সঙ্গে নিবে। আর নিবেইবা কী করে? যাকে নিবে, সেই তো তাকে মেরে রাজা হতে চাইবে। সমকক্ষ হলে ক্ষমতার জন্য দ্বন্দ্ব বেধে যাবে।
সিংহরাজা একা একা একদিন বনের ভেতর তার গুহায় বসে ভাবছিল আর নিজের সাথে নিজেই কথা বলছিল। আচ্ছা, আমি যদি একজন মন্ত্রী নিয়োগ করি, তাহলে কেমন হয়? সে আমার সাথে থাকবে। আমার কাজে সাহায্য করবে। এতে আমার বনরাজ্য পরিচালনা করতে বেশ সহজ হবে।
সিংহরাজার যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। তারপর এক দিন বনরাজ্যে ঘোষণা দিল, হে আমার প্রিয় বনরাজ্যের বন্ধুগণ, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার বনরাজ্যে একজন মন্ত্রী নিয়োগ দিব। তোমরা কে মন্ত্রী হতে চাও, আমাকে তাড়াতাড়ি জানাও।
সিংহরাজার ঘোষণা শুনে সবাই খুশি হল এই ভেবে যে যাক এবার বনরাজ্যে সেবার মান বাড়বে। সিংহরাজা মন্ত্রীর ভালো ভালো বুদ্ধি নিয়ে ভালো ভালো কাজ করবে। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল একটা। সিংহরাজার ঘোষণা শুনে অনেকে মন্ত্রী হতে রাজি হল। মস্ত বড় হাতি বলে, আমি মন্ত্রী হব। আমি শক্তিশালী আছি। অনেক কাজ পারি। ঘোড়া বলে, আমি মন্ত্রী হব। আমি অনেক দৌড়াতে পারি। দৌড়ে দৌড়ে বনরাজ্য ঘুরে দেখব। শেয়াল বলে, আমি ভীষণ বুদ্ধিমান। আমাকে মন্ত্রী করলে ভিন্ন বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করব।
এভাবে হরিণ বলে, উটপাখি বলে। এমন আরও অনেকে মন্ত্রী হওয়ার জন্য সিংহরাজার কাছে আবদার করে। নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরে।
সিংহরাজা এতজনের আবদার শুনে ভীষণ মুশকিলে পড়ে যায়। কী করবে, তার উপায় খুঁজতে থাকে। সে ভাবে, আমি তো মাত্র একজন মন্ত্রী নিব। এত মন্ত্রী নিলে তো নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে ওরা। বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। তখন আমার রাজা হয়ে থাকা নিয়ে টানাটানি বেধে যাবে। বাঘ এসে রাজ্য দখল করবে। কী করা যায় এখন?
অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সিংহরাজার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। সে চিন্তা করে, যারা যারা মন্ত্রী হতে আগ্রহী, আমি তাদের একটা পরীক্ষা নিব। যে বুদ্ধি দিয়ে পরীক্ষায় জিতবে, আমি তাকে মন্ত্রী নির্বাচিত করব। এতে কেউ মন খারাপ করবে না। আবার একজন বুদ্ধিমান মন্ত্রীও পাওয়া যাবে বনরাজ্যে।
তারপর সিংহরাজা সবাইকে নিয়ে পরীক্ষার আয়োজন করে। সে সবাইকে নানা ধরনের প্রশ্ন করে, কাজ দিয়ে পরীক্ষা করে। শক্তি-সাহস যাচাই করে। কিন্তু তেমন কাউকে সে উপযুক্ত হিসেবে পায় না। শেষমেশ শেয়াল বুদ্ধি, সাহস ও শক্তি দিয়ে সিংহরাজাকে খুশি করে। সিংহরাজার পরীক্ষায় সে পাস করে এবং শেয়ালকে সিংহরাজা তার মন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করে। সবাই মন্ত্রী শেয়ালকে অভিনন্দন জানায়।
সিংহরাজা বনরাজ্যের যেখানে যেখানে আসা-যাওয়া করে মন্ত্রী শেয়াল তার সঙ্গে থাকে। রাজা আগে হাঁটে, মন্ত্রী পেছন পেছন। একদিন বনের ভেতর দিয়ে দুজন হাঁটছিল।
এমন সময় মন্ত্রী শেয়াল সিংহরাজাকে প্রশ্ন করল, দেখুন রাজামশাই, আমরা রাজা-মন্ত্রী হয়েও খাদ্য সংগ্রহের জন্য রাজ্যের ভেতর ঘুরে বেড়াই। আমাদেরও খাদ্যের জন্য কষ্ট করতে হয়। এতই যদি কষ্ট করতে হয়, তবে আপনি কীসের রাজা, আর আমি কীসের মন্ত্রী হলাম?
সিংহরাজ বলল: তাহলে আমরা কী করব, মন্ত্রীমশাই?
শেয়াল: ‘বলছিলাম যে রাজ্যের সবাই তো খাদ্য সংগ্রহ করে। তাদের থেকে আমরা যদি সামান্য অংশ করে নিই, তবে আমাদের দুজনের হয়ে যাবে। সবার সামান্যই আমাদের জন্য অনেক। এতে আমাদের কোনো কষ্ট করতে হবে না।‘
সিংহ: ‘তারা তো আমাদের খাদ্য দিতে রাজি হবে না। বলবে, আমরাই তো পাই না।’
শেয়াল: ‘হুম, নরম সুরে বললে কেউ কথা শুনবে না। আপনাকে ঘোষণা দিতে হবে। শাস্তির ভয় দেখাতে হবে। যে খাদ্য দিবে না, তাকে বনরাজ্য থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলতে হবে।’
সিংহরাজা মন্ত্রী শেয়ালের কথা শুনে ঘোষণা দিল, ‘হে বনরাজ্যবাসী! আজ থেকে তোমাদের সংগ্রহ করা খাদ্য থেকে আমাদের জন্য সামান্য করে জমা দিতে হবে। আমরা রাজ্যের নানা কাজে ব্যস্ত থাকি। তাই খাদ্য সংগ্রহ করতে পারি না।’
বনরাজ্যের সবাই সিংহরাজার এমন অদ্ভুত কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। সিংহও পরের খাদ্য দিয়ে জীবন চালাবে? তারা একে অপরকে বলাবলি করতে লাগল, ‘আমাদের রাজা তো ঠিক এমন ছিল না। তিনি তো নিজের খাদ্য নিজেই সংগ্রহ করে খেতেন। তবে এখন কেন এমন ঘোষণা দিচ্ছেন? নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো রহস্য আছে। নিশ্চয়ই ওই দুষ্টু শেয়ালমন্ত্রীর কোনো কুমতলব আছে। রাজাকে কুবুদ্ধি দিয়ে সে তার উদ্দেশ্য পূরণ করবে।’
মন্ত্রী শেয়ালের কুবুদ্ধি শুনে সিংহরাজা বনরাজ্যে বসে বসে দিন কাটাতে থাকল। শেয়ালও ভাবে, যাক, বুদ্ধি দেওয়ায় বসে বসে খাওয়ার দিন চলে এল। নিশ্চয়ই এবার সবাই আমাদের খাদ্য দিয়ে যাবে। আহ্, মুরগির মাংস, পাখির মাংস খুব মজা করে খাব। সিংহরাজাও ঠিক এমনটাই ভাবে, বাহ্, বসে বসে হরিণের মাংস, গরুর মাংস খাব। দারুণ একটা বুদ্ধি দিয়েছে মন্ত্রী শেয়াল। আমাকে আর জোর খাটিয়ে শিকার ধরতে হবে না। আরাম আর আয়েশে দিন কাটাব।
সিংহরাজার ঘোষণা শুনে ওদিকে হাতি, হরিণ, বানরসহ সবাই গোপনে আলোচনায় বসে, দুজনকে শায়েস্তা করতে বুদ্ধি আঁটতে থাকে। তারা একে অপরকে বলে, যে করেই হোক, দুজনের কুবুদ্ধির একটা শাস্তি দিতে হবে। বসে বসে খাওয়ার কুমতলব বন্ধ করতে হবে। রাজা-মন্ত্রী হয়েছে বলেকি সব কথা মানতে হবে? এটি তো কোনো ভালো রাজার কাজ হতে পারে না।
তারপর একদিন হাতি কয়েকটা কলাগাছ নিয়ে বনরাজ্যে রাজা ও মন্ত্রীর কাছে হাজির হয়ে বলল: এই নিন জাহাপনা, আমার খাদ্যের অংশ। এটিই আমার প্রিয় খাদ্য।
কলাগাছ দেখে সিংহ ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে বলল: আমি কি কলাগাছ খাই?
এসময় মন্ত্রী শেয়ালও ক্ষেপে গিয়ে হাতিকে তাড়িয়ে দেয়। তারপর হরিণ কিছু দুর্বাঘাস নিয়ে রাজা ও মন্ত্রীর কাছে হাজির হল। বলল: এই নিন জাহাপনা, আমার খাদ্যের অংশ। আমার কচিঘাস হলেই দিন চলে যায়।
এবারও সিংহরাজা ও মন্ত্রী শেয়াল ভীষণ ক্ষেপে গেল এবং তাকেও তাড়িয়ে দিল। তারপর বানর কিছু কলা নিয়ে হাজির হলে তার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল।
সিংহরাজা শেয়ালমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল: কী হে শেয়ালমন্ত্রী! আমরা হলাম মাংসাশী প্রাণী। আর সবাই তো আমাদের জন্য কলাগাছ, দুর্বাঘাস, ফলমূল এনে দেয়, এসব তো আর খাওয়া যায় না। ক্ষিদেয় পেটটা চোঁ চোঁ করছে। তুমি একটা ব্যবস্থা করো।
শেয়াল বলল: আচ্ছা রাজামশাই, যারা মাংসাশী খাদ্য শিকার করে তারা গেল কই? কাউকে তো দেখছি না।
সিংহ বলল: আসলে তুমি বড্ড বোকা, মন্ত্রী। আমরাই তো মাংসাশী খাদ্য শিকার করি। আমরা যদি বসে থাকি, তবে কে আমাদের খাদ্য এনে দিবে? কোথায় যেন তুমি ভুল করেছ? নচেত এমন বুদ্ধি আসে কী করে?
সিংহরাজা ও মন্ত্রী শেয়ালের কথাগুলো আড়াল থেকে হাতি, ঘোড়া, হরিণ, বানরসহ অন্যান্যরা শুনছিল। এবং তারা তৎক্ষণাৎ সামনে এসে হাজির হয়। তারপর হাতি বলল, ‘রাজামশাই, মন্ত্রী আপনাকে কুবুদ্ধি দিয়েছিল। ওর কুমতলব ছিল বসে বসে খাওয়ার। জানেন তো আপনি যদি বসে বসে খান, তবে আপনি আপনার শিকার করার ক্ষমতা হারাবেন। শক্তিও থাকবে না। তখন বাঘ আপনাকে হার মানিয়ে রাজ্য দখল করে নিবে। আপনার মহাবিপদ হবে। তখন কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না।’
সব শুনে সিংহ বলল: হ্যাঁ, তোমরা ঠিক বলেছ। মন্ত্রী শেয়াল তো দেখছি, ভীষণ দুষ্টু। ওর শাস্তি হওয়া দরকার। ও আমাকে বিপদে ফেলতে চেয়েছিল।
নিজের চালাকি ধরা পড়ায় মন্ত্রী শেয়াল বলল: রাজামশাই, আমাকে এবারের মতো মাফ করে দিন। আমার বড় ভুল হয়েছে।
এসময় সবাই বলল: না রাজামশাই, শেয়ালকে মাফ করবেন না। ওর শাস্তি হওয়া দরকার।
তারপর সিংহরাজা মন্ত্রী শেয়ালকে বনরাজ্যের এক নদীতে নামিয়ে সাঁতার কাটাল। একবার এপাড়ে যায়, তো আরেকবার ওপাড়ে যায়। এভাবে একশবার আসা-যাওয়া চলে। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবাই শেয়ালের শাস্তি পাওয়া দেখে আর হাততালি দেয়।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।