জুলাই ১১, ২০২০ ১৫:১১ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, পৃথিবীতে সবাই সুখী হতে চায়। এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে সুখী হতে চায় না। তবে সবার সুখ একরকম নয়। বেশিরভাগ মানুষই মনে করে- টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ি, শিক্ষা-দীক্ষা, পরিবার-পরিজন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি মানুষকে সুখী করতে পারে। তবে, সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন- এসব জিনিস মানুষকে সাময়িকভাবে কিছুটা সুখ দিতে পারলেও স্থায়ী সুখের জন্য এসব বড় ভূমিকা পালন করে না। 

সত্যি বলতে কী, মানুষের কী আছে- তার ওপর সুখ নির্ভর করে না। যার যা আছে বা যে অবস্থায় আছে তার জন্য শোকরিয়া জানিয়ে যদি দিন শুরু করা হয়- তাতে সুখ আসবে। মানুষ আজ যা ভাবছে তার ওপর ভিত্তি করে তার ভবিষ্যতের সুখ গড়ে উঠবে। আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, মর্যাদাবান, হৃদয়বান, জ্ঞানী-গুণী, সৎ মানুষ সাধারণত সব সময় সুখী হয়। যারা শুধু নিতে চায়, দিতে জানে না বা চায় না, তারা সুখী হয় না।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই 'অর্থই অনর্থের মূল' এ প্রবাদটি পড়েছো। অর্থ মানুষকে বেশি ব্যতিব্যস্ত রাখে, অর্থ মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসলে হানাহানি, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ায় নেশায় অনেকে রাতে ঘুমাতে পারে না, খাওয়াদাওয়ার সময় পায় না, শারীরিক ও মানসিকভাবেও তারা ভীষণ অসুস্থ। শরীর ও মনের চিকিৎসায় অর্থের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সব সুখ বিসর্জন দিতে হয়। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে দিন দিন তাদের জীবন অসহনীয় হয়ে পড়ে। তবে বিপুল অর্থকড়ির মালিক হয়েও অনেকে সুখী হতে পারে না। 

শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, লোভ-লালসা পরিত্যাগ করা, স্বল্পতে সন্তুষ্ট থাকা, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করা, পরিমিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, রাতে নিরুপদ্রবভাবে ঘুমানো, আনন্দ ও সন্তুষ্টি নিয়ে কাজ করা, রাগ, বিরাগ বা আবেগপ্রবণতা পরিত্যাগ করা, বিশুদ্ধ পানি পান করা, ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীর-মনের সুস্থতা বজায় রাখা, রোগ-বিমারি থেকে মুক্ত থাকা ও দাম্পত্য জীবনে সুখী হওয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অর্থবহ করে গড়ে তোলা।  

আরও কিছু বাড়তি গুণাবলী অর্জন করলে মানুষ অধিকতর সুখী হতে পারে। আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ ও নিয়মিত প্রার্থনা করা, পবিত্র কুরআন-হাদিসের পাশাপাশি  ভালো ভালো বই পড়া, গরিব, দুঃখী ও দুস্থ মানুষকে দান ও তাদের সেবাযত্ন করার মাধ্যমে মানসিক তৃপ্তি আসে। রাসূল (সা.) বলেছেন, প্রকৃত সুখ ও ঐশ্বর্য হচ্ছে অন্তরের সুখ ও ঐশ্বর্য। তিনি আরো বলেন, মানুষকে যত নেয়ামত দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে কৃতজ্ঞ অন্তর।  

তো বন্ধুরা, আমরা সবাই অল্পতে তুষ্ট থাকব এবং মহান আল্লাহ দেয়া নেয়ামতের প্রতি কৃজ্ঞত থাকব- এ কামনায় আজকের আসরের দিকে নজর দিচ্ছি। প্রতি সপ্তা'র মতো আজকের আসরের শুরুতেই থাকবে একটি গল্প। 'সুখী মানুষের জামা' শীর্ষক গল্পটির পর থাকবে বাংলাদেশের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলেই প্রথমেই শোনা যাক লেখা গল্পটি শোনা যাক।

সুখী মানুষের জামা

অনেক অনেক দিন আগের কথা। উত্তর আফ্রিকায় ছিল এক রাজা। রাজার ছিল অগাধ ধন-সম্পদ, সৈন্য-সামন্ত, হাতি-ঘোড়া। স্ত্রী ছেলে-মেয়ে সবই ছিল। কোনোটির কমতি ছিল না। কিন্তু সব থাকলে কী হবে। তার মনে কোনো সুখ ছিল না।
সব সময় রাজা চিন্তা করত, আমার সবই আছে, ধন সম্পত্তি, ছেলে-মেয়ে, লোক লস্কর। কিন্তু এসব কিছু আমাকে সুখী করতে পারছে না। কী করলে আমি সুখী হবো! কে আমাকে সুখী হওয়ার উপায় বাতলে দেবে আমি জানি না, জানি না!

একদিন সভাসদবর্গের সামনে সিংহাসনে বসে রাজা চিৎকার করে বললেন: "আমি কেন সুখী হতে পারছি না! কী করলে আমি সুখী হতে পারব, তোমাদের মধ্যে থেকে কেউ কি বলতে পারো না?" 

এই বলে রাজা বিলাপ করতে থাকেন। রাজার বিলাপ শুনে একজন সভাসদ বলল, "মহারাজ! সুখী হওয়ার জন্য আপনাকে একটি উপায় বলতে পারি!  আপনি রাতে মুক্ত আকাশের দিকে নিষ্পলক তাকান। দেখবেন কী সুন্দর ঝলমলে এক চাঁদ, নক্ষত্র-রাজি! এসব দেখতে দেখতে আপনার মন ভরে যাবে। এভাবেই আপনি সুখী হতে পারবেন।"

সুখী হওয়ার এ উপায়টি রাজার পছন্দ হলো না। তিনি বললেন: "যখনই আমি আকাশের তারা ও চাঁদের দিকে তাকাই তখনই আমার রাগ এসে যায়। কারণ আমি জানি যে আকাশের চাঁদ-তারা কোনোটাই কখনোই পাবো না। অন্য পথ বাতলাও।"

তখন অন্য একজন সভাসদ বললেন মান্যবর, "সঙ্গীত শুনে দেখতে পারেন। সঙ্গীত মানুষকে শান্তি দিতে পারে। সুখী করতে পারে। আমরা ভোরবেলা থেকে রাত অবধি আপনার সামনে সুন্দর সুন্দন সঙ্গীত পরিবেশন করব। আমার বিশ্বাস সঙ্গীত শ্রবণ করলে আপনি সুখী হতে পারবেন।"

এই কথা শুনে রাজা রেগে আগুন হয়ে বললেন: "কী বোকার মতো যুক্তি তোমাদের! সঙ্গীত নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু তাই বলে ভোরবেলা থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সঙ্গীত শুনতে হবে! তাও আবার দিনের পর দিন! অসম্ভব! অসম্ভব! এই সব চিন্তা তোমাদের মাথায় এলো কিভাবে?"

এরপর রাজা রেগে গজগজ করতে করতে তার খাসকামরায় বিশ্রাম নেয়ার জন্য প্রবেশ করলেন। পরে মুখ্যমন্ত্রী, রাজার খাসকামরায় ঢুকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন: মহারাজ, আমার একটি কথা আছে, যদি অভয় দেন তো বলতে পারি।

রাজা বললেন আপনি নির্ভয়ে বলুন সে কথা। মুখ্যমন্ত্রী একটু কেশে বললেন: আমি একটি উপায় আপনাকে বলতে পারি যা আপনাকে অত্যন্ত সুখী করতে পারে।

রাজা সাগ্রহে বললেন বলুন, মন্ত্রীবর কী উপায় সেটি? 

মুখ্যমন্ত্রী উত্তর দিলেন, এটি অত্যন্ত সহজ উপায় মহারাজ! প্রথমে আপনাকে একজন সুখী মানুষকে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর সেই সুখী মানুষটির কাছ থেকে তার জামাটা নিয়ে আপনাকে পরতে হবে। এতে ওই সুখী মানুষটির সমস্ত সুখশান্তি আপনার দেহে প্রবেশ করবে। আপনি তখন সেই সুখী মানুষটির মতোই সুখী হবেন।

রাজা সব শুনে বললেন: তোমার যুক্তিটি আমার পছন্দ হয়েছে। আমি যেভাবে পারি প্রথমে একজন সুখী মানুষ খুঁজে বের করব।

তারপর একজন সুখী মানুষের খোঁজে রাজা তার সৈন্য-সামন্তদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন। সৈন্য-সামন্তরা যাকে পায় তাকেই জিজ্ঞেস করে সে সুখী কি না? সবার উত্তর একই, না, তারা সুখী নয়।

এমনিভাবে দিন যায়, রাত যায়, মাস যায়, বছরও পার হতে চলল। খুঁজে খুঁজে সবাই হয়রান! কিন্তু কোথাও একজন সুখী মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় না। সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল প্রায়। অবশেষে দেশের প্রান্তসীমায় অবস্থিত বনভূমির মধ্যে পাওয়া গেল এক কুঁড়েঘর। সৈন্যরা সেখানে দেখতে পেল শক্ত সামর্থ্য ছোটখাটো একজনকে। সে আপন মনে কাজ করে চলেছে। মুখখানি তার অনাবিল হাসিতে উদ্ভাসিত।

লোকটি নিজের শ্রমে উপার্জিত আয় দিয়ে কোনোভাবে জীবিকানির্বাহ করে সুখে দিনাতিপাত করত। তার কোনো সম্পদ না থাকায় চোরের ভয়ও ছিল না।  সুতরাং শান্তিতে ঘুমানোর ব্যাপারে তার কোনো দুশ্চিন্তাও ছিল না।

সৈন্যরা তাকে জিজ্ঞেস করল: তুমি কি সুখী? সাথে সাথে সেই লোকটি জবাব দিল: অবশ্যই। পৃথিবীর মধ্যে আমি সবচেয়ে সুখী মানুষ। 

ব্যস। সৈন্যদের আর পায় কে। তারা সেই সুখী মানুষটিকে মহাসমাদরে নিয়ে এলো রাজবাড়িতে। এরপর রাজাকে খবর পাঠানো হলো, মহারাজ, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুখী মানুষটিকে তারা খুঁজে এনেছে।

খবর পেয়ে রাজা মহাখুশি। খুশিতে সব কিছু ভুলে একপাক নেচে আপনমনে বলে উঠল: শেষমেশ তাহলে আমি সুখী মানুষ হতে যাচ্ছি। এক মুহূর্ত দেরি নয়, এক্ষুণি আমি তার জামা পরে ফেলব।

রাজা তার বিশ্রামাগার থেকে হুকুম দিলেন, মহাভাগ্যবান সেই সুখী মানুষকে এখানেই নিয়ে এসো। এখানে আমি তার সাথে কথা বলব।

প্রহরীরা বিশ্রামাগারের দরোজা খুলে দিল। মন্ত্রী সভাসদ পরিবেষ্টিত অবস্থায় রাজা বসে আছেন। এ সময় অনাবিল হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে ছোটখাটো সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটি খাসকক্ষে প্রবেশ করল। রাজা সাগ্রহে সেই মানুষটিকে বরণ করে বললেন: আমার পাশে এসো, বন্ধু! পথে তোমার কোনো কষ্ট হয়নি তো!

পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী মানুষটি হাসতে হাসতে রাজার কাছে এগিয়ে গেল। রাজা এবার ভালো করে তার দিকে তাকালেন। কিন্তু তিনি কী দেখলেন? এই সেই সুখী মানুষ! যে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সুখী মানুষ! লজ্জা নিবারণের জন্য কোমরের কাছে এক চিলতে কাপড় ছাড়া যার সারা গা খালি।

রাজা ভাবলেন, জামাটি হয়তো কোথাও লুকানো আছে। তাই তিনি বললেন: যত ধনরত্ন চাও, তোমাকে দিচ্ছি। তার বিনিময়ে তোমার জামাটি আমাকে দাও। দেরি করো না বাপু!

তখন লোকটি বলল: রাজামশাই আমার কোনো জামা নেই! আর আমার বলতেও কিছুই নেই! সে জন্যই তো আমি সুখী মানুষ।

বন্ধুরা, এ গল্পটির শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে- ধন-সম্পদ অথবা জৌলুশের মধ্যে সুখ নেই; সুখ মানসিক প্রশান্তির নাম। সৎ পথে নিজ পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করলেই জীবনে সুখ মেলে। আবার কারো বিশাল সম্পদের পাহাড় থাকলেও সুখ নাও থাকতে পারে।  তাই নীতিহীন পথে সম্পদ উপার্জনের পথ পরিহার করাই উত্তম।

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ শহরের বন্ধু শাদমান হোসেন অয়নের সাক্ষাৎকার।

তো রংধনু আসরে অংশ নেয়ার জন্য সাদমান হোসেন অয়ন তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আর শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা ভালো ও সুস্থ থেকো আবারো এ কামনায় গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর। কথা হবে আবারো আগামী সপ্তাহে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।