ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (২৫ পর্ব): তারিকুল-কুদস নামক অভিযান
গত আসরে আমরা আবাদান অবরোধমুক্ত করার সফল অভিযানের ব্যাপারে ইরানের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজ আমরা সামেনুল আয়েম্মে অভিযানের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে তারিকুল-কুদস নামক অভিযান চালানো হয়েছিল সে সম্পর্কে কথা বলব।
আপনাদের হয়তো মনে আছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় আবাদান শহর অবরোধমুক্ত করার অভিযানের নাম দেয়া হয়েছিল সামেনুল আয়েম্মে। ওই অভিযানে বিজয় ইরানি যোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা করে এবং আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। সেইসঙ্গে সাদ্দাম বাহিনীর দুর্বলতাগুলিও ইরানের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। ওই অভিযানের ফলে ইরানের সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে যে নতুন উদ্যোম তৈরি হয় তা পরবর্তী কিছু বড় অভিযানের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। সামেনুল আয়েম্মে অভিযানে বিজয়ের ঘটনায় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে এবং ওই অভিযানের পর এই বাহিনীকে ঢেলে সাজানো হয়।
এর আগের কোনো এক আসরে আমরা বলেছিলাম, ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়লাভ করার তিন মাস পর একই বছরের মে মাসে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি গঠন করা হয়। এরপর ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান এলাকায় বিপ্লব-বিরোধী বিদ্রোহ দেখা দিলে আইআরজিসি ওই এলাকায় হস্তক্ষেপ ও বিদ্রোহ দমন করে। এ সময় দলে দলে সাধারণ মানুষ আইআরজিসিতে যোগ দেয়। একইভাবে ইরাকি বাহিনী ইরানে আগ্রাসন চালানোর পরও আইআরজিসি’র গঠনকাঠামোর আওতায় গণবাহিনী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধে গণবাহিনীর অংশগ্রহণের প্রক্রিয়াটি ছিল মোটামুটি এরকম- সাধারণ মানুষ প্রথমে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আহওয়াজ শহরে সমবেত হতো এবং সেখান থেকে তাদেরকে বাছাই করে বিভিন্ন ফ্রন্টে পাঠানো হতো। ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সামেনুল আয়েম্মে অভিযান পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলমান ছিল।
দেশের প্রতিরক্ষা বিষয়ক সর্বোচ্চ পরিষদে ইসলামি ইরানের স্থপতি ইমাম খোমেনী (রহ.)’র তৎকালীন প্রতিনিধি ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ সম্পর্কে বলেন, “সামেনুল আয়েম্মে অভিযানের আগ পর্যন্ত যুদ্ধে আমাদের উল্লেখযোগ্য কোনো বিজয় ছিল না। হয়তো দু’একটি অভিযানে কিঞ্চিত সাফল্য এসেছিল কিন্তু সেগুলোকে পরিপূর্ণ বিজয় বলা যাবে না। আর এর কারণ ছিল তখন পর্যন্ত গণবাহিনীকে সুসংগঠিতভাবে ব্যবহার করা হয়নি। নবগঠিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী ও আইআরজিসি তখনও নিজেদেরকে প্রস্তুত করে উঠতে পারেনি এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আইআরজিসি’র হাতে প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দিতে রাজি হননি। ”
আয়াতুল্লাহি উজমা খামেনেয়ী আরো বলেন, “(তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও প্রেসিডেন্ট) বনি সদরের সঙ্গে আমার এই বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার বাদানুবাদ হয়। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমার কথা আমলে নিতে চাননি। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর হাতে অস্ত্রসস্ত্র ও গোলাবারুদ থাকা সত্ত্বেও তাদের যখন বনি সদরের মতো লোকেরা পরিচালিত করে তখন তাদের পক্ষে সাফল্য পাওয়া যে সম্ভব নয় সেটা সহজেই অনুমেয়।” আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী তার আরেক বক্তব্যে শত্রুসেনাদের হাত থেকে খোররামশাহর মুক্ত করতে দেরি হওয়ার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন: “আমার দৃষ্টিতে খোররামশাহর আরো এক বছর আগে মুক্ত করা সম্ভব ছিল। আইআরজিসি’কে একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গণ্য না করার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। ”
অবশেষে বনি সদর দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর আইআরজিসি পূর্ণ শক্তি অর্জনের দিকে অগ্রসর হয়। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী একটি সুসংগঠিত ও প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠার পরই কেবল আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরান বিজয় অর্জন শুরু করে। সামেনুল আয়েম্মে অভিযানে সফলতা দিয়ে আইআরজিসি প্রথম নিজের উন্নতি ও অগ্রগতির জানান দেয়। এরপর সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি’র শীর্ষস্থানীয় কমান্ডাররা বৈঠকে বসে তাদের পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেন। অনেকগুলো বৈঠক শেষে তারা তিনটি মৌলিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেন।
প্রথম লক্ষ্যটি ছিল, ইরাকিদের যত বেশি সম্ভব ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল ইরাকি সেনাদের হাতে ঘেরাও হয়ে পড়া ইরানি যোদ্ধাদেরকে মুক্ত করা এবং তৃতীয় লক্ষ্য ছিল, সম্মিলিত আক্রমণের মাধ্যমে আগ্রাসী বাহিনীর কাছ থেকে দখলীকৃত এলাকাগুলো মুক্ত করার চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ লক্ষ্যগুলো সামনে রেখে ‘কারবালা’ নামের ১২টি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এ সম্পর্কে আইআরজিসি’র তৎকালীন কমান্ডার, জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বলেন: সামেনুল আয়েম্মে অভিযানে সফলতা অর্জনের পর আমরা কারবালা-১, কারবালা-২, কারবালা-৩… এভাবে কারবালা-১২ পর্যন্ত ১২টি অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করি। কোন কোন এলাকা মুক্ত করার লক্ষ্যে কোন কোন অভিযান চালানো হবে তাও নির্ধারণ করে ফেলা হয়। কারবালা সিরিজের প্রতিটি অভিযানের জন্য আরেকটি করে ভিন্ন ভিন্ন নামও নির্ধারণ করি আমরা।”
এভাবে সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডাররা মিলে কারবালা সিরিজের প্রথম অভিযানের নাম দেন তারিকুল কুদস। ইরানের খুজিস্তান প্রদেশের বোস্তান (Bostan) শহর মুক্ত করে ‘চাযাবে’ (Chazabeh) প্রণালী পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার লক্ষ্যে এ অভিযান চালানো হয়। ১৯৮১ সালের ২৯ নভেম্বর ভোররাতে ইরানি যোদ্ধারা কয়েক দিক থেকে একসঙ্গে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ অভিযানের পরিকল্পনাকারী ছিলেন শহীদ জেনারেল হাসান বাকেরি এবং এতে আইআরজিসি’র ২৩টি ব্যাটেলিয়ান এবং সেনাবাহিনীর ৯টি ব্যাটেলিয়ান অংশগ্রহণ করে। ইরানি যোদ্ধাদের এই ৩২ ব্যাটেলিয়ানের সামনে ইরাকিদের ছিল ৬০ ব্যাটেলিয়ানের সুসজ্জিত বাহিনী। অভিযানে ইরানি যোদ্ধারা বোস্তান শহরের উত্তর প্রান্তের দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে অগ্রসর হন। ওই পথে লোক চলাচল বন্ধ থাকায় সাদ্দামের বাথ সেনারা ভাবতেও পারেনি যে ওই দিক দিয়ে হামলা হতে পারে। ফলে ইরানি যোদ্ধাদের অতর্কিত হামলায় তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে।
শহরের উত্তর প্রান্তে মোতায়েন ইরাকি সেনারা সহজেই ধরাশায়ী হয়ে যাওয়ার পর শহরের দক্ষিণ অংশে মোতায়েন বাথ সেনাদের মনোবলও ভেঙে পড়ে। ফলে সেখানেও ইরানি যোদ্ধারা সহজেই বিজয় অর্জন করেন। আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীকে কিছু বুঝে উঠতে দেয়ার আগেই ইরানি জওয়ানরা বোস্তান শহরের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। ইরানি যোদ্ধারা যে দুর্গম পথ ধরে এগিয়ে গিয়েছিলেন ইরাকিরা কখনো ভাবেনি যে, ওই পথে কোনো মানুষের পক্ষে পায়ে হেঁটে আসা সম্ভব। তাও আবার ভারী অস্ত্রসস্ত্র কাঁধে বহন করে কারো পক্ষে এগিয়ে আসার কথা তারা ভাবতেই পারেনি। রাতের অন্ধকারে ওই দুর্গম পথ পাড়ি দেয়ার দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনেন ইরানি যোদ্ধারা।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ১২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।