ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (২৪ পর্ব): আবাদান অবরোধমুক্ত করার সফল অভিযান
আজ আমরা আবাদান অবরোধমুক্ত করার সফল অভিযানের ব্যাপারে ইরানের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে কথা বলব।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় আবাদান শহরের ওপর ইরাকি বাহিনীর অবরোধ ভাঙার লক্ষ্যে সামেনুল আয়েম্মে নামক যে অভিযান চালানো হয় সে সময় রাজনৈতিক দিক দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ভালো ছিল না। ইসলামি বিপ্লব বিরোধী মোনাফেকিন গোষ্ঠী ইরানের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাপকভাবে হত্যা করে দেশে দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি করেছিল। মোনাফেকিন গোষ্ঠীর নেতা মাসুদ রাজাভি সাবেক প্রেসিডেন্ট বনি সদরের সঙ্গে ফ্রান্সে পালিয়ে গিয়ে টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন: “খোমেনীর অধীনস্ত রাজনৈতিক নেতাদের শতকরা ৯০ ভাগকে শেষ করে দেয়া হয়েছে। ফলে খোমেনী দুর্বল হয়ে পড়েছে। ... দেশের জনগণ এতে অত্যন্ত খুশি এবং তারা আমাদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছে।...এখন আমরা আক্রমণাত্ত্বক অবস্থানে রয়েছি এবং খোমেনী আত্মরক্ষা করছে।”
ইরানের বিপ্লব বিরোধীদের এ ধরনের দিবাস্বপ্নে ইরাকি শাসক সাদ্দামের মন আনন্দে নেচে ওঠে। কিন্তু ইরাকের আগ্রাসী শক্তি এবং ইরানের বিপ্লব বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা যে বিষয়টি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় তা হচ্ছে আগ্রাসীদের কবল থেকে মাতৃভূমি পুনরুদ্ধারে ইরানের বিপ্লবী তরুণদের দৃঢ় মনোবল ও মানসিক শক্তি। ২৪ বছর বয়সি ইরানি কমান্ডার শহীদ হাসান বাকেরির পরিকল্পনায় চালানো অভিযানে আবাদান শহর অবরোধমুক্ত হয়। এই ঘটনা ইরাক-ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ঘটনা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিবিসি রেডিও এক বিশ্লেষণে জানায়, ইরানের এ বিজয় সাদ্দাম হোসেনের জন্য শুধুমাত্র সামরিক পরাজয় নয় বরং রাজনৈতিক পরাজয়ও বটে।
পরবর্তীতে আমেরিকার প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক অ্যান্টনি গ্রিডজম্যান আবাদান অবরোধমুক্ত করার অভিযান সম্পর্কে বলেন, ১৯৮১ সালের অক্টোবরে ইরানের ওই বিজয়ের ফলেই ওই বছরের নভেম্বর মাসে ইরাকের পক্ষ থেকে একমাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়া হয়। তিনি ইরানের এ বিজয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে লিখেছেন: আবাদানে ইরানের বিজয় প্রমাণ করেছে, যুদ্ধাস্ত্র ও জঙ্গিবিমানের বহর থাকলেই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। ইরাকের হাতে ইরানের তুলনায় গুণগত মান ও পরিমাণে অনেক বেশি যুদ্ধাস্ত্র থাকা সত্ত্বেও তারা ইরানি যোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হয়েছে। এর অর্থ এই যে, ইরাকের জায়গায় পশ্চিমা কোনো শক্তি হলেও সেদিন তারা ইরানের কাছে ধরাশায়ী হতো। গ্রিডজম্যান বলেন, আবাদান অভিযানের মাধ্যমে ইরান ও ইরাকের মধ্যে নতুন ধরনের এক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন: “আমার এখনো বুঝে আসে না ওই অভিযানে ইরান কীভাবে বিজয়ী হয়েছিল। ”
যাই হোক, আবাদানে বিজয় ইরানি যোদ্ধাদের মনোবল ব্যাপকভাবে চাঙ্গা করে এবং তারা ইরাকি বাহিনীর হাতে দখলীকৃত অন্যান্য এলাকা মুক্ত করার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া, এ বিজয়ের ফলে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিপ্লবীদের অনুকূলে আসতে থাকে। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ আলী রাজায়ি মোনাফেকিন গোষ্ঠীর হামলায় শহীদ হওয়ার পর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইমাম খোমেনী (রহ.) বিপুলভাবে ভোট দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “নির্বাচনের ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের দীর্ঘ লাইন অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক ঘটনা। জনগণ যদি সরকারের পক্ষে না থাকে তখন শত্রুরা অভ্যুত্থান ঘটাতে বা হামলা চালাতে পারে। কিন্তু জনগণ যদি মাঠে থাকে তাহলে কারো পক্ষে কোনো কিছু করা সম্ভব হবে না। আমাদের জনগণ ও সেনাবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তারা দেশ রক্ষা করতে পারবে।”
আবাদান অবরোধমুক্ত করার অভিযান শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পাঁচ সেনা কমান্ডার এ যুদ্ধ সম্পর্কে ইমাম খোমেনী (রহ.)কে বিস্তারিত তথ্য জানানোর জন্য তেহরানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাদেরকে বহনকারী বিমানটি তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দর থেকে ১৭ মাইল দূরে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র ওই পাঁচ সেনা কমান্ডারসহ বিমানের ৪৯ আরোহীর সবাই নিহত হন। নিহত সেনা কমান্ডাররা হলেন- ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর উপ প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফাল্লাহি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়্যেদ মূসা নামজু, জেনারেল ফাল্লাহির উপদেষ্টা মেজর জেনারেল ফাকুরি, আইআরজিসি’র উপ-প্রধান ইউসেফ কোলাহদুজ এবং আইআরজিসি’র খোররামশাহর শাখার কমান্ডার মোহাম্মাদ জাহান-আরা।
ওই বিমান দুর্ঘটনা সত্ত্বেও দেশি বিদেশি গণমাধ্যম আবাদান অভিযানকে ইরানের জন্য বড় ধরনের বিজয় বলে বর্ণনা করে। ইসলামি ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী (রহ.) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনগণের বিপুল অংশগ্রহণ এবং ওই নির্বাচনে হযরত আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীকে বিজয়ী করায় জনগণকে ধন্যবান জানান। জনগণ ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আগ্রাসী ইরাকিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের সেনাবাহিনীর করণীয় নির্ধারণ করে দেয়। ইমাম এ সম্পর্কে আশা প্রকাশ করে বলেন, দখলীকৃত এলাকাগুলো থেকে আগ্রাসী বাহিনীকে বিতাড়িত করা হলে আমাদের আবাদান বিজয় পূর্ণতা পাবে এবং ইরানি জাতি অতি সত্ত্বর সে বিজয় দেখতে পাবে।
ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনের এই স্থিতিশীলতা শিগগিরই যুদ্ধের ময়দানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সারাদেশ থেকে দলে দলে হাজার হাজার তরুণ ও যুবক যুদ্ধে যাওয়ার জন্য নাম লেখায়। সারাদেশে যুদ্ধে যাওয়ার সাজ সাজ রব পড়ে যায়। সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এসব যুবককে তাদের বাহিনীতে ভর্তি করে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে থাকে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র তৎকালীন প্রধান কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি এ সম্পর্কে বলেন: “আইআরজিসি’র জওয়ানরা তখন দু’ভাগ হয়ে একভাগ যুদ্ধক্ষেত্র সামাল দিয়েছে এবং আরেকদল যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য সরবরাহের কাজে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। যুদ্ধের ময়দানে সবকিছু সামরিক দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে যায়। অন্যদিকে সৈন্য ভর্তির ক্ষেত্রেও আইআরজিসি একটি পেশাাদার ও যোগ্য বাহিনী গঠন করার কাজে আত্মনিয়োগ করে।
জেনারেল রোজায়ি আরো বলেন: “আবাদান শহর অবরোধ মুক্ত করার পরপরই ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে এ কাজগুলো শুরু হয়। আইআরজিসি তখন যে পরিকল্পনা করে তা ছিল, প্রতিটি অভিযানে তার আগের অভিযানের তুলনায় দ্বিগুণ সৈন্য অংশ নেবে। আবাদান শহর মুক্ত করার জন্য সামেনুল আয়েম্মে নামক যে অভিযান পরিচালনা করা হয় তাতে কয়েক ব্যাটেলিয়ন সৈন্য অংশ নেয়। আর ওই অভিযানের পর আইআরজিসি’তে প্রথম ব্রিগেড নিয়ে কথা ওঠে। অর্থাৎ সামেনুল আয়েম্মে অভিযানের পর ব্রিগেড গঠনের মতো প্রয়োজনীয় সৈন্যসংখ্যা নিয়ে ভাবতে শুরু করে আইআরজিসি। এর ফলে সার্বিকভাবে ইরানের সামরিক শক্তি বেড়ে যায়। আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে পরবর্তী অভিযানগুলোর ওপর এর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ০৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।